Skip to main content

বাচ্চাগুলোকে প্রতি শনিবার দেখি শনিমন্দিরের সামনে ভিড় করে। ওরা রেলকারখানার আশেপাশে ঝুপড়িতে, ভাঙা কোয়াটার্সে থাকে। কারোর বাবা রিকশা চালায়, কারোর বাবা জুতো সেলাই করে, কেউ দোকানে কাজ করে। অবাঙালিই বেশি।
      শনিবারে বড় থালায় ফল কাটা হয়, ওরাই কাটে। ওরা প্রসাদ দেয় পথচলতি মানুষদের, ওরাই মুঠো করে বাড়ি নিয়ে যায়। খালি পা, ছেঁড়া জামা, রোগা শরীর, মুখ ভর্তি উদ্দাম চঞ্চলতা, হাসির হুল্লোড়, তাদের কলকলানিতে মন্দিরের চাতালে প্রতি শনিবারেই উৎসবের আয়োজন।
      ওই মন্দিরে একটা বাৎসরিক উৎসব হয়। খিচুড়ি ভোগ হয়। প্রচুর মানুষ প্রসাদ নিতে আসেন। সেখানেও ওরা হাত লাগায় বড়দের পাশাপাশি। ক্লাবের দাদাদের সাথে সাথে ঘোরে, সাহায্য করে। কেউ গাছে চড়ে, কেউ রিকশায় বসে, কেউ রাস্তার পাশে রাখা বেঞ্চে শারীরিক কসরত করতে ব্যস্ত। সবার সেদিন নতুন জামা। কে দেখল, কে উপেক্ষা করে তাকালো, কে দূরছাই করল, তাতে সেদিন যেন ওদের বিন্দুমাত্র ক্ষোভ, দৃষ্টিপাত নেই। ওদের আছে শনি ঠাকুর।
      আজ দেখলাম তারা অনেকেই গোল হয়ে বসে মোমবাতি দিচ্ছে। তাদের ময়লা জামা, নোংরা ধুলোবালি লাগা প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা মুখের উপর সেই ভিজে মাটিতে না দাঁড়াতে চাওয়া অবাধ্য মোমবাতিগুলোর আলোর উজ্জ্বল প্রভা ছড়িয়ে। আমার মনটা এত ভরে গেল। আশেপাশের সব বড় মানুষের বাড়ির আলোকসজ্জা কৃত্রিম মনে হল। যেন ফুরিয়ে যাবে বলেই জ্বলে আছে।
      মন্দিরের একটু দূরে খানিক অন্ধকারে একজন মুচি বসে। তার ছেলে একটা নাইলনের ব্যাগ হাতে খালি পায়ে দাঁড়িয়ে, বাবা আজ তাড়াতাড়ি দোকান গোছাচ্ছে, সে অপেক্ষায়। লম্ফটা নিভিয়ে, বসার বস্তাটা যখন নিজের ব্যাগে ভরছে তার বাবা, বাচ্চাটা বলল, একটা চরকির প্যাকেট কিনব?
      বাবা লুঙ্গির খাঁজে তৈরি পকেটে হাত ঢুকিয়ে কিছু টাকা তার হাতে দিয়ে বলল, একটা তুবড়িও কিনিস, তোর মা খুব ভালোবাসে।
      বাচ্চাটা দৌড়ালো। সামনেই চৌকির উপর অস্থায়ী বাজির দোকান। তার পিছনে দৌড়াল আরো কয়েকটা কচিকাঁচা। চরকি কিনবে না হয় একজন, তার আলোর ঘূর্ণি দেখতে তো সবাই পারে, তাই না?
      ততক্ষণে মোমবাতির সারি রাস্তার কিনারা ছুঁয়েছে। আলোর মধ্যে স্থির হয়ে মন্দিরে বসে শনি ঠাকুর। ভয়ের ঠাকুর। অমঙ্গলের ঠাকুর। বাচ্চাগুলোর কাছে যার সে ভয়ের রূপ নেই তার। কিসের ভয় দেখাবে? বিধাতাই ভয়ে মুখ লুকিয়ে, অনেক প্রশ্নের উত্তর যে তারই নেই। তাই তিনিও এই ধুলামাখা হাতের খেলার সাথী। যাদের আলো অন্ধকারের ভয়ে উদ্বিগ্ন শিখায় জ্বলে নেই, প্রাণের আনন্দেই জ্বলে আছে।
      চারদিকে বাজির আওয়াজ, আলোর উল্লাস। আমার মন আলোকিত করে ওই মোমবাতির আলোয় ধোয়া হাসি।