Skip to main content

 

যে ভীষণ খারাপ, তাকে নরকে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর তাকে কুচিকুচি করে কেটে, নুন মাখিয়ে গরম তেলে ভাজা হয়।

এরকম গল্প শতাব্দীর পর শতাব্দী শুনে শুনে মানুষের সমাজ চলে আসছে। ভালোমন্দের বিচারটার পিছনে তাই ধর্মীয় কাহিনীপুষ্ট দেবতা বনাম অসুর আর স্বর্গ-সুখ বনাম নারকীয় অত্যাচারের গল্পের ছায়া থেকেই যায়। আমার যাবতীয় আবেগের মশলা মানব সভ্যতার অভিব্যক্তির সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছে। কোনোটাই মৌলিক নয়। নির্ভুল নয়।

ধর্মীয় অনুষঙ্গ প্রভাবিত বিচারের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে বিজ্ঞান। তথ্য, পরীক্ষানিরীক্ষা, প্রমাণ ইত্যাদি পুষ্ট বিচার। সেগুলো আবেগহীন। যুক্তি আর ফ্যাক্টসম্মত।

আমি সব চাইতে বিপন্ন দেখেছি শৈশবকে। যতদিন যাচ্ছে শৈশবকে আরো বেশি বিপন্ন দেখছি। আত্মহত্যার প্রবণতা, নেশা, নানারকম অপরাধে নাবালকদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। ভারতে তা রীতিমতো চিন্তার জায়গায়। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলেই দেখা যায় কী বিপন্ন শৈশবের মধ্যে দিয়ে সমাজের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বেড়ে উঠছে। সে নিয়ে কাজ হচ্ছে না এমন নয়, কিন্তু যতটা রোগ ছড়িয়েছে আর যে দ্রুততার সঙ্গে ছড়াচ্ছে তার তুলনায় সেটা ভীষণ কম। জুভেনাইল ক্রাইমকে হালকাভাবে নেওয়ার মাশুল গোটা সমাজকে আগামী দিনে দিতে হবে। শুধুমাত্র ধর্মীয় গল্পের মত অসুর নিধন করে পার পাওয়া যাবে না। অপরাধ বিজ্ঞানকে বুঝতে হবে। আর তাকে বুঝতে গেলে আরো পরিণত হতে হবে সমাজের মানসিকতাকে।

একদিন সমাজে ওঝা, ভূতে ধরার মত নানারকম বিধান ছিল মানসিক ব্যাধির। জলাতঙ্কের মত সংক্রমণকেও শয়তানের ভর করা বিশ্বাস করে, আক্রান্তকে চার্চে রেখে ভয়ানক অত্যাচার করে তার প্রতিকার করা যাবে বিশ্বাস করা হত। সে বেচারা রোগের তাড়নায় আর নানাবিধ ধর্মীয় অত্যাচারের দাপটে করুণ মৃত্যুর সম্মুখীন হত।

সে সব দিন নেই আর। ওঝা, ভূতপ্রেত কমছে। মানসিকরোগ আর অপরাধ বিজ্ঞান নিয়ে কাজ বাড়ছে। এ নিয়ে প্রথম বিশ্বে নানাবিধ কাজ হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে। ক্রমে এদিকেও সে কাজের প্রসার প্রচার হবে বলে আমার বিশ্বাস।

আর রইল দুর্নীতির বিষয়টা। সমাজে অর্থনৈতিক অবস্থান আর বিচারব্যবস্থার অদ্ভুত সমীকরণ গোটা দুনিয়ায় নতুন কিছু নয়। কমবেশি আছেই। সে নিয়ে প্রতিবাদ হবে, আওয়াজ উঠবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এতে আশ্চর্য হওয়ার মত শিশু তো আর নেই। সুতরাং “আসল অপরাধী/অপরাধীরা” বনাম, “স্কেপগোট” এর ধোঁয়াশা থাকবেই। আমরা ছোটোবেলা থেকেই জানি না যে - “অত সৎ হলে সমাজে টেকা যায় না। বেঁচে থাকা যায় না।” “সতীত্ব মারাতে এসো না”। ইত্যাদি ইত্যাদি। ওরা হবে সৎ, আর আমি হব চলনসই চালাক - এ ভাবটা ভালো, কিন্তু কাজের নয়। মাঝে মাঝেই স্বপ্নভঙ্গ হবে। হাতের কাছে যাকে পাব তার শাপশাপান্ত, বাপবাপান্ত করব। তারপর ক্লান্ত হয়ে যাব একদিন। এ দুনিয়া কোনোদিন সততার ছিল না। হবেও না। এর মধ্যেই আশা করব যতটুকু সততা পাওয়া যায়, অন্তত কিছু কিছু ক্ষেত্রে, এবং যদ্দিন সে স্বচ্ছতা টিকিয়ে রাখা যায়। আশা তো করব, কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘন্টাটা বাঁধবে কে?

নানারকম তত্ত্ব আসবে। কিন্তু কেউ বলবে, দাদা সমাজ বলতে তো আমি, আপনিও। আমাদের মধ্যে ওই জিনিসটা কদ্দূর টিকে আছে? সুযোগ পেলে কজন আর ছাড়ে দাদা? না পাওয়ার লোকেদের চীৎকারকে ওরা থোড়াই আমল দেয়। জানে তো, একটু ভাগ দিলেই সব শান্ত হয়ে যাবে। উঁহু, তাই বলে ওসব মেরুদণ্ডের কবিতাটবিতা আওড়ানোর দরকার নেই। সৎ থাকাটা একটা বাধ্যতা। যে পারে সে পারে, যে না পারে তার ছলের অভাব হয় না। ওর সঙ্গে মেরুদণ্ডের সম্পর্ক নেই। নির্ভেজাল শুদ্ধ বিবেকবুদ্ধির দরকার আছে। যা বাজারে পাওয়া যায় না। কোথায় পাওয়া যায়, কেউ জানে না। শুধু এতটা বলতে পারি, সৎ হতে গেলে ধর্মবিশ্বাস লাগে না, বড় ডিগ্রি ত্যাগ করে সাধু হওয়া লাগে না, লাগে একটা সহজ বোধ - সমাজ অশুদ্ধ হলে আমিও বিপন্ন হই। আমাকে দিয়েই সমাজ শুরু, তাই সংশোধন আমাকে দিয়েই শুরু করতে হবে। নিঃশব্দে। নিভৃতে।