Skip to main content

 

(গল্প এক। কিন্তু দুটো দিক হতে পারে। জানি না কোনটা বেশি ভালো। দুটোই থাক। পাঠক বেছে নেবেন।)

কিছু না -১

=========

যে বাড়িতে কাজ করত লক্ষ্মী, সে বাড়ির বউটা ছাদ থেকে পড়ে মরেছে শুনল। লক্ষ্মী গেল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল। সরমা চিৎ হয়ে পড়ে আছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে। চোখটা খোলা। মুখের উপর মাছি ঘুরছে। রক্ত ভাঙা ভাঙা ইট বেয়ে নর্দমায় গড়িয়ে যাচ্ছে। চারদিক লাল লাল। নীল নাইটিটা বৃষ্টির জলে ধুয়ে আছে। একটু আগে যা বৃষ্টি হল।

লক্ষ্মীর পুরোনো কথা মনে পড়ল। কী অত্যাচার করত এই মানুষটা! দশজনের খাটনি একজনকে দিয়ে খাটাত। ছেলেমেয়ের শরীর খারাপ হলে পর্যন্ত বাড়িতে থাকতে দিত না। বলত, তোকে জমি দেব, কম টাকায়, শ্বশুরের অনেক জমি, তুই কাজটা করে যা। ছেলেমেয়ে নিয়ে মাথা গোঁজার জায়গা তো হবে একটা। জলের দামে দেব। দু'বছর দাঁড়া।

দেয়নি। লক্ষ্মী এ বাড়ি কাজ ছেড়ে আরো পাঁচ ছটা বাড়ি কাজ করে টাকা জমিয়ে জমিয়ে কিনেই নিয়েছে জমি।

পুলিশ পুলিশ......

পুলিশ দেখলে ভয় লাগে লক্ষ্মীর। বাড়ি ফিরে এলো। বিকেলে শুনল বৌদি মরেনি। হাস্পাতালে নিয়ে গেছে। বেঁচে যাবে।

লক্ষ্মীর মনটা খারাপ হল। বৌদি যেন এইবারেও ফাঁকি দিল।

সরমা বাড়ি ফিরল। লক্ষ্মী দেখতে গেল। একটু দূরে বসল। বৌদি খাটে শুয়ে। মাথায় ব্যাণ্ডেজ। পাখা চলছে। বৌদি পাখার দিকে তাকিয়ে। সরমা দু-একবার জিজ্ঞাসা করছে, ও বৌদি কেমন আছ?..... বৌদি... অ বৌদি......

সরমা উত্তর দেয়নি। তারদিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। লক্ষ্মীর হাসি পেল। ভীষণ হাসি পেল। ঘরে কেউ নেই, লক্ষ্মী একাই বসে। বসে বসে বৌদিকে দেখছে আর হাসি পাচ্ছে।

মাস ছয় গেল। লক্ষ্মীর ছেলের বৌয়ের সাধ। সরমাদের পাশের বাড়ি নেমন্তন্ন করতে গিয়ে মনে হল একবার দেখে আসি। বৌদির অবস্থা দেখলেই হাসি পায়। বেশ হয়েছে।

সন্ধ্যে হয়েছে। সরমার ঘরটা অন্ধকার। কেউ আলো জ্বালেনি। লক্ষ্মী আলোর সুইচ্‌ দিতে গিয়ে বুঝল বালব্‌ কাটা। আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে সরমাকে। লক্ষ্মী মাথার কাছে দাঁড়ালো। সরমা তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে। যেন একটা বাচ্চা।

হঠাৎ একজন মহিলা ঢুকল। হাতে চামচ আর বাটি। ঢুকেই বলল, এই তুমি কে? সরে যাও.... যাও.....

লক্ষ্মী একটু সরে দাঁড়িয়ে বলল, আমি ওর বোন…..

