Skip to main content

 

মোমবাতিটা জ্বলে জ্বলে, গলে গলে একটা স্থাপত্যের মত দেখাচ্ছে। ইভান টেবিলে মাথাটা দিয়ে অর্ধচেতন, চেয়ারে এলিয়ে আছে শরীরটা। টেবিলে একদিকে মদের অর্ধেক ভরা বোতল, আর কয়েকটা গ্লাস।

রাত বারোটা বাজতে চলল। বাইরে বরফ পড়ছে। কাঁচের জানলার বাইরে শুধুই অন্ধকার। যতদূর চোখ যায় ততদূর অন্ধকার। ইচ্ছা করেই ইভান এত দূরে বাড়িটা করেছে। তার গবেষণার কাজে সুবিধা হবে বলে। সুবিধা হয়েওছে। সে নামী গবেষক এ দেশের। পৃথিবীর নানাপ্রান্ত থেকে তার হাঁকডাক। তার গবেষণার বিষয় - খ্রীষ্ট।

আজ চব্বিশে ডিসেম্বর। আর খানিক বাদেই পঁচিশ হবে। ইভানের বাঁদিকের টেবিলের উপর রাখা প্রকাণ্ড বই, যার উপর স্বর্ণাক্ষরে লেখা - খ্রীষ্ট - নতুন আলোকে। তার নীচে তার নাম লেখা।

এ বই তাকে সব দিয়েছে। নাম, যশ, অর্থ, প্রতিপত্তি। সব। কিন্তু তবু যত দিন যাচ্ছে ইভানের মধ্যে কোথায় একটা চিড় ধরছে। সে অনেকের ঈর্ষার পাত্র হয়েছে। আগে যার জন্য তার গর্ব হত। কিন্তু সে কাছের মানুষ হয়নি কারো। হতে পারেনি। তার বাধে কোথাও, এত অজ্ঞ, নির্বোধের মধ্যে। যদিও কয়েকজন পণ্ডিত বন্ধু আশেপাশের শহর থেকে আসে সপ্তাহান্তে। চলে সুক্ষ্ম অহমিকার কাটাকুটি খেলা। অদৃশ্য তরবারি নিয়ে। তারা মদের পর মদ উড়িয়ে চলে যায়। রেখে যায় সারা ঘর জুড়ে অতৃপ্তি আর জ্বালাপোড়ার দাগ। অশান্ত হয় ইভান। মরে যেতে ইচ্ছা করে। পারে না। আজও সবার আসার কথা ছিল। কই এলো? মদের বোতল সে তো একাই শেষ করে দিল। সবাই ব্যস্ত।

====== =======

হঠাৎ বাইরে কাঠের সিঁড়িতে আওয়াজ হল। ছোটো ছোটো পায়ের আওয়াজ। দরজাটায় টোকা পড়ল। কিন্তু খুলবে কে? দরজাটা খোলাই ছিল শহুরে পণ্ডিতদের অপেক্ষায়। একটা বাচ্চা ছেলে ঢুকল। ইভানের কাছে এসে দাঁড়ালো। একটু দেখে বলল, খিদে পেয়েছে। কী আছে গো তোমার বাড়ি?

ইভান, ইশারায় ফ্রিজের দিকে আঙুল দেখালো।

বাচ্চা ছেলেটা ফ্রিজ খুলে দেখল মাংস আর কেক রাখা। প্রচুর। সে একটা প্লেট খুঁজল। পেল। সার দিয়ে রান্নাঘরে রাখা ধোয়ামোছা ধবধবে সাদা প্লেট সব।

