মানুষের আসল ছবিটা ধর্মগ্রন্থে নেই, আছে সমাজে। ভারতের পৌরাণিক ইতিহাসে রাম দু'জায়গায় আছেন। শাস্ত্রে আর সমাজে। কথা হতে পারে শাস্ত্র কি সমাজগত নয়? ঈশ্বরের বর্ণনায় কি সমাজ নেই? অবশ্যই আছে। সমাজ থেকে ধর্মের উৎপত্তি। সেই ধর্মই আবার সমাজকেও প্রভাবিত করে চলেছে। যেমন ভাষা। মানুষেরই সৃষ্টি সেটা। কিন্তু সেই ভাষা দ্বারাই আবার মানুষের চিন্তাভাবনা, অনুভব প্রভাবিত হচ্ছে, নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। কিন্তু সে জটিল মনস্তাত্ত্বিক আলোচনা থাক। কথা হচ্ছে রামকে নিয়ে।
ভারতে দুটো প্রধান মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত। সেগুলো ঐতিহাসিক সত্য কিনা সেটা অবান্তর আলোচনা। কারণ এই দুটো মহাকাব্য ভারতীয় হিন্দু সমাজকে প্রভাবিত করেছে কাব্য হিসাবে, ইতিহাস হিসাবে নয়, এ অনস্বীকার্য সত্য। সুধীর কক্কর দেখিয়েছেন কী ভাবে এই দুটো মহাকাব্য আমাদের সমাজের ন্যায়নীতি আদর্শের মানদণ্ড হিসাবে কাজ করেছে।
ছোটোবেলায় ঠাকুমার কৃত্তিবাসী রামায়ণ পড়ে তেমন সুখ হয়নি। বড় বয়সে তুলসীদাসের রামায়ণ পড়ে মুগ্ধ হলাম। উত্তর ভারতে আজ রামায়ণ বলতে বাল্মিকী প্রতিস্থাপিত হয়েছেন তুলসীদাসের কাছে। সে ওঁর লেখার অসম্ভব কাব্যিক গুণের জন্য শুধু নয়, সঙ্গে তাঁর রচিত রামায়ণের চরিত্রদের মানবিক আবেগগুলোর জন্য। তাদের সংশয়, সংকট, দ্বন্দ্ব, প্রেম, বাৎসল্য ইত্যাদির জন্যেও। তুলসী রামায়ণ শুধু তত্ত্বকথা নয়। সে ভক্তিরসের কথা। যে ভক্তিরস চৈতন্যচরিতামৃতের মত জটিল ঈশ্বরতত্ত্বের অবতারণায় যায় না। সরল দরদী নৈতিক জীবন, যা গৃহস্থ আর সন্ন্যাসী উভয়ের কথাই বলে। ভক্তির উত্তুঙ্গ প্রকাশ নেই। রামচরিতমানসের ভক্তি শান্ত, দরদী, গভীর। সাধারণ মানুষ সংসারের আরো পাঁচজনকে নিয়ে সম্পদে বিপদে ধৈর্য রেখে এবং বাহ্যিক পুজো-আচ্চা, তীর্থযজ্ঞ ইত্যাদি দিয়ে নয়, সাধারণ নৈতিক জীবনে পরিতৃপ্ত থেকেই যে শ্রীরামের কৃপা লাভ করতে পারে সেই কথাও বারবার বলা হয়েছে। তুলসীদাস রামচরিতমানস, হনুমান চালিসা, দোহাবলী দিয়ে সেদিনের হিন্দু সমাজকে হিন্দুর জটিল ধর্মতত্ত্বের হাত থেকে রেহাই দিয়েছিলেন।
কিন্তু এখানে একটা কথা আছে, সেখানে কি এমন কথা নেই যা আজকের সামাজিক ঠিক-বেঠিকের সঙ্গে যায় না? উত্তর হল, আছে। কয়েকটা লাইন এমন আছে যা আধুনিক শিক্ষায় তৈরি ভাবধারায় ধাক্কা দেবে। অনেকে বলবেন, কিন্তু সে না হয় হল, কিন্তু সীতার পাতালপ্রবেশ, লবকুশের অমনভাবে জন্ম, বেড়ে ওঠা, তার কী হবে? যারা পড়েছেন তারা জানেন তুলসীদাসী রামায়ণে এ প্রসঙ্গ নেই। তিনি লঙ্কা বিজয়ের পর রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সাধারণ মানুষের জীবনের মনস্তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন ধর্মে। তাই তুলসীর ধর্ম অতটা বৈদিক ধর্ম নয় যতটা সাধারণ নাগালের মধ্যে আনা নৈতিক ধর্ম। আর বালী বধ? তার ব্যাখ্যা তুলসী তার মত করে দিয়েছেন। সে গ্রহণযোগ্য কি নয় সে অন্য প্রসঙ্গ।
