Skip to main content

 

111.jpg

ভালো হওয়া আর ন্যাকা হওয়ার মধ্যে পার্থক্যটা স্বামীজি হাড়েহাড়ে বুঝেছিলেন। স্বামীজির চিঠিপত্রগুলো তার জ্বলন্ত প্রমাণ। ভালোর উপর অনুরাগ জন্মানো সুশিক্ষার একটা বড় সাধন।

ইদানীং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে শিরোপা পাওয়া ইউটিবারের রুচিবোধ নিয়ে ভীষণ একটা কাণ্ড ঘটেছে। সে একটা “খিল্লি” প্রধান শো-তে পিতামাতার সঙ্গম বিষয়ক “মজাদার” মন্তব্য করে। এবং সবাই হেসে লুটোপুটি খেতে থাকে। ইউটিউবার কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যায়, সে একজন আভূষণে ভূষিত “ইনফ্লুয়েন্সার”, যে সে নয়। যা হওয়ার তা হল। হইহই পড়ে গেল। এফআইআর হল। সে ক্ষমা চাইল।

তারপর? হে হে। তারপর কিছু না। আবার যেই কে সেই। সবাই ন্যাকা সেজে যাব। দিনের পর দিন দেখা যাচ্ছে পড়াশোনার বয়সে যৌন বিকার বাড়ছে। আমরা আধখানা চোখ বন্ধ করে আছি। ছেলের মোবাইলে বান্ধবীর স্কার্ট ওড়া ছবি, তাদের ছবি নানা কলাকুশলীতে কদর্য, অশ্লীল করে বন্ধুদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ঘুরে যাচ্ছে। কেউ আত্মহত্যা করছে। কেউ লজ্জায় জড়সড় হয়ে যাচ্ছে। কেউ অবসাদে ডুবে পড়াশোনায় ফোকাস হারাচ্ছে। মেয়েদের অভিভাবকেরা মেয়েদের আরো সাবধান হতে বলছে। ছেলেদের অভিভাবকেরা কেউ জেনেশুনে চোখ বন্ধ, কেউ মেরেধরে অসহায়, কেউ বুঝিয়ে বুঝিয়ে ক্লান্ত। ওদিকে সরস্বতী পুজোর দিন শিক্ষক মদের গ্লাস আর বোতলের ছবি দিয়ে ইনস্টাতে পোস্ট দিচ্ছে - এ-ই আমার দেবীর আরাধনা। তিনি ভাবছেন তিনি উন্নত, উদার, প্রগ্রতিশীল মানসিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। কিন্তু অপরিণত মস্তিষ্কে এর ফল হচ্ছে বিপরীত। এমন উদাহরণ অজস্র।

আজকাল ভালো আর ন্যাকা - সমার্থক শব্দে ব্যবহার হচ্ছে। আমরা এটা মেনে নিয়েছি যে আদতে কেউ ভালো হতে পারে না। পুলিশ তথা আইন-আদালতের ভয়ে, কিছু সামাজিক সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ে, বা আরো নানাবিধ চাতুরীতে আর ভয়েই মানুষ ভালো সেজে থাকার ভান করে। ভিতরে ভিতরে সবই ওই লুচ্চা প্রকৃতির। একটা অদ্ভুত সিনিসিজমকে আমরা রিয়েলিজম বলে চালিয়ে যাচ্ছি। আর সেখানে সাহায্য করছে আমাদের অধুনা আবিষ্কৃত বিনোদনের মাধ্যমগুলো। ওটিটিতে নানা সিরিজ, যার অধিকাংশই অন্ধকার জগতের গল্প। ওদিকে রিলস, শর্টসে যৌনতার লাগামছাড়া সুড়সুড়ি। অন্যদিকে আবার ধর্ম জগতে নতুন হাওয়া। সংস্কারি হওয়ার হাওয়া। সেটা যে কী জিনিস আজও স্পষ্ট নয়। এর মধ্যে বাচ্চাগুলো বড় হচ্ছে।

রামকৃষ্ণদেব বলতেন, চারাগাছে বেড়া দিতে হয়। পরে সেটা গুঁড়ি হয়ে গেলে হাতিও বেঁধে রাখা যায়।

এখন এই বেড়াটা কী?

