তখন সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা মতন বাজে। স্টেশনে ওঠার মুখে দাঁড়িয়ে আছি। আমার এক বন্ধু আসছে। ট্রেন লেট। স্টেশনে ওঠার মুখেই এক যুবক শনপাপড়ি বিক্রি করছে। বড় একটা ঝুড়ি। তার ঠিক মধ্যিখানে দুটো কৌটো রাখা। একটা নিলে তিরিশ, দুটো একসাথে নিলে পঞ্চাশ। চীৎকার করে করে খদ্দের ডাকছে, "আসুন আসুন, এই শেষ দুটোই পড়ে আছে। নিয়ে যান। বাড়ির বাচ্চাদের হাতে তুলে দিন। দারুণ ফ্রেশ। ওরা আনন্দ পাবে। নিয়ে যান নিয়ে যান, এই শেষ, আর পাবেন না।"
এই এক কথা সে বলেই যাচ্ছে বলেই যাচ্ছে। আপে ডাউনে ট্রেন আসছে যাচ্ছে। ডাউন ট্রেন থেকে লোক নামছে বেশি, কলকাতা থেকে সব ফিরছে। কেউ কেউ তাকাচ্ছে ঝুড়ির দিকে, কেউ কেউ না।
ইতিমধ্যে অন্য প্ল্যাটফর্ম থেকে একজন মহিলা লাইন পার হয়ে এলো। কোলে বাচ্চা মেয়ে একটা। এসেই বলল, টাকা দাও তো, ঘুগনি কিনব। খাবে তুমি?
শনপাপড়িওয়ালা ব্যস্ত। সামনে একজন দরদাম করছে। সে খদ্দেরের সঙ্গে কথা বলতে বলতে প্যান্টের পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকা বার করে বলল, কুড়ি টাকারটা নেবে, তিরিশ না। আমি খাব না। কোলের বাচ্চাটা মহিলার কোল ছেড়ে এর কোলে এলো। মহিলা আবার তার কোল থেকে নিয়ে বলল, চলো সোনা ঘুগনি খাব। বাবা পরে আসছে।
মহিলা চলে গেল। ঝুড়ির মধ্যে দুই শনপাপড়ি একে অন্যের ঘাড়ে বসে খদ্দেরের অপেক্ষায়। বিক্রেতা ডেকেই যাচ্ছে, আমি বন্ধুর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে শুনেই যাচ্ছি।
হঠাৎ আমার কী মনে হল, শেষ দুটোই যখন পড়ে আছে, বাচ্চাগুলোর জন্যে নিয়ে নিই না হয়।
নিলাম পঞ্চাশ টাকা দিয়ে দুটো। খুশিই হলাম নিয়ে। বন্ধুর ট্রেন আসতে আরেকটু সময় লাগবে। শনপাপড়ির প্যাকেট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েই আছি। মনে মনে ভাবছি এইবার নিশ্চয়ই সেই যুবক বিক্রেতা ঝুড়ি নিয়ে বউ বাচ্চার কাছে যাবে। বেশ তাড়াতাড়িই বিক্রি হয়ে গেল সব।
কিন্তু তাকে দেখি সে আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাচ্ছে আর এদিক ওদিক করছে। খানিকবাদে অন্যদিকের প্ল্যাটফর্মে রাখা একটা বাক্স থেকে আবার দুটো প্যাকেট শনপাপড়ি নিয়ে ঠিক আগের মত ঝুড়ির মাঝখানে রাখল আর আবার আগের মতই বলতে শুরু করল, "একটা তিরিশ, দুটো পঞ্চাশ, নিয়ে যান, নিয়ে যান....."। ইত্যাদি। পাশেই আমি আগের "শেষ দুটো" প্লাস্টিকে ঝুলিয়ে ওর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছি। সে আর আমার দিকে তাকায় না। ওদিকে অন্য প্ল্যাটফর্মে ওর সেই ঢাকা বাক্সের পাশে বসে তার বউ ঘুগনি খাচ্ছে, কোলে বাচ্চাটা বসে মায়ের কপালে পড়া চুল নিয়ে খেলছে। ওই বাক্সে আর কত এরকম শেষ শনপাপড়ি আছে সেই জানে।
বন্ধুর ট্রেন ঢুকল। দেখা হল। সে আমার হাতে শনপাপড়ি দেখে খুশি হল। আমি আর কী বলি। আমিও আর বিক্রেতার দিকে তাকাই না। সেও তাকায় না। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হল এ খেলা তবে শুধু অনলাইন শপিং এই হয় না। সে যাই কিনতে যাও, সব সময়ই নাকি দুটো কী একটা জিনিস পড়ে আছে দেখাবে, তাও লাল কালিতে। তারাই যদি এই ফিকিরে বেচাকেনা চালায় তবে আর এ বেচারার দোষ কী?
রাত হল। ফেরার সময় দেখি তার ঝুড়িতে তখনও দুটো কৌটো। সে তখনও ডেকে যাচ্ছে। ক্লান্তি জড়াচ্ছে গলায়। অন্যদিকের প্ল্যাটফর্মে তার বউ বাচ্চা ঘুমিয়ে স্টেশনের দেওয়ালে হেলান দিয়ে। ওদের মাথার উপর কাস্তের মত একফালি চাঁদ।