(আমি অবশ্যই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কেউ নই, বিশারদও নই। কয়েকটা জিনিসে কদিন ধরে একটু খটকা লাগছে ভাবাচ্ছে বলেই এসব লেখা। এ নিতান্তই আমার মনের ভাবনার প্রতিফলন। ত্রুটিহীন এমন দাবী করছি না।)
ওয়েবসিরিজে বসত লক্ষ্মী।
2023 সালে পিপ্পা বলে একটা সিনেমা হল। আমাজন প্রাইমে দেখানো হল। এ আর রহমনের সঙ্গীত পরিচালনায় নজরুলের “কারার ওই লৌহকপাট” গান নিয়ে বিতর্ক হল। তারপর? এমনকি উইকিপিডিয়াতে সিনেমার পেজে ‘'কন্ট্রোভার্সি” বলে কোনো অনুচ্ছেদও লেখা হল না, যেমন লেখা হয়ে থাকে সাধারণত। অর্থাৎ এ বিতর্ক প্রসঙ্গটাকে গায়েই মাখা হল না।
২০২৫ সাল। ডাব্বা কার্টেল। আবার নতুন করে রবীন্দ্রনাথের গান “মম চিত্তে নিতি নৃত্যে” নিয়ে বিতর্ক শুরু হল। কেন ওই গান অমন মত্ত অবস্থায় দুই মহিলা বিকৃত সুরে গাইবেন আর নাচবেন। আপাতত এইসব নিয়ে কিছু হচ্ছে না। অন্তত আমার চোখে পড়েনি।
এখন আইনিগত কারণ হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের গানের কপিরাইট আপাতত নেই। তাই আইনি ব্যাপারে খুব একটা কিছু করার নেই। আর দ্বিতীয় হল বাঙালি সেন্টিমেন্ট। কিন্তু সেটার গুরুত্ব বড় ক্ষীণ।
সদ্য নেটফ্লিক্সে চলছে “খাকি/ দ্য বেঙ্গল চ্যাপ্টার“। কে নেই তাতে? শাশ্বত। পরমব্রত। জিৎ। শুভাশিষ। আরো বেশ কয়েকজন বাঙালি। সবাই হিন্দি বলছেন। মাঝে মাঝে বুড়ি ছুঁয়ে যাওয়া বাংলা। কিন্তু আমাদের কারোর মনে এ প্রশ্ন আসাটাও প্রশ্নাতীত হয়ে দাঁড়িয়েছে, দাদা গোটা সিরিজটা বাংলা ভাষায় করলে কী হত? গল্পটা তো পুরোটাই বাংলার। লিখছেন নীরাজ পাণ্ডের সঙ্গে দেবাত্মা মণ্ডল আর সম্রাট চক্রবর্তী। শেষের দুজনেই বাঙালি, নীরাজ পাণ্ডে কে বাদ দিলে। পরিচালনা করছেন দুই বাঙালি, দেবাত্মা মণ্ডল আর তুষার কান্তি রায়। তবে? কী হত যদি গোটাটাই বাংলা ভাষায় হত? বাকি ভারতীয়রা ডাবিং এ দেখত না হয়। যেমন এটারও বাংলা “ডাবিং” আছে। কিন্তু অরিজিনাল নয়। পুষ্পা যেমন আপামর ভারতীয় দেখে ফেলল, সে তো ডাবিং এই।
এখানে একটা কথা আছে, কেউ বলবেন মশায় রিচার্ড অ্যাটেনবোরো যখন “গান্ধী” বানাচ্ছেন তখন তো উনি গোটাটাই হিন্দিতে করতে পারতেন। কেন করলেন না? সে ছিল এক যুগ, ১৯৮২ সাল। আর এখন আরেক যুগ। ওটিটির যুগে কত কী সম্ভব হয়ে গেছে। আর তাছাড়া সেখানে চিত্রনাট্য লিখছেন যিনি জন ব্রাইলি, তিনি কি আর হিন্দি জানতেন? তাছাড়া সে সিনেমাটা হচ্ছিল গোটা বিশ্বের দর্শকের জন্য। যদিও হিন্দি ডাবিং সিনেমাটার হয়েছিল। কিন্তু এখন তো সব কত বদলে গেছে। চাইলে তো কত ভাবে কত কী করাই যেত। যেত নাকি? এত এত টাকা খচ্চা করে বিজ্ঞাপনও তো হচ্ছে সিরিজটার, মায় সৌরভ গাঙ্গুলিকে দিয়েও অবধি। কিন্তু অরিজিনাল ল্যাঙ্গুয়েজ? হিন্দি। গল্প? বাংলার।
