Skip to main content

 

নিবি…. অ্যাই নিবি… এদিকে আয়… এদিকে….

পঁচাশি নাম্বার বাস। অলকা'র পাশে গিয়ে নিবি বসল।

বৌদি তুমি…. এদিকে কোথায়?

আরে মেয়েটা তো শ্রীরামপুরে থাকে রে….

ওহ…. হ্যাঁ তো… ভুলে গিয়েছিলাম…. তুমি জানলাটা দিয়ে দাও…. বৃষ্টির ছাঁট আসছে….

আরে না…. এইটুকুতে কিচ্ছু হয় না… তুই কোথায় যাচ্ছিস?

এই শ্যামনগর যাব গো…. একটা মানসিক পুজো আছে…..

অলকা নিবি'র দিকে তাকালো। নিবিড়ভাবে। নিবি'র হাতে হাতটা রেখে বলল, চুলে পাক ধরছে যে রে…. আমাদের কখন যে এত বয়েস হয়ে গেল….

নিবি হাসল। বলল, দাদা থাকতে তোমাকে যেমন দেখেছিলাম… তুমি কিন্তু এতগুলো বছর পেরিয়েও একই আছ…..

অলকা হাসল। বলল, তোর দাদা যাওয়ার পর বুঝেছিলাম জানিস… আমাদের পরিবারে এত পুরুষ আছে।

নিবির চোয়ালটা শক্ত হল। ইঙ্গিতটা তো তার দিকেও। মলয়কে সে তো জানে। তার স্বামী। প্রফেসার। ইকনমিকসের। বৌদি সেই থেকে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক শিথিল করে দিয়েছিল।

অলকা বলছে, আসলে জানিস তোর দাদা চলে গেল আর একটা পাঁচিল ভেঙে পড়ল। আমি ভয় পেলাম, আমাদের পাড়াটা তো ভালো ছিল না বল, পাশেই ওই ক্লাব, উল্টোপাল্টা ছেলেদের আড্ডা। অথচ দেখ বেশিরভাগ আক্রমণ এলো পরিবারের পুরুষদের থেকেই। একদিন বসে চা করছি, বিকেলে। গ্যাসটা শেষ। সদ্য তোদের দাদা গেছে। আমি গ্যাস বুক-টুক করতে শিখিনি। গ্যাস শেষ। স্টোভে চা বসিয়েছি। নিতু'র বর এসে হাজির। আমার পাশেই বসল। বলল, মেয়ে কোথায়? আমি বললাম, কলেজে। তখনও বুঝিনি জানিস ওর মতলব কী। আমার আরো কাছে এগিয়ে এসে বসল, বলল, আরে আজ অফিসের কাজে এদিকে আসতে হল, মনে হল তোমাকে একবার দেখে যাই, একা মানুষ কী করছ। যদি কোনো কাজে লাগি। কী বলো? আমার কাঁধে হাত রাখল। আমি এত ভেবলে গেছিলাম….., অলকা মুখে আঁচল চেপে হাসতে শুরু করল। হাসতে হাসতে চোখে জল চলে এলো। নিবি হাসার চেষ্টা করল। পারল না। বাইরে ভীষণ বৃষ্টি হচ্ছে। তার গায়েও অলকাকে ছাপিয়ে অল্প অল্প জল আসছে। নিবি ওড়নাটাকে গলায় পেঁচিয়ে নিল।

অলকা বলছে, তারপর থেকে ওর ঘন ঘন আমাদের ওদিকে অফিসের কাজ পড়তে লাগল। আমি কাকে বলি? না নিতুকে বলতে পারি, না তোকে। তোরা হয় তো আমাকেই দুশ্চরিত্র দেগে দিবি। শেষে কাকে বললাম জানিস? পাড়ার একজন বয়স্ক মানুষকে। বললাম, দিদি, অমুককে যদি আমাদের বাড়ি ঢুকতে দেখেন একটু আসবেন?