বাচ্চারা প্রভাবিত হয়, অনুকরণ করে - এ ওদের ধর্ম। কিন্তু একটা বাচ্চাকে বাজে প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা কদ্দূর সম্ভব আজকের দিনে? তাকে তো বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে রাখা যাবে না। তবে?

তার উপর একটা সজাগ-সতর্ক, দরদী খেয়াল রাখা ছাড়া সত্যিই কী কোনো উপায় আছে? যদি কিছু অসঙ্গতি চোখে পড়ছে সঙ্গে সঙ্গে সজাগ হওয়া। তার সঙ্গে কথা বলা। কিন্তু সে বলতে না চায় যদি?

এইখানেই একটা বড় সমস্যা। নিজেকে তার আস্থাভাজন শ্রোতা হিসাবে উপযুক্ত করা। সে এমন কিছু বলবে যা শুনে প্রথমে আমি হয় তো ধাক্কা খাব, বিচলিত হব। কিন্তু সেটা বাইরে প্রকাশ করা যাবে না। মুখের হাবভাব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করতেই হবে। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। এটা বুঝতে হবে আমাদের ছোটোবেলা আর তাদের ছোটোবেলার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য। স্মার্টফোন যে আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলেছে সমাজের সব স্তরে, তার সঙ্গে যুঝে যাওয়ার কৌশল আমরা এখনও শিখে উঠতে পারিনি অভিভাবক হয়ে। আমাদের নতুন করে অভিভাবকত্ব শিখতে হবে। পুরোনো ছাঁচ ফেলে নতুন ছাঁচ গড়তে হবে।

একটা বাচ্চার ভিত কী হতে পারে চরিত্রগঠনের শিক্ষার?

আমার মনে হয় একটা উদার মূল্যায়নের শিক্ষা। তাকে নিন্দা করার প্রবণতা থেকে মুক্ত করতে হবে। সেটা তখনই সম্ভব যদি নিজে নিন্দা করার প্রবণতা থেকে মুক্ত হই। যে জিনিসে সে আকর্ষণ অনুভব করছে, সেটা তার পক্ষে কতটা ভালো বা মন্দ। কোনটা তার জীবনের লক্ষ্যের জন্য অনুকূল আর কোনটা প্রতিকূল? এ মূল্যায়ন তখনই সম্ভব যদি সে অযথা নিন্দা করার প্রবণতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে। নিন্দার আড়ালেই প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষভাবে যত বিকার এসে জড়ো হয়। কোনো কিছুকে ক্ষতিকর জানা, তার মূল্যায়ন। কিন্তু কোনো কিছুকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ছোটো দেখানো নিন্দা। এই মূল্যায়নের অভ্যাস অনেকভাবে হয়। বড়দের দেখে হয়। বই পড়ে, সিনেমা দেখে হয়।

অচেতনভাবে সব কিছুর মূল্যায়ন তো সবাই সব সময় করেই যাচ্ছে। কিন্তু সেটাকে সঠিক অর্থে করার শিক্ষা খুব কম বাচ্চার কপালেই জোটে। যাকে আধুনিককালে ক্রিটিকাল থিংকিং বলা হচ্ছে। আমাদের সমাজে নিন্দা আর নেগেটিভ সমালোচনার প্রবণতা লাগামছাড়া। আর ইন্টারনেটে নানা সামাজিক মাধ্যমে এসে সেটা আরো বেশি ক্ষুরধার এখন। এই অযথা নিন্দা আর নেগেটিভ সমালোচনার অভ্যাস যদি নিজের ছাড়ানো না যায়, তবে মৌখিক বা প্রহারের সঙ্গে প্যাকেজে নীতিশিক্ষায় কোনো লাভ হবে না। মনে রাখতে হবে শিক্ষা মানে আলো। আলোর কাজ প্রকাশ করা, প্রকাশিত হয়ে। সেকি নিন্দা আর নঞর্থক সমালোচনায় হবে?