Skip to main content

 

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বাস্তব কী, এ প্রশ্ন আর অসংগত নয়। কারণ সামাজিক মাধ্যমের জন্য যে প্রণোদিত বাস্তবতার সৃষ্টি হচ্ছে তার প্রভাব পড়ছে বাস্তবিক বাস্তবতায়। সেই প্রভাব থেকে বাস্তবিক বাস্তবকে আলাদা করে চিনে নেওয়া এক এক সময় ভীষণ কঠিন একটা কাজ হয়ে উঠছে।

বাস্তবকে স্বীকার করতেই হয়। বাস্তবকে এড়িয়ে কল্পনাও সৃষ্টি হতে পারে না। কিন্তু বাস্তবের মধ্যে সত্যের একটা সামঞ্জস্যতত্ত্ব থাকে। সেই তত্ত্বে বারবার সে নিজেকে রক্ষা করে। কিন্তু প্রণোদিত বাস্তবতায় সে সত্য নেই, তাই সে সামঞ্জস্যতার রক্ষাকবচও নেই। আছে উন্মত্ততা।

প্রবৃত্তি আর নিবৃত্তি বলে দুটো শব্দকে একদিন ভারতীয় দর্শন ব্যাখ্যা করেছিল। প্রবৃত্তির মধ্যে ভালো মন্দ দুইয়েরই অবস্থান। কিন্তু সত্যকে জানতে গেলে নিবৃত্তির উপদেশ দেওয়া হয়েছিল। নিবৃত্তি নিশ্চেষ্টতায় নয়। নিবৃত্তি প্রবৃত্তির উপরে নজরদারিতে। আজকে যাকে অনেকে মেটা-কগনিশান বলে থাকেন। নিবৃত্তির সন্তান হিসাবে বিবেককে দেখিয়েছেন রামপ্রসাদ সেন। অর্থাৎ নিবৃত্তিতেই নিজের প্রবৃত্তির কুয়াশা থেকে বেরিয়ে আলোর সন্ধান পাব এমনই আশা।

বাস্তবতাকে আচ্ছন্ন করে যে প্রণোদিত বাস্তবতার সৃষ্টি হচ্ছে, তা পরিকল্পিত। যা পরিকল্পিত তার ফলাফল কি পরিকল্পিত? না। কাঙ্ক্ষিত হতে পারে, কিন্তু পরিকল্পিত হতে পারে না। কথামৃতে শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলছেন হনুমান ক্রোধে লঙ্কা দহন করল, বোধ নেই সীতাদেবী সে লঙ্কাতেই আছেন। ক্রোধে মানুষ এমনই উন্মত্ত হয়। সেদিন লঙ্কাতে আগুন লাগানোর জন্য আকাঙ্খা ছিল দুষ্ট রাবণের সর্বস্ব জ্বালিয়ে শেষ করে দেওয়া। কিন্তু তার ফলাফল কী হতে পারে সবটা পরিকল্পনা সেদিন হনুমান করেননি, এমনই শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ইঙ্গিত ছিল। মানুষের প্রবৃত্তি তাকে লোভে অন্ধ, ক্রোধে উম্মত্ত, ঈর্ষায় পাষণ্ড ইত্যাদি যাই করে তুলুক তার পরিণাম সবটা ভাবা সেই মানুষের পক্ষে ভাবা সম্ভব নয় এটা পরীক্ষিত সত্য।

আজ সামাজিক মাধ্যমের প্রণোদিত বাস্তব বাস্তবের জগতে তার বিকারের অনুশীলন করতে চাইছে। সামাজিক মাধ্যম সীমারেখা, মর্যাদাবোধের পরোয়া করে না। সেখানে অন্যকে ভুল, অকিঞ্চিৎকর, তুচ্ছ, অপ্রাসঙ্গিক ইত্যাদি প্রমাণ করে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই একমাত্র নেশা। সে অস্তিত্ব লাইক, শেয়ার, কমেন্টস ইত্যাদি পরিসংখ্যানের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। যেন এমন একটা জনাকীর্ণ বিস্তীর্ণ প্রান্তর যেখানে ক্রমাগত সর্বোচ্চ স্বরে যে চীৎকার করে যাবে সে-ই টিকে থাকবে। এমন একটা অমানুষী প্রতিযোগিতায় সামাজিক মাধ্যম পাগলের মত হিতাহিত ভুলে দৌড়িয়ে যাচ্ছে। অন্যকে দৌড়াতে প্ররোচিত করেই যাচ্ছে।