ব্যাখ্যা করতে হল না জানিস। উনি বুঝে গেলেন। সে মানুষটা আমাদের আত্মীয় জেনেও কোনো প্রশ্ন করলেন না। অথচ এর সঙ্গেই আমাদের কী ঝামেলা হয়েছিল একবার! বেড়াল নিয়ে। ওদের বাড়ি গুচ্ছের বেড়াল। যখন তখন আমাদের এদিকে চলে আসত। সেই নিয়ে। তো সেই মহিলা এসে বসতে শুরু করলেন। তারপর একদিন কী বললেন জানিস, অলকা, বেড়া দাও, নিজের বেড়া নিজে দাও। মুখ খোলো। জিজ্ঞাসা করো, এই যে তুমি এত ঘন ঘন আমাদের এখানে আসো….. নিতু জানে পরেশ?

কাজ হল জানো। এই ছোটো কথাটা আমার মাথায় আসেনি কেন ভাবতে লাগলাম।

নিবি বলল, কেন মলয়?

অলকা নিবি'র হাতটা ধরে বলল, সে তো তুই নিজেই বুঝে গিয়েছিলি বল…. আমি তোর বাড়ি যাওয়া বন্ধ করলাম মলয়ের জন্য না রে….তোর চোখের দিকে তাকাতে লজ্জা লাগত আমার।

বাস চলছে। দাঁড়াচ্ছে। দু'জনেই চুপ। নিবি'র হাতটা অলকা'র হাতের মুঠোর মধ্যে ধরা। অলকা'র হাতের তাপে আরাম লাগছে নিবি'র।

হঠাৎ অলকা হো হো করে হেসে উঠল। বলল, এই তোর রেখাদিকে মনে আছে?

নিবি ভুরু কুঁচকে বলল, কে রেখাদি?

আরে ওই যে সারাক্ষণ লালপেড়ে সাদা শাড়ি পরে থাকত, কী এক আশ্রমে যেত। আমাদের দেখলেই ব্রত উপোস, ঠাকুর দেবতা এইসব নিয়ে জ্ঞান দিত রে… মনে নেই…

নিবি বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ…. কী হল তার?

আরে শোন। তুই তো জানিস এমনিতে আমার ধর্মকর্মে কোনোদিন মতি নেই। সে ঘনঘন যাতায়াত শুরু করল। আমাকে দীক্ষা নেওয়া করিয়ে তাদের দলে ভেড়াবেই। আমি কেন মাছ-ডিম খাই, আমি কেন সাদা শাড়ি পরি না। আমি কেন তীর্থে যাচ্ছি না। আরে মাথা খারাপ করা শুরু করে দিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে না। তোর দাদা যাওয়ার বছরখানেক বাদে। মিথ্যা বলব না নিবি, আমারও মনে হয়েছিল, গেলেই হয়…. সব তো ফাঁকা ফাঁকা লাগছে তখন…. কী করব? গেলাম ক'দিন আশ্রমে। কী আশ্চর্য জায়গা নিবি! সব যেন দম দেওয়া পুতুল। নিজেকে হিপনোটাইজ করে চরকির মত ঘুরছে আর বলছে, কী শান্তি দিদি… আপনিও চলে আসুন…. ঈশ্বর ছাড়া কী আছে জীবনে? সব অনিত্য।

অলকা আবার হাসতে শুরু করল। বলল, তদ্দিনে তো আমার জিভে খই ফুটতে শুরু করেছে নিবি। বললাম একদিন, দেখুন আমার জীবনে ঈশ্বর ছাড়া অনেক কিছু আছে…. সিরিয়াল আছে, আমার বাগান আছে, সেলাই আছে, মেয়েটা আছে। তারা বলল, ওসব মায়া। আমি বললাম, হ্যাঁ তো! আমার জীবনে মায়া আছে…. ব্যস… আর কী চাই? তারা বলল, ঈশ্বরের সুখ যেদিন পাবে…. আমি বললাম, আমার দ্বারা হবে না দিদি… আমাকে ছেড়ে দিন…. আমার অনেক সুখ আছে….

