ফুলমনির বয়েস হয়েছে। বিয়ে হয়ে আসা রোগা মেয়েটা আজ মোটাসোটা গৃহিণী। নিজেই নিজের চেহারা নিয়ে, গায়ের রঙ নিয়ে মশকরা করে। চেহারা নিয়ে বলে, সে নাকি তার বরের হয়েও দুবেলা খেয়ে নেয়। আর তার গায়ের রং? সে বলে জন্মের পরেই নাকি সে রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল। রাস্তায় তখন পিচ ঢালা হচ্ছিল। সেই রঙে সে রাঙিয়ে যায়।
ফুলমণি পাণ্ডুয়া স্টেশনে ফুল বেলপাতা, কলা বিক্রি করে। সন্ধ্যের দিকেই বসে। দিনে দুইবাড়ি ঠিকে ঝিয়ের কাজ করে। ওর বর অপূর্ব বিড়ির দোকানে কাজ করে।
সাতটা আঠারোর ডাউন ট্রেনটা যখন বেরোচ্ছে, তখন ফুলমণি দুটো গাঁদার মালা, বেলপাতা আর দুটো কাঁঠালি কলা প্লাস্টিকে ভরছে। খরিদ্দার হাত বাড়িয়ে আছে। প্লাস্টিকটা হাতে তুলে দিয়েই ফুলমণি দেখল ওপারের প্লাটফর্মে টুকটুকিকে কোলে নিয়ে অপূর্ব দাঁড়িয়ে। এই সময়?
ফুলমণি উঠে দাঁড়ালো। অপূর্ব লাইন পেরিয়ে এলো এদিকে। মাকে দেখেই টুকটুকি হাত বাড়ালো। ফুলমণি তাকে কোলে নিতে নিতে অপূর্বর মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, এখন?
টুকটুকি বলল, বিছুট….
ফুলমণি পাশেই নিরঞ্জনদার চায়ের দোকান থেকে একটা বিস্কুট নিয়ে ওর হাতে দিল। আসলে প্ল্যাটফর্মে ওকে নিয়ে বসতে ভয় লাগে। যা চঞ্চল মেয়ে। ও ওর বাবার সঙ্গেই থাকে।
তোমার বাবা…..
অপূর্ব বলল। অন্যদিকে তাকিয়ে।
ফুলমণি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। বলল, দাদা ফোন করেছিল? কখন হল?
একটু আগে। ওরা হাসপাতালেই আছে। আমি কাল ছুটি নিয়েছি। চলো।
ফুলমণি নিরঞ্জনকে বিস্কুটের টাকা দিতে গেল। নিরঞ্জন টুকটুকিকে কোলে নিয়ে বলল, তুই তোর মাকে বল তোর মায়ের অনেক টাকার দেমাক হয়েছে। দাদুকেও টাকা দেয়?
ফুলমণির বাবা ফুলমণির জন্মের আগে থেকেই নিরুদ্দেশ ছিল। ফিরেছে এই বছরখানেক হল। ফিরেছে মারণব্যাধি নিয়ে। মাথাও ঠিক ছিল না।
আজ সে পর্ব শেষ হল।
ফুলমণি হঠাৎ বলল, যাব না। তুমিও পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে যাও। আমি সাইকেল কিনব বলে রেখেছিলাম। রোজ হেঁটে যাও কাজে, বাজারে।
অপূর্ব বলল, ভালো দেখায় না গো। চলো।
ফুলমণি দোকানে বসল। কোলে টুকটুকি। অপূর্ব দাঁড়িয়ে।
খদ্দের আসছে। ফুলমণি ব্যস্ত। অপূর্ব উবু হয়ে বসল।
ব্যস্ত প্ল্যাটফর্ম। এত এত লোক আসছে যাচ্ছে। গায়ে ঠাণ্ডা বাতাস এসে লাগছে। এইটুকু জায়গায় তাদের তিনজনকেই তো কুলিয়ে গেছে। আর কী চাই? তার চোখ ঝাপসা হল। হঠাৎ সবকিছু ভীষণ ভালো লাগল। অপূর্বর দিকে ফিরে বলল, উঠো না। বসো। রুটি কিনে বাড়ি যাব। আলু ভেজে নেব। তুমি যেও না আজ।
অপূর্ব বলল, আচ্ছা।
ফুলমণিকে পুরো বোঝে না। কিন্তু ইটের গায়ে জমে থাকা শেওলার মত তাকে ভালোবাসে। ভীষণ ভালোবাসে।