মন্থন দেবতা অসুরে হয়। অমৃত আর হলাহল দুই ওঠে। অসুরে অসুরে মন্থন হয় না। অমঙ্গলের সঙ্গে যখন অমঙ্গল প্রতিযোগিতায় নামে তখন শুধু হলাহলই ওঠে। তাকে গ্রহণ করবেন কোন নীলকন্ঠ? পুরাণে, ইতিহাসে এমন অন্ধকারযুগের বর্ণনা আছে। যা ক্ষুদ্র, সংকীর্ণ, নীচ তা শুধু অনায়াসলব্ধ বলেই তা গৌরবের এ নিতান্ত গায়ের জোরের কথা। কাঞ্চনজঙ্ঘায় উঠতে পারি না বলে বাড়ির ছাদই আমার কাছে কাঞ্চনজঙ্ঘার থেকে বড়, সমুদ্রে যেতে পারি না বলে বাড়ির সামনের এঁদো ডোবাটাই আমার সমুদ্রের থেকে বড়, এ গায়ের জোরের কথা। দিনের বেলায় অন্ধকার থাকে, এমন ঘুষুড়ির গলিতে আজীবন কাটানো বৃদ্ধাকেও পুরীর সমুদ্রের সামনে বিহ্বল হয়ে বসে থাকতে দেখেছি। যা মহৎ তা আমার সাধ্যের বলে মহৎ না। তা মহৎ বলেই মহৎ।

আজকের এই প্রণোদিত বাস্তবতায় ঘেরা জীবনকে ক্রমশ নানাবিধ কুসংস্কারে এসে গ্রাস করছে। অমঙ্গলের ছায়া ক্রমে দীর্ঘ হচ্ছে। কুসংস্কার মিথ্যাজাত, কিন্তু তার ফল? সে বাস্তব। সাপের কামড়ে ওঝার কাছে যাওয়াটা মিথ্যা বিশ্বাস, কিন্তু মৃত্যুটা? তেমনই মৃত্যু অহরহ সমাজে ঘটছে শুধুমাত্র এই প্রণোদিত বাস্তবতার কুসংস্কারে। সঙ্গে তার দোসর ইতর অ্যালগরিদম। যে ইতরামিকে বিস্তারিত করে, মঙ্গলের প্রসারকে সীমিত করে।

উপায়? সব যুগেই মানুষকে সত্য মঙ্গলকে সাধনায় পেতে হয়েছে। এ যুগেও তার ব্যতিক্রম হবে না। অত্যাচার, অবিচারের ভয়কে জয় করে সত্যকে পেতেই হবে। কিছু মানুষ এগিয়ে এসে বলবেন, এই মিথ্যার যুপকাষ্ঠে প্রাণ দেওয়ার জন্য মানুষ নয়। সত্যকে নিজের আত্মার সত্যে মানুষ পাবে পারস্পরিক শ্রদ্ধায়, সহমর্মিতায়। যা আত্মশ্রদ্ধাজাত। কিন্তু আত্মশ্রদ্ধায় প্রতিষ্ঠিত হলে নিজের আত্মায় নিজের সত্যকে জানা লাগে। মানবিক সত্যকে। কোথায় সে মানুষ? কী তার অস্তিত্বের ভিত্তি। এর খোঁজ থেকেই সে আবার বাস্তবিক বাস্তবকে প্রণোদিত বাস্তব থেকে আলাদা করবে। নিজেকে রক্ষা করবে।