Skip to main content

 

001.jpg

 

নৌকাটা ঘাটে বেঁধে মাঝি পাড়ে নেমে দেখল শিমুলে ছেয়ে আছে মাটি। মাঝি কয়েকটা ফুল তুলে গামছায় ভরল। সন্ধ্যে হচ্ছে।

গ্রামের রাস্তায় ঢুকতেই শুনতে পেল যেন কেউ ডাকছে, হরিশ…. হরিশ… এদিকে…. এই এদিকে…..

অন্ধকার হয়েছে। হরিশ বুঝল কার গলা। ছোট খালটা বেড় দিয়ে হোগলা বনের পিছনের মাঠে এসে দাঁড়ালো। পাখি গঙ্গার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে। সে এসেছে যেন বুঝতেই পারেনি।

হরিশ মাঠে বসে পড়ল। পাশে গামছা খুলে ফুলগুলো মাঠে বিছাতে বিছাতে বলল, কী যে রঙ!

পাখি এসে বসল পাশে। হরিশের কানের নীচে চুমু খেয়ে বলল, মিছে কথা বলো না মাঝি, এ ফুল তুমি আমার জন্য এনেছ…. বলো না মাঝি…..

হরিশ বলল, পাগল! বাড়িতে বউ নেই আমার? এ ফুল তাকে দিলে সে যে কী খুশী হবে!

পাখির এ জ্বালা সহ্য হয়। দুটো ফুল নিয়ে বলল, এই নিলাম আমার ভাগের, বাকিগুলো তুমি নিয়ে যেও…নাকি আমি দিয়ে আসব?

হরিশ কথা বাড়ালো না। মাঠেই চিৎ হয়ে শুয়ে বলল, এদিকে আয়।

পাখি হরিশের বাঁধন ছাড়িয়ে বলল, ছুঁয়ো না আমায় মাঝি, শরীর খারাপ চলছে আমার…..

হরিশের কী মনে হল, বলল, তুই তবে এখন শিমুলের মত লাল?

পাখি ঝাঁঝিয়ে উঠল, বলল, না মাঝি, আমি অশুচি।

হরিশ পাখিকে কাছে টেনে বলল, কী হয়েছে, এমন রাঙা কয়লা হয়ে আছিস কেন?

পাখি বলল, দেখো না, আজ রায়বাড়ি পূর্ণিমার পুজো, ছেলেটাকে তো জানো আমার, খেতে ভালোবাসে। ওদের বাড়ি পায়েস লুচি ভোগ হবে বলে কান্না জুড়েছে ওকে নিয়ে যেতে হবে। ওই খোঁড়া ছেলেকে আমি ছাড়া কে নিয়ে যাবে বলো? আর আমার তো এই অবস্থায় মন্দিরে ঢোকা যায়? ওকে কী করে বোঝাই?

হরিশ পাখির হাতটা ধরে। পাখি ঘামছে। পাখির বুকের আওয়াজ বাড়লে হাত ঘামে। হরিশ তার হাতটা নিজের গালে ঠেকিয়ে বলল, কী বলেছিস ওকে?

এ প্রশ্নটা ফাউ প্রশ্ন। হরিশ ভাবার সময় চায়। কী করবে। পাখির বর কেরালায় কাজ করে। ওর চার বছরের ছেলে, নবীন, পোলিওতে পঙ্গু। কী করবে?

পাখি কী সব বলে যাচ্ছিল। তাকে থামিয়ে হরিশ উঠে দাঁড়ালো, বলল, তুই বাড়ি যা। আমি দেখছি। একটা শিমুল পাখির হাতে দিয়ে বলল, তোর রাঙা মাটির জন্য। এগুলো নিয়ে গেলাম।

====

হরিশ ঘরে এসে দেখল বকুল গা ধুয়ে ঘরে ঢুকছে। হরিশ বলল, এই দাঁড়াও….এই দেখো…. গঙ্গার ঘাটের পাশে যে গাছটা…. কী ফুল হয়েছে গো এবার!

বকুল বলল, ওই মাটির গুমুত লাগা জিনিস তুমি ঘরে তুললে…. ছি ছি…. ফেলে এসো বাইরে…. আর স্নান না করে ঘরে ঢুকবে না বলছি…. এই উঠান আমাকে এখনই আবার ধুতে হবে… এই স্নান করলাম…. হে ঠাকুর….. কী জাতকুল খাওয়া বাড়িতে বিয়ে দিলে বাবা….

হরিশ অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে সব ফুল এক জায়গায় করে বাইরে রাস্তার ধারে ফেলে এলো। স্নান করল। স্নান করতে করতে শুনল বকুল তাকে, তার পরলোকগত মা বাবাকে শাপশাপান্ত করে যাচ্ছে।

হরিশ স্নান করে জামাপ্যান্ট পরতে পরতে বলল, তুমি কি রায়দের বাড়ি যাবে?

বকুল ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, কেন, আমার বাড়ি পুজো নেই? আমার বাড়ি গোপাল নেই? তোমার নোলা লকলক করছে, তুমি না গিয়ে পারবে……

হরিশ রাস্তায় এসে দাঁড়ালো। ফুলগুলো তুলে নিল। হাঁটতে হাঁটতে দেখল পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। কী রং গো! রায়দের বাড়ি থেকে কীর্তনের সুর ভেসে আসছে। ইচ্ছা করছে পাখিকে নিয়ে নৌকা ছেড়ে দেয়। নিরুদ্দেশে। ছেলেটাও যাক। তার মেয়েটা তো মায়ের মত হচ্ছে। সেই ঝাঁঝ। কী হবে এখানে থেকে?

রাস্তাতেই পাখির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘুরছে। ছেলের দুই চোখ বেয়ে জলের ধারা। হরিশ ফুলগুলো পাখির আঁচলে ঢেলে বলল, দে ওকে আমার কোলে দে……

পাখির দুই চোখ জলে ভরে এলো। নবীনকে কোলে দিয়ে বলল, দেখো একটু, হাবাতের মত গেলে তো…গলায় আটকে না ফেলে…..

হরিশ বলল, তুই চল না…..

পাখি বলল, সে হয় না মাঝি….জানি ওতে ঈশ্বরের কিছু আসে যায় না….কিন্তু এতগুলো মানুষকে তো ঠকানো হয় বলো…..

হরিশ বলল, মানুষের এসব নিয়ম…এই শুচিবাই….এও কী নিজেকে ঠকানো না?

পাখি বুঝল। বলল, দিদির সঙ্গে আবার কিছু বাধিয়েছ…. উফ জানোই যখন মানুষটা অমন… তুমিও যে কেন…..

হরিশ সবটা শুনল না। হাঁটতে হাঁটতে বলল, তোর জন্য ভোগ আনব, গিলে উদ্ধার করিস আমায়।

পাখি ওদের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে রাস্তার ধারে বসল। কোলে শিমুলফুলের দল। সত্যিই তো সে রাঙা এখন। শিমুলের মত। দূর থেকে কীর্তন ভেসে আসছে। পাখি দুটো হাত জড়ো করে প্রণাম করল। বলল, প্রণাম তো অশুচি হয় না প্রভু। এই নাও, আমার শিমুলের অঞ্জলি। ছেলেটাকে দেখো, আর আমার ওই পাগলটাকে।