ছেলেটা খেল। তারপর বইটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। কী মোটা বই! কী সব লেখা আছে। খ্রীষ্টের উচ্চতা কত ছিল। কী জামা পরেছিল খ্রীষ্ট ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার সময়। সে জামা কে সেলাই করে দিয়েছিল। কোন সুতোয় বোনা ছিল সে জামা। খ্রীষ্টের চোখের মণির রঙ কী ছিল। যে কাঠে ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিল সে কোন গাছের কাঠ ছিল। তার পাশে যে দুজনকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল তাদের পরিবারে কে কে ছিল। তারা কী পরেছিল। খ্রীষ্ট ভারতে, চীনে, জাপানে, প্যারিসে গিয়েছিল কিনা। যীশু লাজারাসকে বাঁচিয়েছিল মৃত্যু থেকে এ ডাহা মিথ্যা কথা। যীশু বোবাকে কথা বলিয়েছিল, এও ডাঁহা মিথ্যা।

ছেলেটা পড়তে পড়তে উদাস হয়ে বাইরে তাকালো। বাইরে ধ্রুবতারার আলো জ্বলজ্বল করছে আকাশে। বরফ পড়ছে ঝুরঝুর করে। হঠাৎ পিছন থেকে কেউ ডাকল….তুমি কে?

======

ইভান সোজা হয়ে বসেছে। চোখদুটো লাল। ভুরুটা কুঁচকে ছেলেটাকে দেখছে।

ছেলেটা বলল, এ বই তুমি লিখেছ?

ইভান উদাস হয়ে বলল, লিখেছিলাম… কেন?

ছেলেটা বলল, নাহ! কিন্তু তুমি এত দুঃখের মধ্যে আছ কেন? তোমার এত সুন্দর বাড়ি। এত খাবার। এত পোশাক। এত এত পুরস্কার সারাটা দেওয়ালে টাঙানো। নিশ্চয়ই তোমার অনেক টাকাও। তবে?

ইভান বলল, আমি একা। ভীষণ একা।

ছেলেটা বলল, একা? এই যে আমি চারটে কুকুরকে দেখলাম তোমার বাড়ির পিছনে শুয়ে। চারটে পাখিকে দেখলাম তোমার বাড়ির ছাদের কোণায় বাসা করে। তোমার বাড়ির সামনের ঝোপের মধ্যে কতগুলো বুনো শূকর।

ইভান বলল, থামো থামো…বোকার মত কথা বোলো না….আমি কি জন্তু? আমি একা!

ছেলেটা বলল, তা ঠিক তুমি একা। তুমি চাইছ, তাই একাই থাকছ। নইলে অতবড় বাগানে, এত এত ফুল ফুটে আছে….

ওসব আমার মালী করে….বাইরে থেকে লোকেরা এলে প্রশংসা করে…..

ও…তোমার মালীও আছে?

মালী আছে, রাঁধুনি আছে, ফাইফরমাশ খাটার লোক আছে….কিন্তু তারা অজ্ঞ….আমি একাই থাকি……

ছেলেটা বলল, তুমি দুঃখ পাচ্ছ কেন?

ইভান বলল, জানি না।

ছেলেটা বলল, আচ্ছা বেশ। তুমি লিখেছ কেন যে খ্রীষ্ট মৃতকে বাঁচায়নি কোনোদিন?

ব্যঙ্গাত্মক হাসল ইভান। বলল, বাঁচিয়েছিল নাকি?

ছেলেটা বলল, তোমার মা আর বাবার ছবি তো ওটা?

ইভান বলল, হ্যাঁ।

ওরা মারা গেছেন তো?

ইভান চুপ করে থাকল।

ছেলেটা বলল, তুমি ওদের কথা মনে করো না?

ইভান বলল, রোজ করি।

ছেলেটা বলল, তবে তারা কি তোমার ভালোবাসায় রোজ বেঁচে ওঠে না …তোমার হৃদয়ে…..রোজ? তুমি লিখেছ বোবাকে কথা বলায়নি খ্রীষ্ট…কিন্তু এই ঘরবাড়ি, আকাশ, মাঠ, গাছপালা…এসবের দিকে তাকালে তাদের কথা শুনতে পাও না? তোমার মা বাবা তোমার সঙ্গে কথা বলেন না?....

