ছোটো কথাটা হল, ব্যর্থতা। বড় কথাটা হল শূন্যতা। যেখানে ব্যর্থ হলাম, সেখানে শূন্যও তো হলাম। আমি শূন্যতা বলতেই ভালোবাসি। ব্যর্থ হয় হিসাবী মন। শূন্যতাকে গ্রহণ করে যাত্রিক মন।
কালীগঞ্জের বাজার। আজ বাজার আলো করে এসেছে মা, রাজরাজেশ্বরী। মা এই বসন্তে আসেন। ব্যর্থতার পাত্রে মায়ের অঞ্জলি আনা যায় না। শূন্য পাত্রে আনা যায়। গগন ঢাকের শব্দ শুনতে শুনতে তন্ময় হয়ে যায়। বাজারের সব চাইতে পুরোনো যে বটগাছটা, যে গাছটা তার মা, বাবা, ভাইকে চিনত, সে গাছটায় পাখির দল ফিরছে, একটু পর সন্ধ্যে হবে না? এই গাছের মধ্যে একটা মায়ের মন আছে। যা-ই দীর্ঘদিন থাকে তার মধ্যেই মা ধীরে ধীরে আসন পেতে বসে। যা থাকে, তাই তো মা।
গগনের এক দিদি আছে। শিলিগুড়ি থাকে। যতবার মদনপুর থেকে ট্রেনে ওঠে, দুই চোখের কোল জলে টলটল করে। তার মায়ের পেটের দিদি না। তাদের পাড়ায় দিদির বাপের বাড়ি। অনেক বড়লোক ওরা। গগন তো জন্মপঙ্গু, পোলিও, তায় বোবা। গগনের চোখে জল টলমল করে না, চারদিনের টানা বৃষ্টিতে ক্ষেতের আল যেমন ভেঙে পড়ে, তার চোখ বুক তেমন নুয়ে পড়ে। দিদি তার মাথায় বুকে হাত বুলিয়ে, মাথাটা নীচু করে তার মাথায় চুমু খেয়ে বলে যায়, খেয়াল রাখিস নিজের। আসি, বুঝলি।
আজ রাজরাজেশ্বরীর দিকে তাকিয়ে গগনের দিদির কথা মনে হচ্ছে। প্রতি বছর আসে। এ বছর আসবে না। শরীর খারাপ দিদির। কঠিন রোগ। গগনের চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, মা দিদিকে ভালো করে দিস মা। তেমন হলে আমাকে নিয়ে নে মা, দিদি বেঁচে থাকুক।
গগন চা খাবি?
প্রদীপদা, এই বাজারেই দোকান। তার হুইলচেয়ারে ঝোলানো ভিক্ষার ব্যাগে দুটো আপেল, শশা, নারকেল রাখতে রাখতে বলল, চ…. চা খাবি চল।
চায়ের দোকানে সবাই চুপ করে বসে। তার দিকে কেমন অপরাধীর মত তাকাচ্ছে কেউ কেউ। চোখ নামিয়ে নিচ্ছে। গগন কিছু একটা যেন বুঝতে পারল। চায়ের কাপটা একটা দোকানের পাঁচিলে রেখে মুখে শব্দ করে জানতে চাইল… দিদি…
প্রদীপদা বলল, হার্টের অসুখ হয়েছিল রে। আজ একটু আগে খবর এসেছে….
গগন উন্মাদের মত হুইলচেয়ারের চাকাটায় মোচড় দিল। তারপর সমস্ত শক্তি দিয়ে চালাতে লাগল। বাজার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। গাছটায় পাখির দল কিচিরমিচির করছে। মায়ের দালান ছাড়িয়ে উল্টোদিকের ঢালু রাস্তাটা ধরল। দুটো চাকা বনবন করে ঘুরছে, গগনের বুকটা হাপরের মত উঠছে পড়ছে। আজ এমনিতেই তার শরীর ভালো ছিল না। জ্বর দু’দিন ধরে। কিন্তু যাবে কোথায়? ধীরে ধীরে অন্ধকার হল চারদিক। শাঁখ বাজছে এদিক ওদিক। সব ঠিক আছে। শুধু দিদি নেই। ঢাকের আওয়াজ দ্বিগুণ হল। আরতি শুরু হল। গগন শান্ত এখন। মোহনায় এসে দাঁড়িয়ে। তার শূন্য জীবনের নদী যেন কোন সীমাহীন শূন্যতায় ডুবে যাচ্ছে। চাকা ঘোরালো। এদিক ওদিক অস্থিরভাবে ঘুরে মদনপুর স্টেশানে যখন এল তখন রাত একটা বাজে। যে গাড়ি করে দিদি আসত, সে গাড়িই আবার তাকে গ্রামে পৌঁছে দিত। এখানে মায়ের মন্দিরে প্রণাম করে তবে স্টেশানে উঠত দিদি। গগন মায়ের মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে। গগন বলল, মা আমাকে নিয়ে নে….. রেললাইন অবধি হেঁচড়ে যাবে? নাকি কিছুটা দূরে বড় রাস্তা…. রাক্ষসের মত গাড়ি যায়…. দিদির সঙ্গে একবার কলকাতায় গিয়েছিল…. কেন মনে নেই……. ওরকম একটা গাড়ি এসে ধাক্কা দিলেই তো….
