Skip to main content

 

সূর্যাস্তের ছবি আঁকছে।

ছেলেটার বয়েস বাইশ কি তেইশ হবে। ব্যাঙ্গালোরে চাকরি করে। আইটিতে। বাড়ি ফিরেছে। মা অসুস্থ। আইসিইউ-তে। ডাক্তার বলছে, আশা নেই। আর দু'দিন বড় জোর।

ভীষণ ঠাণ্ডা পড়ে গেছে। মোজা ঢাকা পা'টা চটির মধ্যে আলতো করে ঢোকানো। মাথায় নীল টুপি। একটা কালো জ্যাকেট, জিন্সের প্যাণ্ট পরনে। দাড়ি ভর্তি মুখ। দাড়িতে অল্প ব্রাউন কালারের ছোঁয়া। চোখ ফুল রিম কালো ফ্রেমের চশমা।

নার্সিংহোমের পিছন দিকটা বেশ নিরিবিলি। সামনে একটা পুকুর। সুন্দর করে ঘাস কাটা বড় লন। কয়েকটা এদিক ওদিক বাঁধানো বসার জায়গা। অরূপ ওরকম একটাতেই বসে আছে। সকাল আটটা। কেউ নেই চারদিকে। অরূপ সূর্যাস্তের ছবি আঁকছে।

ফোনটা ভাইব্রেট করল। কয়েকবার সচেতনভাবে ইগনোর করে ফোনটা ধরে বলল, বল। ওপার থেকে একজন মেয়ের গলা ভেসে এলো…

খেয়েছিস….

না

খেয়ে নে…. আমি অফিসে বেরোলাম। পরশু ছুটি দিচ্ছে। ফ্লাইট বুক করেছি। তুই হোয়াটসঅ্যাপে আমাকে তোদের লোকেশানটা পাঠিয়ে রাখিস…

আসিস না… জানিস তো এটা মফস্বল… এখানে ওভাবে থাকা যায় না… আর এদিকে কোনো হোটেল টোটেলও নেই….. আসিস না….

আসব। থাকব না ওখানে। আমি দেখেছি, ওখান থেকে কৃষ্ণনগর চলে এলে চাপ নেই।

অরূপ কিছু বলল না। সামনে দুটো কুকুর খেলছে। একটা ঘিয়ে ঘিয়ে রঙের, আরেকটা কালো। অরূপ উদাস চোখে তাকিয়ে। ওপাশ থেকেও কোনো শব্দ নেই। একটু পর বলল, রাখছি রে… আসছি শুক্রবার… লোকেশানটা পাঠিয়ে রাখিস… আর দমদম থেকে কীভাবে যাব একটা যদি অন্তত ক্লু দিয়ে রাখিস…..

=======

স্যার বিলটা….

অরূপ পেমেন্ট করে ক্যানটিনে এসে বসল। আইসিউ থেকে একবার ঘুরে এসেছে। একই রকম। জ্ঞান নেই। নার্স বলল, ক্রিটিকাল… ভীষণ ক্রিটিকাল।

অরূপ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে। বাড়ি যাবে। টোটো বা অটো কিছু একটা লাগবে।

টোটো বাড়ির সামনে নামিয়ে চলে গেল। অরূপ দরজার তালাটা খুলে ঘরে ঢুকল। গুমোট হয়ে আছে। জানলাগুলো একটা একটা খুলল। রোদটা ভালো উঠেছে। ঘরে রোদ এসে পড়ল। মায়ের মত।

ফ্রিজটা অফ্‌ রেখেছে। গীজারটা অন্‌ করল। ফোনটা নিল, টেক্সট করল, মিসিং ইউ। চারবার লিখল। ডিলিট করল। লাভ ইউ, তিনবার লিখল, হার্টের লাল ইমোজি দিল। ডিলিট করল। ফিলিং ট্যু ক্রাই… লাউডলি…..। ডিলিট করল।

পোশাক সব খুলে টাওয়েলটা জড়িয়ে বাথরুমে ঢুকল। দরজাটায় ছিটকিনি দিল। খুলে দিল। আবার ছিটকিনিটা দিল। আগে ঠাণ্ডা জল। তারপর গরম জল। ঠাণ্ডা জল বালতির মধ্যে তীব্র স্রোতে নামছে। গমগম আওয়াজ হচ্ছে। গলার কাছে দলা পাকানো কান্না। চুপ চুপ। গিলে ফেলল। এবার গীজারের কলটা খুলল।

