ভালোবাসলে নিজের দীনতা খেদের জিনিস হয় না। কারণ ওই একটা জায়গাতেই নিজের দীনতাকে কোনো জাস্টিফিকেশান ছাড়াই রাখা যায়। ভালোবাসার মানুষটার সামনে দাঁড়িয়ে অনায়াসে বলা যায়, "হ্যাঁ এই জায়গাটায় আমি এমন করুণভাবেই নিঃস্ব, এ পূরণ হওয়ার আশাও দেখছি না। তুমি রাখলে আছি, না রাখলে দুর্গতির একশেষ।" বিশ্বাস থাকে সে তাকে মাড়িয়েও যাবে না, আবার সবার সামনে এনে বিব্রতও করবে না।
চায়ের দোকানটা ভীষণ ছোটো। আয়োজন বলতে একটা ছোটো উনুন। দুটো পুরোনো চায়ের পাত্র। কয়েকটা পুরোনো কাপ। দুটো ভাঙা বেঞ্চ। একটা ছোটো চৌকি। এ দোকানে যারা চা খেতে আসেন তারা কেউ-ই সমাজের মধ্য বা উচ্চস্তরের মানুষ নন। চা পাতাও দার্জিলিং বা আসামের কুলীনগোত্রের নয় সে বলাই বাহুল্য। যে মানুষটার চায়ের দোকান তাকে কুড়ি বছর আগে দেখেছি, আজও দেখি। সংসারে কত কী বদলে গেল কিন্তু সে শুধু বৃদ্ধ হল, ঝুঁকে পড়ল, রুগ্ন হল। চা ছাঁকতে হাত কাঁপে। দাঁড়াতে পা কাঁপে। আমি কয়েকবার তার দোকানে চা খেতে খেতে ভেবেছি হা ঈশ্বর, এ মানুষটা শুয়ে পড়লে একে দেখবে কে? তার দোকানের দেওয়ালে টাঙানো দেবতারা নিয়ম করে পুজো নিয়েছেন সকাল সন্ধ্যে দেখেছি, কিন্তু কী দিয়েছেন সে জানি না।
শীতকাল। একদিন দেখি তিনি শুয়ে দোকানের বেঞ্চে চাদর মুড়ি দিয়ে। এক বয়স্কা মহিলা বসে বেঞ্চে। কালো গায়ের রঙ। গায়ের শাড়িটা পুরোনো, কিন্তু পরিষ্কার। কপালে সিঁদুরের টিপ, সিঁথিতে সিঁদুরের প্রলেপ। চায়ের অজুহাতে গেলাম। বুঝলাম উনি ওঁর সহধর্মিণী। চা খেয়ে চলে এলাম।
এরপর মাস খানেক পরে আবার দেখলাম। বৃদ্ধ উঠে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু শরীরে সে বল নেই। বয়স্কা মহিলা পাশে বসে গল্প করছেন। আবার চায়ের আছিলায় দাঁড়ালাম। বৃদ্ধার মুখটা অল্প তেজের আলোয় ভালো করে দেখলাম। কোথাও কোনো উদ্বেগ নেই, দুশ্চিন্তার ছাপ নেই। বুঝলাম ঈশ্বর কোন দিক থেকে বৃদ্ধের প্রার্থনার উত্তর দিয়েছেন। বৃদ্ধের অশক্ত অসহায় শরীর, আর এঁর শান্ত দৃঢ় মুখমণ্ডলের উপর আঁকা সিঁদুরের টিপের থেকে বড় কবিতা পড়েছি বলে মনে হল না। বৃদ্ধ হাত বাড়ালেন। বৃদ্ধা হাতটা ধরে দোকানের বাইরে ধীরে ধীরে নিয়ে গেলেন। বৃদ্ধ ন্যুব্জ শরীরে রাস্তার দিকে পেছন ফিরে, পাশে ড্রেনের দিকে ফিরে দাঁড়ালেন। বৃদ্ধা রাস্তার দিকে ফিরে একটা হাত বৃদ্ধের কাঁধের মধ্যে দিয়ে চালনা করে বেষ্টনী তৈরি করলেন। অবশ্যম্ভাবী অথচ কারোর সাহায্য না পেলে যে কাজটা আত্মমর্যাদার পক্ষে বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়াতো তাই কত সহজে হয়ে গেল। ভালোবাসা ছাড়া মানুষের নিজের মর্যাদা রাখার আর কী আছে?
তাদের দোকানের সামনে দিয়ে এত বড় সংসার কী সাবলীল গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। কত অহংকার, কত আস্ফালন, কত আকাঙ্খা, উচ্চাশা কী অনায়াস উপেক্ষায় এদের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে। ঈশ্বরের কাছে, মানুষের কাছে বড় কিছু প্রত্যাশা রাখার দিন এদের নেই। কিন্তু প্রতিদিন হাজার তুচ্ছতার মধ্যে যে জীবনটা এরা যাপন করছেন তার অনুভবকে বিচার করে মূল্যায়ন করব এতটা ক্ষমতা আমার নেই। মানুষকে বুঝতে, ভালোবাসতে শ্রদ্ধাটুকুই লাগে। জ্ঞান লাগে না। চিকিৎসক মানুষের শরীর আর মনের অসুস্থতার খেয়ালটুকুর খবর অবশ্যই জানেন। কিন্তু তার হৃদয়ের গভীরে বাস্তবে অবাস্তবে, যুক্তিতে-অযুক্তিতে মিলিয়ে যে স্রোত, তাকে জানবে কী দিয়ে মানুষ, এক বিনীত শ্রদ্ধা ছাড়া?