সে শুনল না। লক্ষ্মীও বুঝল না কেন বলল।

সে সরমাকে টেনে তুলল। সরমা উঠতে চাইছিল না। সে সরমার গালে একটা ঠাঁটিয়ে চড় মারল। বলল, রোজ রোজ এ ন্যাকামি আমার ভালো লাগে না…. ওঠো… এটা গিলে আমাকে উদ্ধার করো।

লক্ষ্মী দেখল সরমা কী অসহায় চোখে তার দিকে তাকিয়ে। যেন চিনতে পেরেছে তাকে। গোঁ গোঁ করে কী বলছে, তার দিকে হাতটা বাড়িয়ে।

অন্ধকারে কখন যে দৃষ্টি তার ঘরের মধ্যে বসে গেছে খেয়াল পায়নি লক্ষ্মী।

লক্ষ্মী ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলো। এত গুমোট অন্ধকার। আরো কোন কোন বাড়ি যেন যাওয়ার ছিল। গুলিয়ে গেল লক্ষ্মীর। হাঁটতে হাঁটতে পা'টা টেনে ধরছে ফাঁকা দুটো চোখ। লক্ষ্মী যাস না…. লক্ষ্মী যাস না…..

লক্ষ্মী বাড়ি ফিরে সেই সে শুলো আর সেদিন খেতেও ওঠেনি। বলল, তার ভীষণ মাথা ধরেছে। ছিঁড়ে যাচ্ছে মাথা। ছেলে বলল, ওষুধ আনি?

লক্ষ্মী বলল, বিষ আন…. জুড়াই…. সেও জুড়াক….

ছেলে বলল, কী বলছ?

লক্ষ্মী বলল, কিছু না।

 

কিছু না ২

------------------

সরমা ইলিশের দিকে তাকালো। কিন্তু এইমাসে কেনা আর সম্ভব না। বাকি মাসটা চালাতে হবে তো। মাছের বাজার বেলার দিকেই আসে। একটু সস্তা হয়। আজকে নেওয়ার মত কোনো মাছ নেই। মাছের বাজারেই দাঁড়িয়ে আছে বেরোনোর জায়গাটায়। খুব বৃষ্টি হচ্ছে।

ইলিশ কত করে গো?

গলাটা চেনা। ভুবনের মায়ের গলা। একবার আড়চোখে তাকিয়ে বৃষ্টির মধ্যেই রাস্তায় নেমে গেল সরমা। ভুবনের মা ঠিক কিনবে মাছ। ভুবন ছোটোবেলা থেকেই মাছ ভালোবাসে।

বছর কুড়ি আগে ছবিটা ছিল অন্য। সরমা ভাসুর ভালো কাজ করত। সরকারি চাকরি। অবিবাহিত ছিল। ভাইয়ের উপর ছিল অন্ধ ভালোবাসা। গোটা পরিবারকে একাই টেনে নিয়ে চলত। যতক্ষণ না সেরিব্রাল অ্যাটাকে একদিক পড়ে যায়। দাদার এই পরিণতি, তার উপর দাদার জন্য আয়ার খরচ, ওষুধের খরচ, আরো আনুষাঙ্গিক খরচ বাড়ে। ভাই বোঝে তার নিজের ক্ষুদ্র সংসারে অভাব বাড়ছে। ক্ষোভ বাড়ছে। রান্নার লোক, ঠিকে কাজের লোকের উপর নির্ভর করে সরমার চলত। এমনকি পায়ের জুতোও দু'বেলা ভুবনের মা ধুয়ে না দিলে পায়ে দিত না। অলসতা আর শুচিবাই মিলে সরমা একরকম পঙ্গুই করে রেখেছিল সংসারে।

======

সরমার বেরিয়ে যাওয়াটা চোখে পড়ল ভুবনের মায়ের। মাছ ক'টা কাটিয়ে প্লাস্টিকে ভরে দাঁড়িয়ে থাকল। মাছওয়ালা, মানে আমীর বলল, কী বাড়ি ছিল… কী হল…. এই মানুষ নিজে বাজার করছে…. আগে আমাদের বাড়ি গিয়ে বাজার পৌঁছে দিয়ে আসতে হত… তুমি ওবাড়ি কাজ করতে না?