ইভান চুপ করে থাকল। একটু পর বলল, কিন্তু… আমি… আমার একজন ভাই ছিল…..পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরত….একদিন পা পিছলে পড়ে গিয়েছিল বড় খাদের মধ্যে…..অনেকবার আমাকে ডেকেছিল…আমি যাইনি….আমার তখন গবেষণার কাজ….কত নামডাক আমার… আমার মনে হয়েছিল ওর মত তুচ্ছ মানুষের জন্য আমার মূল্যবান সময় দেওয়ার কোনো মানে নেই… এমনকি সে যখন মরে গেল…..তাও আমি গেলাম না….তাকে শেয়ালে….কুকুরে ছিঁড়ে খেল…আমি তাও গেলাম না….

ইভান বলতে বলতে মাথা ঠুকতে শুরু করলে টেবিলে। মোমবাতিটা কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। ছেলেটা উঠে মোমবাতিটা সরিয়ে অন্য টেবিলে রাখল। ইভান মাথা ঠুকে ঠুকে রক্ত বার করে ফেলল। ছেলেটা চুপ করে বসে থাকল। ইভান একটু শান্ত হলে ছেলেটা বলল, তুমি ক্ষমা চাওনি কেন?

ইভান মাটিতে বসে পড়ল। কুঁকড়ে গিয়ে আর্তনাদ করে বলল, কত কত চার্চে গেছি জানো? একের পর এক জায়গায় গিয়ে কনফেশন করে এসেছি। তোমার ভগবান আমার প্রাণে এতটুকু শান্তি দেয়নি। মিথ্যা সব!

ছেলেটা বলল, সেই খাদের ধারে দাঁড়িয়ে, ধীরে ধীরে নেমে গিয়ে ক্ষমা চাওনি? তার কাছে?

ইভান চমকে উঠল। বসে পড়ল। ফ্যালফ্যাল করে তাকালো ঘরের চারদিক। তারপর ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল, না…. যাইনি….যেতে পারিনি….যেতে চাইনি…..

ছেলেটা বলল, এই নাও…..তার মাফলারের একটা টুকরো….সে আমাকে দিয়ে বলেছিল তোমার কাছে পৌঁছে দিতে…..তুমি এর কাছে ক্ষমা চাও….প্রাণের সবটুকু শক্তি দিয়ে ক্ষমা চাও….কোথাও এতটুকু ফাঁকি রেখো না।

ইভান মাফলারের টুকরোটা নিয়ে অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।

======

ইভানের জ্ঞান যখন ফিরল তখন সূর্যের আলো ফুটেছে পুবাকাশে। বাইরে ঝলমলে একটা দিন। দূরে চার্চ থেকে ঘন্টা বাজছে। ইভানের প্রাণের গভীরের গভীরে কী একটা অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এসেছে। ইভান দরজাটা খুলে বাইরে এলো। কুকুরগুলোকে দেখল। পাখিগুলোকে দেখল। বুনো শূকরগুলোকে দেখল। বলল, আজ তোদের জন্য কেক আর মাংস বানাব। নিজের হাতে। আজ মহাভোজ হবে।

ঘরে এসে ছেলেটার কথা মনে পড়ল। কোথায় গেল? কে সে? সারাঘর তন্নতন্ন করে খুঁজে কিচ্ছু পেল না। তার বাবার একটা চিঠি পেল। সে যখন কলেজে পড়ে তার বাবা লিখে পাঠিয়েছিল। তার শেষ লাইনে লেখা ছিল, "ক্ষমার দরজা দিয়ে মানবপূত্র আসেন হৃদয়ে অসীম শান্তি, আনন্দ আর আশা নিয়ে। সে দরজা বন্ধ কোরো না কোনো যুক্তিতেই। জীবনকে অকারণে ভারাক্রান্ত করে তুলো না।"

ইভান কাঁদল। এ কান্না আনন্দের কান্না। হঠাৎ খেয়াল করল, ভাইয়ের মাফলারের গায়ে লেগে একটা ভেড়ার লোম।