=====

ছাদে এসে দাঁড়ালো। নীল ট্রাউজার আর সাদা টিশার্ট গায়ে। চুলটা আঁচড়ানো নেই। হাতে বাটিতে ম্যাগী। কাঁটা চামচটার কাঁটাগুলো ডোবানো ম্যাগীতে। হাতে গরমটা ভালো লাগছে।

সামনের বাঁশঝাড়টা পাতলা হয়ে গেছে। কালো কালো কয়েকটা পাখি কিচিরমিচির করছে। লাফাচ্ছে এ বাঁশ, ও বাঁশ। কী নাম যেন। মা বলতো। দোয়েল, না ফিঙে? মনে পড়ছে না। ছবিটা তুলে গুগুল লেন্সে ফেললেই নামটা বলে দেবে। থাক। ম্যাগীটার স্বাদটায় আরাম লাগছে।

ফাঁকা বাটিটা কার্নিশে রেখে সিঁড়ি ঘরটার দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসল। রোদটায় আরাম লাগছে। চারটে পঁয়তাল্লিশে অ্যালার্ম দিয়ে শুলো। কুঁকড়ে। ভ্রুণের মত। এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে? এ সব কিছু? নাকি ফিরে আসবে?

অ্যালার্ম বেজে উঠল। তাকালো। অন্ধকার অন্ধকার হয়ে এসেছে। শীত করছে খুব। ভয় করছে। কীসের ভয়? একা হয়ে যাওয়ার? বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার?.... সে তো ছোটো থেকেই…. এখনও অভ্যাস হল না?..... আশ্চর্য…!!

সিঁড়ির দরজায় তালাটা লাগিয়ে হুড়মুড় করে নামল নীচে। সকালের পোশাকটাই আবার পরে বাইরে এলো। আবার ঢুকল। মায়ের ঘরের আলোটা জ্বালল। ঘরটা এলোমেলো হয়ে আছে। আলনায় নাইটি, শাড়িগুলো অবিন্যস্ত। খাটের একদিকে এক পাটি চটি, আরেকটা? থাক, পরে দেখলে হবে। বাড়ির বাইরে এলো।

তালা দিল। টোটোর জন্য রাস্তায় এসে দাঁড়ালো।

=======

এই সময়টায় নার্সিংহোমের ওয়েটিংরুমের ভিতরে গিয়ে বসতে হয়। লনের দিকটার দরজাটা লক থাকে। ভিতরে গুমোট। ভিড়। কেউ কারুর সঙ্গে কথা না বলে বসে থাকে। ঘন্টার পর ঘন্টা। সামনে দেওয়ালে লাগানো নিঃশব্দ টিভির পর্দাতে চলছে অ্যানিমাল প্ল্যানেট, কী ন্যাশেনাল জিওগ্রাফি।

একদম শেষের সারিতে কোণার দিকে বসল। ইয়ারবাডটা কানে দিয়ে নেটফ্লিক্স অন্‌ করল। 'নার্কোজ' ওয়েবসিরিজটা চালালো। পাবলো এস্কোবার। এই নিয়ে তিনবার দেখছে। ভালো লাগছে। এ ভালো লাগাটা অন্যরকম। কেমন জানে না। কিন্তু ভালো লাগা।

রাতে সামনের দোকান থেকে রুটি আর তড়কা খেয়ে পেটটায় একটা অস্বস্তি হচ্ছে অনেকক্ষণ থেকে। বাইরে এসে দাঁড়ালো। সাড়ে বারোটা বাজে। রাস্তার ওই ফুটে ওষুধের দোকানটা ছাড়া সব বন্ধ। ডানদিকে হাঁটতে শুরু করল। একদম ফাঁকা রাস্তা। একটা বাইক গেল তুমুল স্পিডে। আবার সব শান্ত। একটু এগোলেই সব্জী বাজার। আরেকটু এগোলে পর পর দুটো ইলেকট্রনিক্সের দোকান। তারপর বিরাট মাঠ। আরেকটু এগোলে ক্লাব। দুর্গামণ্ডপ। খালের উপর সাঁকো। অতটা কী যাবে?

