Skip to main content

 

001.jpg

যা আভাসে মেলে, তা নিয়ে কাটাছেঁড়া করা যায় না। সমুদ্রের সামনে দাঁড়ালে সমুদ্রের যে বিশালত্ব মুগ্ধ করে, সে বিশালত্বের অনুভব এক আভাসমাত্র। পূর্ণ জ্ঞান নয়। মানুষের অনুভবে ভালোবাসা, আনন্দ, মূল্যবোধ এ সবই এক আভাস। তাকে পূর্ণরূপে জানা সম্ভব নয়। এ বোধই প্রজ্ঞা।

শ্রদ্ধেয় অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের লেখা হাতে এলেই আমার হৃৎস্পন্দন দ্বিগুণ হয়। অনেকটা নিউ জলপাইগুড়ি ছেড়ে গাড়ি যখন পাহাড়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে, তখন যে অনুভব আমার হয়, খানিক তেমন। যে ভাষাকে ভাবি লেখার মাধ্যম ছাড়া উচ্চারণ করা যায় না, অলোকরঞ্জনের ভাষায় সে শব্দও কী সাবলীলভাবে উচ্চারিত হয়।

গম্ভীর শব্দটা মানুষের চেতনায় দু ধারায় প্রবাহিত হয়। এক, বিষয়বস্তুগত গম্ভীরতা, যেমন আবহাওয়া পরিবর্তন ও মানবসমাজে তার প্রভাব ইত্যাদি। দুই, ভাবগম্ভীরতা। এই দ্বিতীয় শ্রেণীর গাম্ভীর্যতার আকাল আজ সৃষ্টিতে। ভাবগম্ভীর মানে সে জটিল নয়, সে সরল, সে গভীর। সে বিশ্ববোধের অনুশাসনে সংযত। যা কিছু শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, তার মধ্যে সরলতা এক বড় গুণ। ভাবগম্ভীরতার মধ্যে যে তন্ময়তা, অলোকরঞ্জনের ভাষায় সে প্রতি পদে পদে। পড়তে পড়তে চিত্তশুদ্ধি ঘটে পরতে পরতে।

“কবি কী বলেছেন”, এ বাক্যবন্ধ শুনলে আমার গায়ে জ্বর আসে। আমার চার দেওয়ালে আবদ্ধ ক্লাসরুমের কথা মনে পড়ে। যেখানে বসন্তের প্রবেশাধিকার ছিল না, কিন্তু বসন্ত বিষয়ক কবিতা শিক্ষকের সামনে রাখা টেবিলে, আসন্ন ব্যবচ্ছেদের দুর্ভাগ্যে শঙ্কিত। এই বইটা রবীন্দ্রনাথের আরোগ্য কাব্যগ্রংন্থের একটা কবিতার সঙ্গে বাস কিছুক্ষণের জন্য। বাস না, ভুল বললাম, যাত্রা বলা যায়। “আ রিয়েল পেইন” সিনেমার একটা দৃশ্য ও সংলাপের কথা মনে পড়ল। ট্যুর গাইড এক গণসমাধিতে এসে নিপীড়িত, অত্যাচারিত মানুষের পরিসংখ্যান, ঐতিহাসিক বর্ণনা ইত্যাদি দিয়ে যাচ্ছেন। সব বর্ণনা নির্ভুল, পুঙ্খানুপুঙ্খ। হঠাৎ সিনেমার যে মুখ্য চরিত্র, সেই তরুণ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলছে, নীরবতাও তো এক অনুভব করার মাধ্যম। আপনি একটু চুপ করুন। আমাদের অনুভব করতে দিন।

অলোকরঞ্জন তাঁর ভাবের গভীরতায় আর উজ্জ্বল ভাষার আলোয় এক এক বিন্দু নীরবতা বুনে যান এই কবিতার আলোচনা করতে গিয়ে। পাঠক ভাবে। আগের ভাবনার সঙ্গে এখনের ভাবনার সাযুজ্যগ্রন্থি নির্মাণ করে। সমৃদ্ধ হয়।

যাঁরা অলোকরঞ্জনের এ আলোচনা সাক্ষাতে শুনেছিলেন তারা ভাগ্যবান। যারা আমরা পড়ার সুযোগ পাচ্ছি তারাও কম নই। কবিতা তো শুধু মন পড়ে না, গোটা শরীর মন আত্মা পড়ে। যাদের কাছে কবিতা এমনই তাদের কাছে এ আলোচনা হিমালয়ের কোনো তুষারশুভ্র শৃঙ্গের মাধুর্য আস্বাদনের সমান, অন্তত আমার তাই মনে হল।

 

002.jpg

003.jpg

 

(প্রকাশক - রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়)

পলাশের ছবি দিল Debasish Bose

Category