“বালকের মত বিশ্বাস। সরল বিশ্বাস।”
কার হবে? কী করে সম্ভব? যতক্ষণ জেগে থাকা ততক্ষণ স্বার্থচিন্তা। ঈর্ষা। দলাদলি। ষড়যন্ত্র। বিষোদগার নিভৃতে। গভীরে গভীরে অর্থ, শরীর, খ্যাতির তৃষ্ণা পুড়িয়ে যাচ্ছে। বাইরে অভিনয়। ভিতরে গ্রীন রুমে সাজের পর সাজ বদলে যাচ্ছে। এর মধ্যে বালকের মত স্বভাব? ঘুষ নিচ্ছে। দিচ্ছে। চোরাপথে, উপরিপথে টাকা ঢুকছে, বেরোচ্ছে। সেও নাকি কাঞ্চনত্যাগী। সব নাকি মনে মনে। তাই? দাদা তাই? নিজের ভিতর আয়নার উপর পর্দা। অভ্যাসের পর্দা। আমি পবিত্র, মোহমুক্ত, শুদ্ধ-বুদ্ধ…..ঢপ। দাদা সব ঢপ।
কিতকিত খেলা হচ্ছে। এদিকে আমি। ওদিকে আমি। আমাতে আমাতে কোস্তাকুস্তি। আমার প্যাঁচে আমি। আমাকে ফেলছি আমি। বাইরের কাউকে দোষী ঠাওরে কী লাভ দাদা? আমি শকুন। সাজতে চাইছি চাতক। চাতক কই? চাতকের সাজে শকুন। বৃষ্টির জলও চলে। ভাগাড়ও চলে। ভাগাড়ের দিকে এক চোখ। মেঘের দিকে আরেক। আমি কে? ভণ্ড। ভণ্ড না, সোজাসাপটা শব্দ সেটা। আমি ধূর্ত। যুক্তিজীবী। হৃদয় বিষাক্ত হলেও বাঁচে না। যুক্তি বিষাক্ত হলেও বাঁচে। রক্তবীজ হয়। খুনের রক্তকে বলে বীরত্ব। ঈর্ষাকে বলে পৌরুষ। কাপুরুষতাকে বলে অহিংসা। কামনা-লালসাকে বলে জীবনের স্বাদ। ঈশ্বরকে বলে বিশ্রামের উপবন। আলোকে বলে ধাঁধা। অন্ধকারকে বলে পথ।
“যে কোনো একটা পথ ধরে গেলেই হয়। তবে সে পথ যেন সত্যনিষ্ঠ হয়। মন মুখে এক হয়।”
মন মুখ এক তো পাগলের। কী এমন জেনেছি যে মুখের সঙ্গে মনের মিল হবে? মনের কথা মুখে বলি যদি? “সে সব কথা বলি যদি আমায় ঘৃণা করে লোকে/ বসতে দেয় না এক বিছানায়, বলে ত্যাগ করিলাম তোকে। তাই পাপ করে হাত ধুয়ে ফেলে, আমি সাধুর পোশাক পরি/ তখন বলে লোকটা ভালো/ ওর মুখে সদাই হরি”।
মন মুখে যত ফারাক থাকে সমাজে শান্তি তত থাকে। যত পার্থক্য তত ভদ্র। যত কাছাকাছি তত স্যাভেজ। তত পাষণ্ড। মন মুখে মিল কখন হয়? ঝগড়ার সময়। যখন রাগের নেশা। যখন মদের নেশা, আড্ডার সময়। বাকি সময়? মনের বাড়ি জিভ যায় না। জিভের পাড়ায় মন যায় না। বেঁচে থাকা মানে আধা-আধি।
গুরুর কাছে একজন এল, বলল, গুরুদেব, আমি অন্ধ, আমাকে চক্ষু দান করুন। শাস্ত্রে আছে গুরু চক্ষু দেন। চক্ষুরুন্মিলীতিং যেন তস্মৈ শ্রী গুরবে নমঃ….শাস্ত্র আওড়ালো হবু শিষ্য।
গুরু বলল, তুমি অন্ধ, সে নিয়ে সংশয় নেই….তুমি শান্তি চাও…আমি তোমাকে শান্তি দেব। এসো।
গুরু সাধন গৃহে নিয়ে গেল। একটা বড় ঘর। লক্ষাধিক অন্ধ। গুরু সাধন দিয়েছে। সবাই গোল গোল ঘুরে যাচ্ছে। যে যত জোরে, যতবার ঘুরছে, সে-ই নাকি সত্যের তত কাছাকাছি। নতুন যে, সেও ভিড়ে গেল দক্ষিণা দিয়ে। গুরু বলল, তুমি নিশ্চিন্ত হয়ে শুধু ঘুরে যাও। এ রাস্তায় কোনো ভাবনা নেই, খানাখন্দ নেই, উঁচুনীচু নেই। ঘুরতে ঘুরতে একদিন মনে আনন্দ না পেলেও, দেখবে ঘুরতে না পারলে মনে অশান্তি আসছে। সে-ই হবে তোমার সিদ্ধি। গুরু পুলকিত হয়ে ফিরে গেল। শিষ্য শান্ত হল। ভাবল, যাক এই তবে পথ, শুধু ঘুরে যাও, ঘুরে যাও, ঘুরে যাও।
সাচ্চা গুরু অপ্রাতিষ্ঠানিক। সে বলে, আমাকে ভোলো। নিজেকে পাও। নিজেকে পেলে জগত পেলে। আমি কী বাইরে ওহে, ভিতরে ডোবো, তোমাতে আমাতে নিত্য লীলা, মজার খেলা। তুমিই আমি। আমিই তুমি। বাধা কী? ভয়। অজ্ঞান কী? “আমি অজ্ঞান” - এই বোধের গাছে, জড়তার নীড়ে, বিষাদের কাঠি জড়ো করে কাল কাটানো। জাগো বন্ধু, জাগো। আর সাবধানে থেকো, যে রাস্তা দেখাবার প্রতিষ্ঠান খুলে বসে, সে-ই রাস্তা আটকায় কিনা, খেয়াল রাখো। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ক্লিয়ার ইওর ওন শিট….নিজের গু নিজে সাফ করো….মনে রেখো।