আসলে আমরা বোধহয় আমাদের মান হারিয়েছি। সে জোর নেই। আমাদের কাজ দিলে, আমাদের নিয়ে কাজ করলেই এখন আমরা এখন বর্তে যাই। অমুক আজকাল হিন্দিতে কাজ করে! বলতে কেমন গর্ব লাগে না? আচ্ছা, সুচিত্রা সেন যখন ‘মমতা’’, কি ‘আন্ধি’’, কি ‘'দেবদাস’ ইত্যাদি সিনেমাগুলো করেছেন, তখনকার বাঙালিদের মনে হত, আরেব্বাস উনি হিন্দিতেও কাজ করছেন! এমন একটা কৃতার্থ ভাব থাকত? আমি যতটা জানি, থাকত না। কাজটা নিয়ে গর্ব অবশ্যই থাকত, কিন্তু ওই ‘বর্তে যাওয়া’ ভাবটা ছিল না। সত্যজিৎ রায়, উত্তম কুমার, হেমন্ত প্রমুখ অনেকেই হিন্দিতে কাজ করেছেন। আবার ঋষিকেশ মুখার্জি, বাসুদেব চট্টোপাধ্যায় সেভাবে বাংলা সিনেমা করনেনি, কিন্তু কোনোটা নিয়েই আমাদের এমন আজকের দিনের ‘'কৃতার্থ’ হওয়া ভাবটা ছিল না। বরং সত্যজিৎ রায়, কি মৃণাল সেন, তপন সিনহার কাজে ওদিকের কেউ কাজ করার সুযোগ পেলে নিজেদের ধন্য মনে করতেন, যা ওঁদের নানা সাক্ষাৎকারে ওঁরা খোলাখুলি বলেছেন। প্রসঙ্গত ইদানীং নানা পটেকারের সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে কথাগুলো বলা যায়। কিন্তু তাঁদের এই উচ্ছ্বাসের কারণ তো ছিল আলাদা। এ সব মানুষের কাজ মানে অনুপম উৎকর্ষতার কাজ। সত্যজিৎ, মৃণাল, তপন তো কিংবদন্তী। তাঁদের কাজ করাটা তো পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার।
কিন্তু আজকের এই হিন্দিবলয়ামুখী হওয়ার প্রবণতা তো কাজের মানের উৎকর্ষতার জন্য ততটা না, যতটা মার্কেট ইত্যাদির জন্য। হিন্দির মার্কেট এখন ভীষণ শক্তিশালী। তাকে টেক্কা দিতে পারে একমাত্র দক্ষিণ ভারতীয় ছবি। আর উৎকর্ষতায় এখন মালায়ালম আর মারাঠী ছবি একটা অন্য মাত্রা পেয়েছে, সে অন্য আলোচনা। সেখানে কতজন বাঙালি যাচ্ছেন সেও অন্য আলোচনা। ইদানীং বেশ কয়েকজন প্রথমসারির বাঙালি কলকাতার অভিনেতাকে বলতে শোনা গেছে মুম্বাইয়ের কাজ অনেক বেশি ডিসিপ্লিনড, অনেক বেশি প্রফেশনাল ওরা। তাই সেখানে কাজের অভিজ্ঞতাও অনেক ভিন্ন মাত্রার। মানে আরো বেশি সিরিয়াস আর লক্ষ্মীজনক।
