Skip to main content

 

 

গোঁসাইয়ের জ্বর। চোখ লাল। শ্বাস দ্রুত। কপালে জলপট্টি চলছে। এখন একশো দুইয়ের কাছাকাছি। বুকে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কষ্ট হচ্ছে?

গোঁসাই হেসে বলল, অসময়ে কুম্ভের জলে স্নান….ওই ঠাণ্ডা….এই বুড়ো হাড়ে সইবে কেন বলো….

বললাম, জ্বরের ঘোরে ভুল বকছেন…নাকি ঠাট্টা করেন…..কুম্ভে আবার কবে গেলেন…..

গোঁসাই হাসল। কাশির দমক সামলে বলল, জ্বরে না গো….তোমায় একটু বাজাচ্ছিলাম….স্মৃতিশক্তিটা দেখছিলাম…..তা তুমি যাচ্ছ?

বললাম, ইচ্ছা তো ছিল….কত মানুষ….কত সাধু…..

গোঁসাই উঠে বসল। বলল, এই “কত” শব্দের এক আশ্চর্য আকর্ষণ কিন্তু বলো। নেতা যখন সভায় যায়, তখন তার যত “কত” তত আনন্দ। আবার যখন দেওয়ার বেলা আসে, তখন যত কম “কত” তত ভালো। তখন “কত” হয়ে যায় “এত”..... এত লোক?

গোঁসাই হাসতে হাসতে বলল, “কত”টা কখন যে “এত” হয়ে যায় গোবিন্দমানিক ধরতে পারবে না।

বললাম, এ নামটা আবার কেন?

গোঁসাই সে কথার উত্তর দিল না। বলল, ক'টা বাজে গো?

বললাম, সাড়ে তিনটে। রোদটা চড়া। তাই জানলা দিয়েছি। খুলে দেব?

গোঁসাই বলল, দাও দাও….গঙ্গার দিকটা খুলে দাও।

গঙ্গার দিকে জানলাটা খুলতেই আমের বোলের গন্ধ ভরে এলো ঘরে। দু চারটে জেলেদের নৌকা ভাসছে জলে। নীল আকাশটা যেন আঁচল বিছিয়ে বসে আছে ওপারে। শাড়ির কোনা ভেজাচ্ছে জলে।

গোঁসাই বলল, আমার যখন তরুণ বয়েস, গুরু নিয়ে গিয়েছিল একবার কুম্ভে।

এসে বসলাম। ঘাম হচ্ছে গোঁসাইয়ের। জ্বরটা নামছে। একটা গামছা দিয়ে পিঠ বুক মুছিয়ে দিলাম। কেন জানি না বুক পিঠ মোছাতে গিয়ে চোখে জল এল। এত নরম একজন মানুষ হয়? এমন সুগন্ধ গোঁসাইয়ের গামছা দিয়ে, শরীর বেয়ে আসছে। নিজেকে সামলে নিলাম। গোঁসাই চোখ বন্ধ করে বসে। যেন এইটুকু সেবাকেও গোবিন্দের চরণে অর্পণ করছে গোঁসাই। আমার মঙ্গলকামনায়। এত ভালোবাসা, এত করুণা তোমার ও হৃদিঘটে জন্মায় কী করে গোঁসাই? তোমার গুরুর দান বুঝি?

গোঁসাই বলল, গুরু আমাকে নিয়ে ডুব দিলেন জলে। তিন ডুব। তারপর হাতজোড় করে বললেন, মা, নাও আমার সব পুণ্য…মা নাও আমার সব সুকৃতি…..আমাকে বললেন, এক কণা লুকাসনি মানিক আমার……দিয়ে দে….সব পুণ্য দিয়ে দে…..মাকে দে….আমরা পুণ্য দেব না তো মা কোত্থেকে পাবে বলদিকিনি….ছেলের অর্জনই তো মা নেয়….তারপর যে চায় দেয় বিলিয়ে…..দিয়ে দে…সব পুণ্য দিয়ে দে……

আমি বললাম, দিলে সব…..

গোঁসাই ছলছল চোখে বলল, গুরু এমন কাঙাল চোখে দুটো হাত মেলে তাকিয়ে থাকলেন….সব আপনিই গেল…….

গোঁসাই চোখ বন্ধ করে বসে। দুই চোখের কোণে চিকচিকে জল।

সব পুণ্য দিয়ে দিলে কী থাকে গোঁসাই আমার?

গোঁসাই বলল, প্রেম…..জগতে প্রেম ছাড়া বাকি সব তো দরদামের জায়গা মানিক….আমার গোবিন্দ কী ওই দরদামের জায়গায় আসে রে? তাই পুণ্যপাপ সব মাড়িয়ে যখন প্রেম আসে……কী জানিস….এই যে বসন্ত….এই যে সুগন্ধ….এই যে এত রঙ….একেই তোরা প্রেম জানিস….এরপর সব উড়িয়ে আসবে যে কালবৈশাখী…..সে কি? সে প্রেম নয়? সেই পূর্ণতা রে……সব উড়ে গেলে….সব হারিয়ে গেলে…..

আমি বললাম, এত সাহস আমাদের নেই গোঁসাই…..

গোঁসাই বলল, আছে…..ভয়ের আরামটা ছাড়লেই সে আছে…….চলো গঙ্গায় নামি…..

পাগল….এই জ্বর গায়ে…..

গোঁসাই বলল, জ্বর নেই….কিছু পুণ্যর অভিমান আছে…..তোমারও আছে…..চলো দিয়ে আসি…..

 

[16 February 2024]