Skip to main content

 

নদীর পাড় ভাঙছে। কিছু করবে না? সবশুদ্ধ জলে তলিয়ে যাব যে। ওপারে যাবে? আচ্ছা থাক, ওই যে চর। চরে যাবে? চাষ করবে? ছাগলটা যাবে। কুকুরটা যাবে। ওই চরেই আমাদের ছেলেমেয়ে হবে। এদিকে আসে শ্মশানের ধোঁয়ার গন্ধ। ওদিকে আসবে না। যাবে? যদি বলো, মাঝিকে খবর দিই? নাও লাগাক, কিগো যাবে সত্যি?

এই চর। কী মাটি! ধান হবে, ফুল হবে, শাক হবে। চারদিকে জল আর জল। আমার ভয় করে না, তোমার করে? তুমি আছ তো। দেখো কী মেঘ করেছে। যদি বন্যা হয়, দেখবে পুরোনো বাড়িটা তলিয়ে যাবে জলে। তুমি সাঁতার জানো, আমিও জানি। সাঁতারে কী আর ঘর বাঁচানো যায়? কী বলো, যায়?

এ বাবা! এ কী গো! এ সে সজনে গাছ! এ দেখো কৃষ্ণচূড়া! এ দেখো পলাশ! কে লাগালো? কে আসে? মাঝি তুমি না থাকলে একা একা ঘর বাঁধা হত এত তাড়াতাড়ি? বিকেলে শাক, ঝোল আর ভাত করব। খেয়ে যেও। মাঝে মাঝে এসো। মেঘ কেটে গেল। আপাতত এইটুকু থাক। আমি রান্না চাপাই।

এই ছাদে বৃষ্টির জল কী মানায়? এসো বাইরে। ওই দেখো মন্দিরে কত লোক, দুই পারে। কেন গো? আজ শিবরাত্রি। আমি গঙ্গা নেয়ে আসি। আসবে? এই দেখো, সাদা পাথরের টুকরো, পায়ে ঠেকল। একে বানাই শিব? ঘরে রাখি? তুমি আনো কিছু ফুল। বুনো হোক। তাও আনো। আমি মাটির চন্দন বাটি, সাজাই, আহা!

এত গ্রহ-নক্ষত্র। এত এত অজানা মানুষ। তবু ভয় লাগে না। আমিই বা কে? তোমারই তো। একা হলে ভয় ছিল। তুমি আমাকে জড়িয়ে বসো। ওই দেখো কুমীর, ওই দেখো শুশুক, ওই দেখো..কে ওটা কে? কারা আসছে নৌকায়? ওরা মাতাল। ওদিকে চলে গেল। ওরা প্রায়ই আসে? আসবে? কিছু বোলো না, থাক।

দশকের পর, দশক গেল। ধীরে ধীরে সব বদলে যেতে লাগল। আঘাতের পর আঘাত এসে লাগল চরের কিনারায় আর তার বুকের পাঁজরে পাঁজরে। ক্রমে সে ঝুঁকে গেল। দৃষ্টি হল ঝাপসা। হাত বাড়ালে কেউ নেই আর। এই চর আর চারদিকে জল। সে একদিন ডাকা ছেড়ে দিল। আশা ছেড়ে দিল। বাঁচা ছাড়ল না।

এখন সবাই বলে, ওই চরে এক বুড়ি থাকে। ওর বর পালিয়েছে অন্য কার সঙ্গে। ছেলেমেয়ে থাকে কোথায় কোথায়। কেউ বলে ও ডাইনি। কেউ বলে ও পেত্মী। কেউ বলে ও পাগল। কেউ বলে ও গুপ্তচর। বুড়ি কথা বলে না। গঙ্গায় কোনো লাশ ভেসে গেলে, সাঁতরে যায়। কাকে যেন খোঁজে, পায় না।

সেদিন শিবরাত্রি। এক সন্ন্যাসী এলো চরে। বুড়িকে বলল, চলো। বুড়ি বলল, এতদিন কোথায় ছিলে? সন্ন্যাসী বলল, লক্ষ জায়গা। কিন্তু শেষে ঠেকল পায়ে, এই চর, আর তুমি। চলো আমার সঙ্গে। বুড়ি বলল, কিন্তু আমার সময় হয়েছে, ও বলল, কাল আসবে, পুজোর শেষ প্রহরে নিতে। সন্ন্যাসী তাকালো সেই প্রাচীন শিব পাথরের দিকে।

বুড়ি মরল ভোররাতে। বৃষ্টি নামল ঝেঁপে। সন্ন্যাসী দিল জলে ঝাঁপ, তাকে বুকের সঙ্গে লেপে। সাঁতারে এলো শ্মশানঘাটে। এই কাজটার শেষে, ফিরে যাবে জন্মের মত দেশান্তরে। এতবড় শূন্য জীবন। কেউ ভরল না - না দেবতায়, না প্রেমে। ফাঁক ও ফাঁকি কেউ ছাড়বে না, কী জবাব দেবে শেষে? হতাশ হৃদয় শিউরে উঠল কেঁপে!

চর হল আজ বুড়ির চর। শিবমন্দির হল গড়া, বুড়িমাতলা নামে। শিবরাত্রিতে কত মানুষ, কত বাউল, কত ফকির সাধু। নামগানে আর ভক্তিতত্ত্বে বাতাস ওঠে কেঁপে। সবাই বলে, কী শান্তি গো এই-যে-এই চরে! গঙ্গা বয়ে যায় বছর বছর। ছয় ঋতুও যাতায়াত করে। চরের বুড়ি নূপুর পরায় মহাকালের পায়ে, নিজের বুকের উপর ধরে।

 

(লেখা একটা খেলাও, প্রতিটা স্তবকে ৫০টা শব্দ আছে।)