Skip to main content

 

রোদের কোনো নাম নেই। কিন্তু সব রোদ তো সমান নয়। মিঠে রোদ, কড়া রোদ, শীতের রোদ, গরমের রোদ -- এগুলো নাম তো নয়। সামনে এই যে এরা বাঁশ দিয়ে বেড়া দিয়ে একটা চায়ের দোকান বানিয়েছে, তারও একটা নাম দিয়েছে -- টিফিনবাক্স। অথচ রোদের কোনো নাম নেই।

বাসন মাজতে মাজতে কতবার যে কপালের চুল চোখে মুখে এসে পড়ল। হাওয়া দিচ্ছে খুব। এদিকটা ফাঁকা মাঠ মাঠ। পিঠটা রোদে পুড়িয়ে দিচ্ছে। ফাল্গুনের এই রোদ!

ছেলেটা পুণেতে থাকে। কত হাজার কিলোমিটার দূরে যেন এই তারাপীঠ থেকে। ছেলে বলেছিল। নিয়ে যাবে বলে। কিন্তু সত্যিই কি নিয়ে যেতে চায়? মানুষ যা চায় তাইই কি বলে? মা বলল, এর সঙ্গে বিয়ে ঠিক হচ্ছে। অমত নেই তো? সে তো ঘাড় নেড়ে বলেছিল, না। কিন্তু আসলেই কি সে চেয়েছিল?

“কী গো…. নিয়ে এসো…. ভাতটা চাপাবো তো!”

রমা ফিরে তাকিয়ে হাসল। জগতে বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর সে হাসিতে দেয়। হাসি রোদের মত। নাম নেই। মুখের উপর থেকে চোখের উপর দিয়ে বুকে গিয়ে পড়ে। তার বাড়ির সামনে যে জবাগাছটা আছে, তার ফুল তোলে না সে। মাটিতে পড়ে পড়ে থাকে। রমা তুলে জলে ভাসিয়ে দেয়। ওদের নানা নামে ডাকে -- ফুল, জ্যোৎস্না, কনক, বিভাস... এরা বেশিরভাগ তার ছেলেবেলার বন্ধু। মায়ের নাম, বাবার নামও আছে। কালের স্রোতে সবাই ভেসে গেছে। রমা তাদের ভাসিয়ে দিয়ে কাছে ডাকে।

রমা হাসে না শুধু সুজনকে দেখলে। সুজন দুপুরে চা খেতে আসে। সারা বছর সাদা ধুতি আর চাদর গায়ে ঘোরে। সুজনের ছেলে মারা গেল জলে ডুবে। দোলের দিন। তারপর সব ঠিকই চলছিল। বাইরে থেকে দেখে তো তাই মনে হত। বছর ঘুরতে না ঘুরতে সুজনের বউ রেললাইনে গিয়ে শেষ হল। ছেলের শোক সহ্য হল না। সুজনের আর মানসিক সুস্থতা সহ্য হল না। পাগল হল। রমা ওকে দেখলে হাসে না। আঁচলে কাপ মুছে চা এনে দেয়। দুটো বিস্কুট দেয়। বলে, তুমি দাদা এই ভর দুপুরে চা খেতে আসো কেন, দুটো ভাত খেলে কী হয়?

সুজন হেসে বলে, তোর বৌদি আজ ভাত চাপায়নি রে। ছেলের সঙ্গে কী নিয়ে ঝামেলা হয়েছে। আর বলিস না।

রমার কান্নার ঝাঁঝে গলা জ্বলে যায়। বলে, তুমি চা খাও দাদা।

রমা একবার ছাগল কিনেছিল। নাম রেখেছিল 'অপয়া'। সেই অপয়া রমার জীবনে অল্প সামান্য ছায়া এনেছিল। রমা তার ডাকে 'মা' ডাক শুনত। ভোরে যখন সে তার উঠান থেকে ডাকত 'ম্যা ম্যা' করে, রমা তার ডাকে শুনত 'মা মা'। বলত, আসছি দাঁড়া। দরজা খুলে ভোরের আলোয় এসে দাঁড়িয়ে সূর্যপ্রণাম করত। সে ছাগল ক্রমেই ডেকে যেত -- ম্যা ম্যা। রমার প্রাণে ঠাণ্ডা বাতাস লাগত। ছায়াঘেরা শীতল বাতাস। কিন্তু সে ছায়া দীর্ঘ তো হলই না, বরং কমতে কমতে এমন দাঁড়ালো যে রমা একদিন মনেই করতে পারলো না কোনোদিন সে অল্পখানিক হলেও ছায়া পেয়েছিল। অপয়া'র কয়েকটা লোম খাটের পায়ার নীচে লাল কাপড়ে মুড়ে রাখা আছে আজও। রমার সে কথা আজও মনে আছে কিনা জানি না।

একদিন রাতে রমা ঘুম আসছে না বলে অনেক রাতে পুকুরের ধারে এসে বসেছিল। দেখল ওপারে মা-বাবা বসে তার দিকে পিঠ করে। রমা ডাকার সাহস পেল না। তাকে এই অবস্থায় দেখে কী ভাববে। কষ্ট পাবে না? পা টিপে টিপে পুকুরের ধার থেকে ঘরে ফিরে এলো। জানলা খুলে দেখল বাবার কোলে মাথা দিয়ে মা শুয়ে আছে। বাবা বলছে, শ্বাস নিতে কষ্টটা বাড়ছে? কী গো?

জানলা বন্ধ করে দিল রমা। পরেরদিন, ওই একবার সে গাছ থেকে টাটকা জবাফুল তুলে মা বাবা যেখানে বসেছিল সেখানে রেখে এসেছিল।

রমা দু'দিনের জ্বরে মারা গেল। শেষ কয়েকদিন দোকানে যায়নি। দোকান থেকে খাবার পাঠিয়েছে। মুখে তোলেনি। শেষ কয়েক মাস তার সঙ্গে ছিল একটা কানা বেড়াল। সে রমার কাছ ছাড়েনি শেষ মুহূর্ত অবধি। রমার না খাওয়া খাবার খেয়ে পুকুরের ধার পেরিয়ে জঙ্গলে মিশে গেছে। কেউ দেখেনি তাকে আর। সেই বেড়ালের নাম রেখেছিল 'টক'। শেষে যখন রমার হুঁশ আসছে যাচ্ছে, রমার বারবার গলা জিভ জড়িয়ে আসছে, সে বলছে, টক, বাবুকে খবর দিস…. ওকে মুক্তি দিয়ে গেলাম। ও যেন আর না ফেরে।

এখন যদি রমার বাড়ির সামনে দিয়ে যাও, দেখবে দুটি জবাগাছ ছাড়া আর কিছু নেই। বাড়িটাও ভেঙে মাটিতে মিশেছে। শূন্যতার কোনো নাম হয় না। রমা সংসারে কোনো কিছুরই নাম পায়নি। একটা বড় ফাঁক। তার এদিক ওদিক ছড়িয়ে কিছু মানুষ বসে। সে ফাঁকের মধ্য থেকে বুড়বুড়ি কাটছে ঈশ্বর। বলছে, আমায় ছোঁও...