ভুবনের মা, লক্ষ্মী, কথা না বাড়িয়ে বৃষ্টিতেই বেরিয়ে এলো। ছাতাটা খুলে হাঁটতে হাঁটতে দেখল সরমা স্টেশানের পাশে শেডের তলায় দাঁড়িয়ে। ওদিকে গেল না লক্ষ্মী। আগের গলি দিয়ে ঢুকে গেল।

======

ভুবনের জ্বর। সেদিন সরমাদের বাড়ি সত্যনারায়ণ পুজো। দুটো বড় বড় ড্রাম এগিয়ে দিয়ে সরমা বলল, এগুলো ভরে রেখো ভুবনের মা।

লক্ষ্মী বলল, ছেলেটার জ্বর। আজকে আমি তাড়াতাড়ি বাড়ি যাব। আর কাউকে একটু বলো না বৌদি।

শুনল না। কাজ ছাড়িয়ে দেবে বলল। আর এদিকে যেন কোনো বাড়ি কাজে না নেয় এমন বদনাম রটিয়ে দেবে বলল। বলবে এরা গোটা পরিবার চোর।

লক্ষ্মী ভয় পেল। এ জায়গা চেনা না। তার বর এখানে জোগাড়ের কাজ করে। রেলের পরিত্যক্ত কোয়াটার্সে থাকে। এসব বদনাম দিলে কোথায় যাবে বাচ্চা নিয়ে?

দু-এক বালতি জল ভরতে না ভরতেই নামল আকাশ ভেঙে বৃষ্টি। রাস্তার কল থেকে জল আনা ওই কাঁচা রাস্তা মাড়িয়ে মাড়িয়ে…. হয়?

হঠাৎ বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে তাপস এলো। বলল, তাড়াতাড়ি বাড়ি চলো। ভুবন কারোর কাছে থাকছে না। কেঁদে কেঁদে একটা অঘটন ঘটাবে মনে হচ্ছে।

লক্ষ্মী কথা বলল না। তাপসের মাথা গরম। রাগলে কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। সে গলাটা কঠিন করে বলল, তুমি বাড়ি যাও। আমি এগুলো করে আসছি।

তাপস চলে গেল। লক্ষ্মী বালতি নিয়ে ঘরে ঢুকেছে শুনতে পেল দোতলা থেকে দাদা ডাকছে, লক্ষ্মী… উপরে আয় একবার।

লক্ষ্মী ভেজা কাপড়ে উপরে গেল। দরজার বাইরে জড়সড় হয়ে দাঁড়ালো। দাদা বলল, ভিতরে এসে পাপোশটার উপর দাঁড়া।

লক্ষ্মী দাঁড়ালো। দাদা বলল, তোর বর কেন এসেছিল? কী হয়েছে?

লক্ষ্মীর গলা বুজে এলো। কথা বেরোচ্ছে না। কোনোরকমে বলল, জ্বর ছেলেটার। আমাকে ছাড়া….

তোকে এই বৃষ্টির মধ্যে জল আনাচ্ছে কে?

লক্ষ্মী উত্তর দিল না। দাদা এগিয়ে এসে তার হাতে টাকা দিয়ে বলল, কাল থেকে আর আসবি না। আমি এদের বলে বলে বোঝাতে পারলাম না। এরা মানুষকে মানুষ জ্ঞান করে না। আমার ভাইও আর আগের মানুষ নেই। কী কী নেশা যে তিনি ধরেছেন তিনিই জানেন। আমার আর ইচ্ছা করে না এক দণ্ড এ বাড়িতে থাকতে। বাবা মায়ের স্মৃতি, ভাইটার উপর দায়িত্ব…. তুই যা…. এ বাড়ির ছায়া আর মাড়াস না…..