সিরিয়াস সিনেমায় মারাঠি, মালায়ালম সিনেমা যে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাচ্ছে, কেন আমরা পাচ্ছি না, এ আলোচনা বৃথা। তিনজন মহিলা পরিচালক তিনটে সিনেমা বানালেন, 2024 সালে - ‘সন্তোষ’, ‘গার্লস উইল বি গার্লস’’ এবং ‘'অল উই ইমাজিন দ্যট লাইট’। তিনটে সিনেমাই বিশ্বের সিনেমানুরাগী গুণীজন দ্বারা প্রশংসিত হল। পুরষ্কার পাক চাই না পাক, আলোচনা হল। মজার কথা এই তিন মহিলা পরিচালকই নিজেদের অনুপ্রেরণায় কোনো না কোনো সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ, ঋত্বিকের নাম বলেছেন। মনে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক, তবে আমাদের কী হল? এ প্রশ্ন নিয়ে আমার এ লেখা না। আমার লেখা আমাদের সেন্টিমেন্ট আর ভিত্তিভূমি কি আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি? ইদানীং কয়েকটা বাংলা সিনেমা বক্স অফিসে ভালো করেছে। কিন্তু আমার ব্যক্তিগতভাবে খুব একটা আশাপ্রদ মনে হয়নি। অন্তত ভারতের অন্য ভাষায় কমার্শিয়াল সিনেমা যে মাত্রায় পৌঁছিয়েছে সেই তুলনায়। তবে এটা যেহেতু আমার মতামত তাই এ নিতান্তই সাবজেক্টিভ ব্যাপার।
কদিন আগে অনুরাগ কাশ্যপ বাংলা সিনেমা নিয়ে একটা নঞর্থক মন্তব্য করেছিলেন। কদিন আগে গৌতম ঘোষও বললেন। কেউ কেউ মৌখিকভাবে উত্তর দিয়েছেন বটে। কিন্তু আবার সেই হিন্দিবলয়ামুখী কাজে ঝুঁকে গেছেন। ফলে কথার ধারভার কমেছে। অন্য ভাষায় কাজ করাটা নিয়ে আমার ভাবনার জায়গা না, কিন্তু এদিকে তেমন কাজ হচ্ছে না বলে ওদিকে চলে যাওয়াটা ভাবনার। কাজের বৈচিত্র্য, বাজেটের অঙ্ক, মার্কেটের পরিসর - অবশ্যই ওদিকে বেশি।
বাংলা সিনেমার মান একদিন বিশ্বের দরবারে পৌঁছিয়েছিল। সত্যজিৎ, মৃণাল, ঋত্বিকের পরেও বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের হাতে তৈরি বেশ কিছু সিনেমা বিশ্বের নজর কেড়েছিল, যার মধ্যে “চরাচর” ফরেন ফিল্মের ক্যাটাগরিতেও অনেক দূর এগিয়েছিল। আজ সেদিন নেই। তার নানা কারণ নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু আমরা একদিকে হিন্দি আগ্রাসন বলে, আরেকদিকে যদি সেদিকেই ঝুঁকে পড়ি তবে তো ভাবনার। কদিন আগে ‘পাতাললোক’ এর যে দ্বিতীয় সিজন দেখানো হল, সেখানেও দেখা গেল নর্থ ইস্টের ভাষাতেই তাদের অংশটা দেখানো হল, তাদের দিয়ে হিন্দি বলানো হল না। তবে “খাকি”র এতবড় প্রজেক্টও বাংলায় হলে কী ক্ষতি হত? এত এত বড় বড় বাংলার অভিনেতা অমন করে হিন্দি বলে যাচ্ছে আর মাঝে মাঝে নমো নমো করে দু একটা বাংলা বলছে, দেখে খারাপই লাগল। তাই এইসব বকবকানি।