গগন হুইলচেয়ারের মুখটা রেললাইনের দিকে ঘোরালো। কী স্তব্ধ চারদিক। এগিয়েই যাচ্ছে, এগিয়েই যাচ্ছে। এতক্ষণে নিশ্চয়ই সব শেষ। দাহ হয়ে গেছে। তার বাজারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা বটগাছ তাকেও মনে রাখবে। সে কথা বলতে পারলে কত কত মানুষের এমন আসা যাওয়ার কথা বলবে। গগন মায়ের মুখে শুনেছিল, তার মা বিয়ের পর যখন গ্রামে আসছে প্রথম, তুমুল বৃষ্টি। এই বটগাছের তলায় তার বাবার হাতটা ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাকি কাঁপছিল। বটগাছটা নাকি তাকে বলেছিল, যা, ঘর বসা, এ ভালো মানুষ। সুখী হবি।
গগন রেললাইন থেকে কিছুটা দূরে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে। একটু গাছের আড়ালে। যাতে কারোর চোখে না পড়ে। একটু পর লালগোলা আসবে। এখনই হুইলচেয়ার থেকে নেমে নিজেকে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে লাইন অবধি নিয়ে তো যেতে হবে। ওই, ঘোষণা হল। একটু পর সিগন্যাল লাল থেকে সবুজ হবে। গগন নামল হুইলচেয়ার থেকে। ভিজে ঘাসে মুখ থুবড়ে পড়ল। পুলিশের গাড়ি গেল। দেখেনি তাকে। এবার ঘষটাতে শুরু করল নিজেকে নিয়ে। হাঁটুটায় কিছু ফুটল মনে হচ্ছে। ফুটুক। আর তো কিছুক্ষণ। সিগন্যাল সবুজ। ট্রেনের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। গগনের মনেপ্রাণে কী উত্তেজনা। সব থেকে মুক্তি এক লহমায় আজ। সব কিছু থেকে। মৃত্যুর পর হয় তো আত্মা বলে কিছু হয় না। হয় তো সব শেষ। সে-ই বা কম কি। আপের লাইনটা পেরিয়ে ডাউনের লাইনটায় যেতে হবে। আপের লাইনটা ছুঁলো। কী ঠাণ্ডা। হাঁপ ধরে গেছে। আলোটা দেখা যাচ্ছে। একবার পিছন ফিরে তাকালো। তার হুইলচেয়ারটা রাস্তার আলোর মধ্যে গড়িয়ে গেছে, তার নামার সময়ের ঝাঁকুনিতে। একটা কুকুর বসে আছে। ফাঁকা থাকে না, কিছু ফাঁকা থাকে না। সে গেলে কালীগঞ্জের কিছু আসবে যাবে না। দু’দিন মনে রাখব কিনা ঠিক নেই।
লালগোলা এসে পড়ল। গগন টেনে নিজেকে ডাউন লাইনে নিয়ে উপুড় করে শুইয়ে দিতে গিয়ে ধাক্কা লাগল একটা কুকুরের সঙ্গে। সে পার হতে যাচ্ছিল, এদিকে আসতে যাচ্ছিল, ওপার থেকে। একই পরিণতিতে রক্তাক্ত হয়ে, দলা পাকিয়ে পড়ে থাকল দুটো শব। ভোর হল। শুকতারা একা দাঁড়িয়ে থাকল এতবড় নেড়া আকাশে। হুইলচেয়ারে বসা কুকুরটা ঘুমিয়ে অঘোরে। পাশ দিয়ে এত এত জোরে যাওয়া গাড়ির শব্দেও ঘুম ভাঙছে না। কোথা থেকে দমকা হাওয়ায় একটা বটপাতা এসে পড়ল সিটের এক কোণে। ততক্ষণে রক্তের দাগ শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। ভোরের ট্রেন যাচ্ছে একের পর এক, ওদিকে রেললাইন দুটো পৃথিবীর বুকের উপর দুটো হাত মেলে শুয়ে, দুই দিগন্তে সর্বস্বান্ত হয়ে লীন।