ভোটের লাইনে দাঁড়ালে সময় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বলে, অবশেষে আমিই জয়ী। যে ভদ্রমহিলাকে আগেরবার ভোটেও দেখেছিলাম লাইনে দাঁড়িয়েছেন বেশ সুন্দর একটা শাড়ি পরে, সঙ্গে টিপটা, ব্লাউজের রঙটা মেলানো। হাসিমুখে বলছেন, এই যে আমার ছেলেই নিয়ে এলো, ওই যে গাড়ি কিনেছে, হ্যাঁ ওই আমার বউমা। আজ দেখলাম একা, টোটো থেকে নামলেন। হাতে লাঠি। পরনে নাইটি একটা। সঙ্গের আয়া ধরে ধরে নামাচ্ছেন। পাশের মহিলাকে বলছেন, শাড়ি রাখতে পারে না গায়ে। দাঁড়াতে পারে না। তবু কী জেদ! না আমি ভোট দেবই, তুই আমায় নিয়ে চল। নইলে এ ঝঞ্ঝাট কে পোয়ায় দিদি?
ভদ্রমহিলা এ সব শুনতে শুনতে, কাঁপা কাঁপা হাতটায় শক্ত করে লাঠিটা ধরে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে সামনের দিকে হাঁটছেন। ঝুঁকে গেছেন। গলার হারটা রাস্তার উপর প্রায় ছুঁয়ে আসছে দুলতে দুলতে। ছেলে তো বাইরে চলে গেছে। নইলে একদিন তাকেও হয় তো কোল করে এনেছেন।
আবার যাকে হাফপ্যান্ট পরে সাইকেল চালিয়ে ঠাঠা পড়া দুপুরে এ পাড়া ও পাড়া বেড়াতে দেখেছি, সেও কী দারুণ উত্তেজনায় লাইনে দাঁড়িয়ে। প্রচুর গল্প করছে সে। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। প্রহরীদের দিকে তাকিয়ে কী উত্তেজনা তার। সেই তো আজ রাজা। তার জন্যেই তো এত আয়োজন।
আর দেখলাম সদ্য বিধবা হয়ে যাওয়া সেই তরুণীকে। বারবার প্রহরীদের বলছে, আমাকে ছেড়ে দিন না, আমার বাড়িতে যে বাচ্চা আছে। ছেড়ে দিন না।
তাই কেউ ছাড়ে? কেউ বলে তার রান্না করতে হবে, কেউ বলে তার পোষ্য তার মুখ চেয়ে বসে, গেলেই বাগানে লেজ দুলিয়ে যাবে শৌচে, কেউ বলে তার ঠাকুরঘরে তেত্রিশকোটি দেবদেবী অভুক্ত তার দিকে চেয়ে। মানুষের কত কত কাজ।
ইতিমধ্যে মেঘ করে এসেছে বৈশাখের আকাশে। ছোটো ছোটো আমগুলো দুলছে ঝোড়ো হাওয়ায়। সে গাছের দিকে উদাস চোখে তাকিয়ে বৃদ্ধ। টোটো চালক। হয় তো দামের কথা ভাবছেন, নয় তো ফেলে আসা সময়ের কথা।
আমার কাজ শেষ। ফিরছি। এমনিতেও ফেরার সময় হল। সময় ধীরে ধীরে আমাকেও তো বলছে, টিকিট কনফার্ম হল বলে, নিতে আসব যখন কান্নাকাটি জুড়ো না কিন্তু, এমনিতেই তোমার আগেপিছে কেউ নেই। তখন দীঘির জলে কালো মেঘের ছায়া টলমল করছে। সময়কে বললাম, শুধু এমন মেঘলা আকাশের নীচে সবুজ গালিচায় আরেকবার বসতে দিও। তারপর সব নিয়ে যেও। বাধা দেব না।
অবশেষে সময় জিতে যায়, এই কথাটাই কী দুর্বোধ্য! এত কলহ, এত বিষাক্ততা.... দুটো বিশ্বযুদ্ধের রথীমহারথীরা আজ কই? কম যুদ্ধ তো হল না, কম রাজাউজির তো এলো গেল না। শুধু আমিই থেকে যাব? তাই হয়? আমার ক্ষমতা, দবদবা, কথা, সম্পদ সব যাবে। একদিন আমি যে এই গ্রহ-নক্ষত্রের মাঝে এসে কোনো দিন দাঁড়িয়েছিলাম, সে কথা এই পৃথিবীর বুকে হাঁটা একটা পিঁপড়েও মনে থাকবে না। সেদিনও এমন আকাশ জুড়ে, পাঁজর ঘেঁষে মেঘ জমবে। কারোর আঁখিও হয় তো বা সজল হবে। ব্যথার ব্যথী মহাকাল সেদিনও উদাসীন হতে বলবে। ওই তো তার বাণী। অমোঘ বাণী। সব নিয়ে থাকো, একটু আলগা দাও। কিছুই থাকবে না।