ভায়োলেন্স মানে অশিক্ষা। অসংযত লোভ মানে অশিক্ষা। অসংযত রাগ মানে অশিক্ষা। আগের ধারণা ছিল শিক্ষকের প্রহারের উপর শিক্ষার মান নির্ভর করছে। এখন সেটা মধ্যযুগীয় ভাবনা।
জাফর পানাহি তার সিনেমায় ভায়োলেন্স আর নন-ভায়োলেন্সর কথা বলছেন তার মত করে। বারবার পানাহির সিনেমার চরিত্ররা বলছে, আমাদের পথ মেরে ফেলে শত্রুনাশ না। আমাদের বিরোধ কোনো ব্যক্তিগত মানুষের বিরুদ্ধে না। আমাদের বিরোধ কট্টরপন্থীদের ভাবনার বিরুদ্ধে। গোটা পৃথিবীকে একটা ধাঁচে আনার জন্য হত্যার রাস্তা ওদের, আমাদের না।
অহিংসার রাস্তা মানেই গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন না। অহিংসার অনেক প্রকাশ আছে। তার প্রধান কথাই হল হিংসা কোনো রাস্তা না, একে স্বীকার করা। হিংসা সাময়িক প্রতিহিংসার তৃপ্তি। সমাধানের রাস্তা না। হাতে বন্দুক তুলে নিয়েও অহিংসার রাস্তায় হাঁটা যায় যদি সেটা ব্যক্তিগত আক্রোশ বা ক্ষুদ্র প্রতিহিংসার তৃপ্তি সাধনার জন্য না ব্যবহৃত হয়। হিংসা ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অহিংসা একটা ভাবনার বিরুদ্ধে। প্রথমটা আপাতভাবে ফলপ্রসূ মনে হলেও পরেরটাই দীর্ঘজীবী হয়।
হিংসার উত্তর হিংসা না। শিক্ষা। আর সেটাই সত্যিকারের ধর্ম। রিলিজিয়ন না হলেও। ধর্মকে যদি বৃহৎ অর্থে ধরি, তবে যা আমাকে আরো বেশি যুক্তিসঙ্গত, উদার, সহিষ্ণু করে তোলে তাই ধর্ম। তাই সুশিক্ষা। আবেগকে যে কোনো ধরণের প্ররোচনা ঘটিত তাড়নামুক্ত আর যুক্তিকে মোহমুক্ত রাখাই শিক্ষার আসল কাজ। সেটা যদি সম্ভব হয় বাকিটা মানুষ সামলে নিতে পারে। সেটা ব্যক্তিগত জীবনে হোক, কী সমাজ জীবনে। সত্যিকারের ধর্ম সেটাই বলে।
বর্তমানে হিংসাকে ন্যায়ের মুখোশ পরিয়ে বাজারে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে আমার কর্তব্য বলে। মানুষ হিসাবে আমার প্রাথমিক মূল কর্তব্যটা যদি ভুলিয়ে দেওয়া যায় তবে আমাকে দিয়ে যে কোনো নৃশংস কাজ করিয়ে নেওয়া যায় অনুতাপ, দ্বিধা ছাড়াই। আমি যদি অমুক দলের, অমুক গোষ্ঠীর, বা অমুক ধর্মের পরিচয়ের বাইরে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে না পাই, তবে আমার শত্রুপক্ষ বানাতে বেশি বেগ পেতে হবে না। সেই পরিচয়টা থেকে আমাকে সরিয়ে নিয়ে আসাই আমার প্রথম কাজ। আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া মানুষ হিসাবে আমার একটা কর্তব্য আছেই।
এখানে একটা সূক্ষ্ম তর্ক আছে। মানুষ মাত্রেই কোনো না কোনো গোষ্ঠীতে সে জন্মাবে এবং সে গোষ্ঠীকে সে তার প্রাকৃতিক পরিচয়ের স্বাভাবিক অঙ্গ হিসাবে জানবে। ঠিক কথা। কিন্তু এখানে আরো একটা কথা আছে। সব রাস্তাই বড় রাস্তায় গিয়ে মেশে না। কিছু অন্ধগলিতে গিয়ে শেষ হয়, কিছু হাইরোড অবধি নিয়ে যায়। যে মানুষটা পুরী সমুদ্রে স্নানে যাবে ঠিক করেছে, সে তার গলির থেকে বেরিয়ে এমন পথের দিকে যাবে যা তাকে সমুদ্রের সামনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাবে। সে কলকাতার কোনো এঁদো অন্ধকার গলিতে জন্মেছে বলে হাপিত্যেশ করে মরবে না। তার ইচ্ছাই তার অভিমুখ নির্ধারণ করবে। শ্রীরামকৃষ্ণ কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়েও বিশ্বজনীন ধর্মের হদিস পেয়েছিলেন বাংলার একটা অজ পাড়াগাঁয়ে জন্মে। পুকুরের নানা ঘাটে একই জল, একই গিরগিটির নানা রং, রুচি অনুযায়ী একই মাছের নানা পদ ইত্যাদি ইত্যাদি উদাহরণে এই সত্যকে নিজের সম্পূর্ণ জীবন দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন। বলতে চেয়েছেন, হিংসা মানে অশিক্ষা। অজ্ঞান। কিন্তু প্রয়োজনে ফোঁস করে ওঠাও শিক্ষা। কিন্তু সে ফোঁস হবে বিষমুক্ত, সেও মনে করিয়ে দিয়েছেন। “ফোঁস করবি, কিন্তু বিষ ঢালবি না।”
আজ আমরা নাকি পোস্টমর্ডানিজম যুগে আছি। এ সব অর্থহীন বুলি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও অজ্ঞ থেকে যাওয়া যায় শুধু কিছু বুলি শিখে। সে উদাহরণের অভাব নেই। কিন্তু বুলির পর বুলি বসিয়ে বুলিখোরদের চোখ ধাঁধানো যায়। হাততালি, শিরোপা ইত্যাদি অনেক কিছু পাওয়া যায়। কিন্তু সে বুলির চাকা ধুলোয় আটকে যায়। তাই ওদিয়ে যতটুকু হওয়ার তাই হচ্ছে। বই, ছাপাখানা আর বুলির বাইরে আরেকটা অকেতাবি ধূলোমাটির জীবন আছে। সেখানে আসল শিক্ষার দরকার। বুলিগত শৌখিন শিক্ষা না। সেটা বোঝার সময় এসেছে। কেতাবি শিক্ষার একটা বিকল্প শিক্ষার দরকার আরো বেশি হয়ে পড়েছে এ পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে রাখতে গেলে। রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন। স্বামীজিও বুঝেছিলেন। তাই শিকাগো ধর্মাসভায় মনুষ্যত্বের যে সুরটা ধর্মের তানে বেঁধে দিয়েছিলেন সেটা বুঝতে বহু পণ্ডিত মানুষেরও যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে।
পানাহির সিনেমাটা এবারে অস্কারের তালিকায় আছে। পানাহির সহচিত্রনাট্যকার ইতিমধ্যে জেলবন্দী। এ সব চলতেই থাকবে। শিক্ষার আলোতে জীবনে বাঁচতে গেলে রাস্তা কঠিন হবে, মিডিয়াহীন হবে, নিন্দামন্দ হবে, অভাব দুর্যোগ সামলাতে হবে। মোট কথা ভুগতে হবে। দুদিনের ভোগান্তি না, দল বেঁধে সেলিব্রেশনের মত - “আসুন সবাই মিলে প্রতিবাদ করি, ঝুঁকি না নিয়ে, মিডিয়ার সামনে পেছনে ঘুরে সেলফি নিতে নিতে”। এ প্রতিবাদ নিঃশব্দে চলতেই থাকে শিক্ষার আলোয় ভর করে। হাততালির ইচ্ছা, নাম আর নেতা হওয়ার ইচ্ছা ত্যাগ করে। রামকৃষ্ণদেব বলতেন, বিবেকহীন পণ্ডিতদের আমার খড়কুটো বোধ হয়। কী খাঁটি পর্যবেক্ষণ। সত্য বুলিতে নেই, বুলির ব্যাখ্যাতেও নেই। আছে জীবনে। জীবন শিক্ষা কত উৎস থেকেই তো নেয়। সিনেমাও তার একটা মাধ্যম। রামকৃষ্ণদেব যেমন বলতেন গিরিশ ঘোষকে থিয়েটার ছেড়ো না, ওতে লোকশিক্ষা হবে।
সিনেমাটা কোথায় দেখবেন? জানি না। এক সুহৃদ ডাউনলোড করে দিয়ে গেছে তাই দেখে বেঁচেছি। এতটাই বলতে পারি।