সেদিন তুলসীদাস আরেকটা গ্রন্থ জীবনের শেষ অধ্যায়ে লিখেছিলেন, বিনয় পত্রিকা। কোথাও যেন আমার কাছে এ রামচরিতমানসকেও ছাপিয়ে গেছে ভক্তিরসে। কী সাধারণ কথায় কী গভীর ভাবের কথা। সেও শান্তরসের কথা। কিন্তু সেখানে তুলসী যেন আরো মাটির কাছাকাছি। মানবিক সব অপূর্ণতাকে নিয়ে জীবনের মহাতীর্থে চলেছেন।
সেদিনের হিন্দুসমাজের অনেক ত্রুটি তুলসীর লক্ষ্যে এসেছিল। এবং তুলসী এও বুঝেছিলেন এ সমাজের ফাঁকফোকরগুলো যদি বন্ধ না করা যায় তবে বাইরে থেকে বৃথা আস্ফালনে এ সমাজের ধ্বংস আটকানো যাবে না। হিন্দু সমাজে অন্য সমাজের ধাক্কা যখনই এসেছে সে তখন নিজের আত্মশক্তিতে নির্ভর করেই তার মোকাবিলা করেছে। আত্মনির্ভরতাতেই সে এতকাল নিজেকে বাঁচিয়ে এসেছে। হুঙ্কারে নয়। স্বামী বিবেকানন্দের একটি বৃহদাকার উদ্ধৃতি দিই…
“হে ভ্রাতৃবৃন্দ, সত্যই মহিমময় ভবিষ্যৎ, কারণ প্রাচীন উপনিষদের যুগ হইতে আমরা পৃথিবীর সমক্ষে স্পর্ধাপূর্বক এই আদর্শ প্রচার করিয়াছিঃ ‘ন প্রজয়া ন ধনেন ত্যাগেনৈকে অমৃতত্ত্বমানশুঃ’—সন্তান বা ধনের দ্বারা নয়, ত্যাগের দ্বারাই অমৃতত্ব লাভ হইতে পারে। জাতির পর জাতি এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হইয়াছে এবং বাসনার জগতে থাকিয়া তাহারা জগৎ-রহস্য সমাধানের আপ্রাণ চেষ্টা করিয়াছে। সকলেই ব্যর্থ হইয়াছে, প্রাচীন জাতিসমূহ ক্ষমতা ও অর্থগৃধ্নুতার ফলে জাত অসাধুতা ও দুর্দশার চাপে বিলুপ্ত হইয়াছে—নূতন জাতিসমূহ পতনোন্মুখ। শান্তি না যুদ্ধ, সহনশীলতা না অসহিষ্ণুতা, সততা না খলতা, বুদ্ধিবল না বাহুবল, আধ্যাত্মিকতা না ঐহিকতা—শেষ পর্যন্ত কোন্টি জয়ী হইবে, সে প্রশ্নের মীমাংসা এখনও বাকী।
বহুযুগ পূর্বে আমরা এ সমস্যার সমাধান করিয়াছি, সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যের মধ্য দিয়া সেই সমাধান অবলম্বন করিয়াই চলিয়াছি, শেষ অবধি ইহাই ধরিয়া রাখিতে চাই। আমাদের সমাধান—ত্যাগ ও অপার্থিবতা।
সমগ্র মানবজাতির আধ্যাত্মিক রূপান্তর—ইহাই ভারতীয় জীবন-সাধনার মূলমন্ত্র, ভারতের চিরন্তন সঙ্গীতের মূল সূর, ভারতীয় সত্তার মেরুদণ্ডস্বরূপ, ভারতীয়তার ভিত্তি ভারতবর্ষের সর্বপ্রধান প্রেরণা ও বাণী। তাতার, তুর্কী, মোগল, ইংরেজ—কাহারও শাসনকালেই ভারতের জীবনসাধনা এই আদর্শ হইতে কখনও বিচ্যুত হয় নাই। ভারতের ইতিহাসে কেহ এমন একটি যুগ দেখাইয়া দিন দেখি, যে-যুগে সমগ্র জগৎকে আধ্যাত্মিকতা দ্বারা পরিচালিত করিতে পারেন, এমন মহাপুরুষের এখানে অভাব ছিল। কিন্তু ভারতের কার্যপ্রণালী আধ্যাত্মিক—সে-কাজ রণবাদ্য বা সৈন্যবাহিনীর অভিযানের দ্বারা হইতে পারে না। ভারতের প্রভাব চিরকাল পৃথিবীতে নিঃশব্দ শিশিরপাতের ন্যায় সকলের অলক্ষ্যে সঞ্চারিত