হাঁটতে হাঁটতে মাঠ অবধি এলো। মাঠের এক কোণায় স্লিপ, দোলনা বাচ্চাদের জন্য। উঠবে? কেউ তো নেই। ধীরে ধীরে দোলনাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। বসাই যায়। ছিঁড়বে না। বসে মোবাইলটা অন করল। গ্যালারিতে গেলো। তাদের ফ্যামিলি অ্যালবাম। তার আর মায়ের ছবির অ্যালবাম। বাবা তার অনেক ছোটোবেলাতেই মারা গেছেন। মা স্কুল টিচার ছিলেন। হাইস্কুলে ফিজিক্স পড়াতেন। এখনও চাকরি আছে। কিন্তু কী যে হল। মাথা ব্যথা, মাথা ব্যথা। তারপর জানা গেল মাথাতেই….

ফোনটা রিং হল। অনিন্দিতা।

হ্যালো…. কীরে কোথায়?

এই তো এখানেই…..

ঠাণ্ডা লাগাস না….ডিনার করলি?

হ্যাঁ…

তুই কিন্তু এখনও পাঠাসনি লোকেশান…. দেখ বি প্র‍্যাক্টিকাল…. আই ডোন্ট থিংক আই ক্যান মেক ইট…. আই মিন টু সি আন্টি…. যা তুই বলছিলি…. সেই বেসিসে বলছি…. আমি একটা ক্যাওসে এসে পড়ব… বুঝতেই তো পারছিস….

পাঠাচ্ছি…. পাঠাচ্ছি….

হুম….

ফোনটা দোলনায় রাখা। স্পিকারে। অনিন্দিতা অফিসের কোনো গোলমালের কথা বলছে। বলুক। হয় তো ও চাইছে তাকে ডিস্ট্র্যাক্ট করতে। বলুক। মাঠের ওইদিকে একটা বাড়িতে আলো জ্বলল। কাঁচের জানলায় ছায়া দেখা যাচ্ছে মানুষের। একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ আসছে। একদমই বাচ্চা। এবার আরো কয়েকজনের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।

মা তাকে একাই মানুষ করেছেন। একা। সম্পূর্ণ একা। এখনও একা। একাই যাচ্ছেন।

কী রে শুনছিস…. এই পয়েন্টটা নিয়ে আমাদের আগেও কথা হয়েছে না?.....

অরূপ বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, হয়েছে….

অনিন্দিতা বলে যাচ্ছে কথা। অরূপ অল্প অল্প দুলছে। বাচ্চাটা থেমেছে। আরো দুটো ঘরের আলো জ্বলে গেছে। আরো অনেকের কথা শোনা যাচ্ছে। অনিন্দিতা নয়….. ঠিক ওর মত নয় তো ও…. কোথায় যেন ছাড়াছাড়া… আরো একা হয়ে যাবে কি....... নিজের থেকে নিজেই একা…..

হঠাৎ স্ক্রিনে নার্সিংহোমের নাম্বারটা ভেসে এলো। অনিন্দিতাকে কিছু না বলেই ওকে হোল্ডে রেখে ফোনটা নিল….

“মিস্টার অরূপ বিশ্বাস বলছেন?... তাড়াতাড়ি নার্সিংহোমে আইসিউয়ের সামনে আসুন… আপনার পেশেন্টের অবস্থা ভীষণ খারাপ….. আসুন….”

অরূপ দৌড়াচ্ছে না। হাঁটছে। এ ফোনের মানে জানে। কোথাও একটা ছুটি মঞ্জুর হল, তার আর তার মায়ের একই সঙ্গে। এবারে দু'জনেরই ভ্যাকেশানে যাওয়ার সময়। একা যাবে। দু'জনেই। আলাদা আলাদা। কোথায় যাবে সে? গোয়া? মানালি? অরুণাচল?...

দৌড়াচ্ছে এবারে সে। ফাঁকা রাস্তা। একা দৌড়াচ্ছে। নার্সিংহোমের আলো দেখা যাচ্ছে। রাস্তায় এসে পড়েছে। মা একা বেরিয়ে যাচ্ছে। অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে। একা…. ভ্যাকেশানে। অনন্ত ভ্যাকেশানে। সে দৌড়াচ্ছে….কিন্তু আটকাতে চাইছে না। কাউকে আটকাতে চায় না সে…. না মা’কে… না অনিন্দিতাকে… না নিজেকেও..….. সে দৌড়াচ্ছে…. কার থেকে....? ….. কেন… কেন…কেন?