ছবিটার গল্পটা বলব বলব করে বলাই হচ্ছে না। এখন বলেই ফেলি।
কী হল, সত্যজিৎ আমার অনেক অনেক অনুজ, ছাত্রতুল্যই বলা চলে। সে আর তার স্ত্রী এসে আমাকে বলল তার ছেলেকে হাতেখড়ি দিয়ে দিতে। আমি যত বলি ওরে আমার সে যোগ্যতা নেই, তাছাড়া আমার বাড়িতে তো পুজোই হয় না। সে আর তার স্ত্রী তবু বলে, না, তুমিই দেবে। সত্যজিতের স্ত্রী রূপা, ভীষণ ভালো মেয়ে, আমার খুবই স্নেহের পাত্রী, তাকে না-ও করতে পারছি না জোর করে। অগত্যা রাজী হলাম ভয়ে ভয়ে। কী জানি কী হয়!
এখন মা থাকতে আমি মায়ের আজ্ঞায় বাড়ির সরস্বতীপুজো, লক্ষ্মীপুজো করতাম। তার কারণটা ছিল সহজ। আমার জন্মদাত্রীই ছিলেন আমার কাছে সচল দুর্গা, কালী, সরস্বতী, লক্ষ্মী, জগদ্ধাত্রী সব সব। অগত্যা তিনি খুশী মানেই আমার জগতে সব খুশী। তস্মিন তুষ্টে জগত তুষ্টম। তারপর কী হল, মা অপ্রকট হলেন। আমিও পুজোর পাট চুকালাম। আমার সচল দেবীই যদি বিসর্জিত হলেন মাটির দেবী নিয়ে আর কী করব!
কিন্তু হাতেখড়িটা কী করে দিই। এমন পৈতেহীন, সন্ধ্যা-আহ্নিকহীন বামুনের কি সে সাজে? না অধিকার আছে?
যা হোক। সরস্বতীর পুজোর দিন তো সে এল। সুন্দর ধুতি পাঞ্জাবি পরে, চঞ্চল দুটো চোখ নিয়ে সামনে এসে যখন সে দাঁড়ালো, মনে হল কী যেন একটা দায় আছে। মানুষ অক্ষরকে সেই তালপাতা, পাথর আরো কীসে না কীসে না লিখে, বড় যত্ন করে বহন করে এনেছে যুগ যুগ ধরে। যা কিছু পেয়েছি এ অক্ষরের জ্ঞান থেকেই তো পেয়েছি। না হোক বসুক আমার কোলে। সামনে থাকুক তার মা বাবা। এ ঘরেই বসুক যে ঘরে আমার দিন রাত কাটে পড়ে, লিখে, পড়িয়ে, আলোচনা করে। সে বসল আমার কোলে। আমি বহুদিন বাদে লিখলাম অ আ ই ঈ। কী এক অনির্বচনীয় আনন্দে গলার কাছটা ধরে এল। মনে মনে দক্ষিণেশ্বরের সে আনন্দময় পুরুষকে বললাম, তোমার বলা, যাবৎ বাঁচি তাবৎ শিখি, এ কথাটাই ওর প্রাণে বাজুক আজীবন। যে মানুষ শিখতে চায় তাকে নিয়ে কোনো গোল নেই। যে মানুষ আচমকা ভেবে বসে তার আর কিছু শেখার নেই, তাকে নিয়ে যত গোল।
সব তো মিটল। কিন্তু এবার? সে বাড়ি ফিরে গেল বাবা মায়ের সঙ্গে। আমি বসে থাকলাম কিছুটা বিস্ময়ে, কিছুটা মন খারাপ নিয়ে। বিস্মিত হলাম যে আমার নিজের অক্ষরের উপর এমন একটা আবেগ আছে, এ কথাটা এত স্পষ্ট করে কই জানতাম আগে। আরো বিস্ময়কর লাগছিল তার জীবন এই অক্ষরকে চিনে চিনে কোন বিচিত্র পথে যাবে সে কি আমরা কেউ জানি? ওর জন্য আন্তরিক প্রার্থনা জানালাম। আর মন খারাপ হল, যোগ্যতাহীন মানুষ যদি অনেক বড় কিছু পায় তাকে নিয়ে সে কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। কী এক বিড়ম্বনায় পড়ে। মনে মনে মাকে বললাম, কাজটা কি ঠিক করলাম? মা বললেন, ভালো পড়াশোনায় হলে জানবি নিজের যোগ্যতায় হয়েছে। আর যদি ব্যাটা ফাঁকিবাজ হয়েছে, জানবি তোর কাছ থেকে হাতেখড়ি নেওয়ার ফল। আমি মুষড়ে গিয়ে বললাম, এটা কোনো কথা হল?
ছবিটা তুলেছে Debasish Bose