লক্ষ্মী ফিরে এসেছিল। সেই মাসের অমাবস্যাতেই দাদার অ্যাটাক হল। বছর তিন পর মারা গেল। লক্ষ্মী সেই একবার গিয়েছিল, শেষবারের মত দাদাকে দেখতে।

======

ভুবনের মায়ের অন্য গলিতে ঢুকে যাওয়াটা দেখেছে। লক্ষ্মী জমি কিনেছে, বাড়ি করেছে, ছেলের বিয়ে দিয়েছে। সুখে আছে। দশবাড়ি কাজ করলেও সুখে আছে। ওর বেঁচে থাকার ছন্দটা জানান দেয়। ঈর্ষা হয় না সরমার। হতাশ লাগে। নিজেকে নিয়ে হতাশ লাগে। রাগ হয়। স্বামী আগের মানুষ নেই। সারাদিন নেশায় চুর হয়ে আছে। শুকিয়ে কী চেহারা হয়েছে। দাঁড়াতে পারে না ঠিকঠাক। মেয়েটা বিয়ে করল না। রাতদিন ঠাকুর-দেবতা নিয়ে আছে। এ আশ্রম, সে আশ্রম ঘুরে বেড়ায়। নিজে রান্না করে আলাদা খায়। মেঝেতে বারোমাস কম্বল বিছিয়ে শোয়। সরমা মাছ নিতে এসেছিল আজ বরের জন্য। মাছ ছাড়া খেতে পারে না। তাছাড়া যা নেশা করে শরীরে সেই অনুযায়ী খাদ্যও তো চাই। মেয়ে পুরীর কোন আশ্রমে গেছে। মাস ছয় কাটিয়ে ফিরবে বলেছে। না ফিরুক। ওর মায়া কেটে গেছে সরমার। একটাই মায়া আছে এখন, মানুষটার জন্য। লোকে হাসাহাসি করে, টিটকিরি দেয় রাস্তায় বেরোলে। এককালে মানুষকে জ্বালিয়েছেও তো। সেদিন সামর্থ্য ছিল জ্বালিয়েছে। আজ নেই তাই ওরা জ্বালাচ্ছে। এই তো সংসার। একদল শিকার করে, একদল শিকার হয়। এখন সে শিকার।

সরমা বাড়ি এসে দেখল বিকাশ নেই। এদিক ওদিক খুঁজে দেখল, নেই। একজন বলল, কার একটা বাইকে করে কোথায় গেল। ফোন নেয় না। এখন? হয় তো আজ ফিরবে না। কোন ঠেকে লাট খেয়ে পড়ে থাকবে। কার জন্য রাঁধবে? নিজের জন্য?

সরমা ছাদ ঝাঁট দিতে উঠল। সকাল থেকে বৃষ্টি। এমনিতেই এদিক ওদিক শেওলা হয়ে আছে। ছাদে উঠলে ভুবনদের বাড়িটা দেখা যায়। ভুবনের বউ পোয়াতি শুনেছে। ছাদে ওটা কে? ভুবনের বউ না? চশমাটা নীচে রেখে এসেছে। ওর পাশে ওটা কে বসে? ভুবনের শাশুড়ি? শুনেছে সে নাকি এসেছে এখানে ডাক্তার দেখাতে। কিন্তু ক’মাস হবে? নিজের মেয়েটার কথা মনে পড়ল। পুরীতে কী খাচ্ছে, কোথায় শুচ্ছে কে জানে… স্বামীও বা কি…. হয় তো রাস্তার ধারে লাট খেয়ে পড়ে…. দু'দিন পরে টোটো করে কেউ এনে দিয়ে যাবে।

এইসব ভাবতে ভাবতে সরমা কখন ছাদের ধারে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি। আচমকা বিদ্যুৎ চমকে বাজ পড়তেই টাল সামলাতে না পেরে পড়ল মাটিতে। মরলও সঙ্গে সঙ্গে।

মেয়ে স্বামী কাউকেই পাড়ার লোক জানাতে পারল না। শেষে লতায় পাতায় আত্মীয়রা দাহ করল। মুখে আগুন দিল পাড়ারই একটি ছেলে।

লক্ষ্মী এসেছিল দেখতে। কে মুখে আগুন দেবে এই নিয়ে যখন কথা উঠেছিল, কেউ কেউ ভুবনের নাম করেছিল। লক্ষ্মী রাজী হয়নি। ওর বউ পোয়াতি না। এসব ছোটোলোকদের মুখে আগুন দিয়ে এক অনর্থ হোক শেষে! বালাইষাট!