রেখাদি তো আসা-ই ছেড়ে দিল। আমিও আর যোগাযোগ করলাম না। একদিন দেখি পাড়ায় খুব হইচই। রেখাদির বর নাকি কোন কলেজের ছাত্রীর সঙ্গে পালিয়েছে। আমি দু'দিন চুপ করে থাকলাম। তারপর একদিন বিকেলে গেলাম। বিশ্বাস করবি না মানুষটা কেমন পাথরের মত বসে থাকল। একটা কথাও বলল না। আমি আরো দু'দিন গেলাম। এক অবস্থা। ভয় পেলাম, কোনো ভুলভাল কিছু ঘটিয়ে না ফেলে।

তারপর জানিস ধীরে ধীরে রেখাদির মধ্যে কী একটা পরিবর্তন হল। রঙিন শাড়ি পরতে শুরু করল। শাড়ি ছেড়ে সালোয়ারকামিজ পরা ধরল। তারপর চুমকিরা কী সব পরে না…. আমি অতশত নাম মনে রাখতে পারি না…. সে সব পরা শুরু করল। পাড়ায় কত আলোচনা ওকে নিয়ে। কিন্তু সে বেটি কিচ্ছু গায়ে মাখে না। জুম্মা ড্যান্সে যায়। সাঁতার শেখে। এখন বুটিকের কাজ শিখে বাড়িতেই ওসব করে।

বলেই অলকা আবার হাসতে শুরু করল। বলল, একদিন আমি বললাম, তা দিদি তোমার ঠাকুরের কী করলে?

রেখাদি চোখদুটো বড় বড় করে বলল, বরের সঙ্গে সঙ্গে ওকেই দিয়েছি খেদিয়ে….. একাই ভালো আছি রে….।

নিবি অলকার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি সত্যিই ভালো আছ তো বৌদি…. বিশ্বাস করো এমন একটা অপরাধবোধ আমাকে তাড়া করে নিয়ে বেড়ায় আমি তোমার সঙ্গে ঠিক করে কথা বলতে পারি না…. নইলে কাঁকিনাড়া আর কদ্দূর বলো…. আসা যায় না?

অলকা বলল, ওসব ভুলে যা নিবি। তুই আমি সব এ সমাজে আছি মানে পুরুষের আখড়ায় আছি….. ওসব হবেই…. নিজেকে বাঁচিয়ে চলতে শিখতে হবে…. জঙ্গলে বাঘ আছে বলে কী হরিণ নেই নিবি? আছে। লালসা পৌরুষের উপচ্ছায়া নিবি। চাইলেই কি আর ওরা ছাড়তে পারে?

নিবি বলল, তাই বলে সবাই তো ওরকম নয় বলো…..

অলকা হাসল। বলল, যা, তোর স্টপেজ চলে এলো…. আসিস…

নিবি বলল, তুমি এসো না একদিন…..

অলকা বলল, মলয় যদি চলে ফিরে বেড়াত যেতাম রে…. ওরকম কথা বন্ধ বিছানায় পড়ে আছে….. থাক থাক…. ওর মনে হবে আমি প্রতিশোধ নিতে গেছি…. থাক… তুই আসিস বরং।

বাস চলছে। অলকা জানলার বাইরে তাকিয়ে। এদিকে বৃষ্টি হয়ে গেছে আগেই। কী সবুজ চারদিকটা! ঘুম পাচ্ছে। কদ্দিন পর এত কথা বলল। কদ্দিন পর অতীতটা এত জ্বলজ্বল করে সামনে এলো। ক'টা লাইন মাথায় এলো। মোবাইল বার করে লিখবে ভাবল। লিখল না। পরে লিখবে। মাথায় থাকুক। আরেকটু জারিত হোক। জীবন জারিত না হলে বড্ড পানসে। ভালোবাসাও।