হইয়াছে, অথচ পৃথিবীর সুন্দরতম কুসুমগুলি ফুটাইয়া তুলিয়াছে। নিজস্ব শান্ত প্রকৃতির দরুন এ প্রভাব বিদেশে ছড়াইয়া পড়িবার উপযুক্ত সময় ও সুযোগের প্রয়োজন হইয়াছে, যদিও স্বদেশের গণ্ডিতে ইহা সর্বদাই সক্রিয় ছিল। শিক্ষিত-ব্যক্তিমাত্রই জানেন যে, ইহার ফলে যখনই তাতার, পারসীক, গ্রীক বা আরব জাতি এদেশের সঙ্গে বহির্জগতের সংযোগ-সাধন করিয়াছে, তখনই এদেশ হইতে আধ্যাত্মিকতার প্রভাব বন্যাস্রোতের মত সমগ্র জগৎকে প্লাবিত করিয়াছে। সেই এক ধরনেরই ঘটনা আবার আমাদের সম্মুখে দেখা দিয়াছে। ইংরেজের জলপথ ও স্থলপথ এবং ঐ ক্ষুদ্র দ্বীপের অধিবাসিবৃন্দের অসাধারণ বিকাশের ফলে পুনরায় সমগ্র জগতের সঙ্গে ভারতের সংযোগ সাধিত হইয়াছে, এবং সেই একই ব্যাপারের সূচনা দেখা দিয়াছে। আমার কথা লক্ষ্য করুন, এ কেবল সামান্য সূচনা মাত্র, বৃহত্তর ঘটনাপ্রবাহ আসিতেছে। বর্তমানে ভারতের বাহিরে যে-কাজ হইতেছে, তাহার ফলাফল কি, তাহা আমি সঠিক বলিতে পারি না; কিন্তু নিশ্চিত জানি, লক্ষ লক্ষ লোক—আমি ইচ্ছা করিয়াই বলিতেছি, লক্ষ লক্ষ লোক প্রত্যেক সভ্য দেশে সেই বাণীর জন্য অপেক্ষমাণ, যে-বাণী—আধুনিক যুগের অর্থোপাসনা যে ঘৃণ্য বস্তুবাদের নরকাভিমুখে মানুষকে তাড়াইয়া লইয়া চলিয়াছে, তাহার কবল হইতে তাহাদিগকে রক্ষা করিবে। বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ইতিমধ্যেই বুঝিতে পারিয়াছেন যে, বেদান্তের উচ্চতম ভাবধারাই তাঁহাদের সামাজিক আশা-আকাঙ্ক্ষার আধ্যাত্মিক রূপান্তর সাধন করিতে পারিবে। গ্রন্থের শেষ ভাগে আমাকে এ বিষয়ে আবার আলোচনা করিতে হইবে।
এখন আমি অন্য একটি প্রধান বিষয়ের আলোচনা করিতে যাইতেছি—দেশের অভ্যন্তরে কার্যক্রম। এই সমস্যার দুইটি দিক্—কেবলমাত্র আধ্যাত্মিক রূপান্তর সাধন নয়, যে বিভিন্ন উপাদানে এই জাতি গঠিত, সেগুলির সমীকরণ। বিভিন্ন গোষ্ঠীকে এক আত্মীয়তাসূত্রে বিধৃত করা প্রত্যেক জাতির সাধারণ কর্তব্য।
এই হল বিবেকানন্দের ভাবনা। পথ নির্দেশিকা। দুর্ভাগ্য হল বাঙালি সমাজের আজ কিছুই নাই। তার অধ্যাত্ম সম্পদ শূন্যের নীচে। তার তুলসী নেই। কিন্তু স্বামীজিও নেই। না আছে রবীন্দ্রনাথ। চৈতন্যচরিত তো কবেই সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যায় হারিয়ে গেছে বাঙালি মানসে। তাই বাঙালির হাতে যা অবশিষ্ট আছে তা কেবল অনুকরণ। বাঙালি সমাজে বিয়ে থেকে জন্মদিন, সাধভক্ষণ থেকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে শুধুই অনুকরণের হিড়িক। যদি বলো, একে 'গ্রহণ' না বলে তার 'অনুকরণ' কেন বলছি, তবে কতজন বাঙালি রামভক্তের মুখে তুলসীর দোহা শুনতে পাও দেখিও। সেদিনের শত বছর আগের বাংলা সাহিত্যেও লেখা আছে হিন্দুস্থানি চাকর কী রাঁধুনি কাজের শেষে তুলসী পাঠ করছে। এ হঠাৎ করে হয়নি। কিন্তু আমাদের হঠাৎ করে এসেছে বলেই হঠাৎ করে যাবে। কিন্তু তারপর?"