Skip to main content

 

চাদরটা পাল্টাই? উঠবে?

কটা বাজে?

সাড়ে ন'টা।

চা দেব?

হয়ে গেছে?

হ্যাঁ।

দাও।

বাজারে যাবে?

কী আনতে হবে?

চাল। গোবিন্দভোগ। বাতাসা। কাজু। কিসমিস।

পায়েস করবে?

করি।

কেউ নেই। ছাদে। ঘরে। বারান্দায়। আসার রাস্তায়। যাওয়ার রাস্তায়।

দুপুর গড়িয়ে আটকে আছে বিকেলের আগে।

দশ বছর হল। গলা কাটা দেহ পাওয়া গিয়েছিল রেললাইনের ধারে। ক্রিমিনাল ছিল। ছেলে। আজ জন্মদিন।

টিভি চলছে। ভাতের থালা। তরকারির বাটি। পায়েস লাগা বাটি। সব এঁটো। সিঙ্কে জমে। পরে মাজা হবে।

শোবে?

তুমি?

আমি একটু বসি?

টিভি দেখবে? দেখি।

আমিও দেখি।

টিভি দেখতে দেখতে দুই জোড়া চোখ লাল।

মাঝে মাঝে জল কাটছে। যেন আবহাওয়া পরিবর্তন। সর্দি লাগছে।

ছাদে যাই। তুমি শোও। দাড়িটা কাটবে?

দেখি।

দুজনে দুই চোখ এড়িয়ে ঘর বদলালো।

ছাদের সিঁড়ি। বুক ভার। শ্বাসকষ্ট। দাঁতের নীচে মাড়ি বেয়ে কান্না বান। গলার কাছে করাত চেরা আন্দোলন।

ছাদে বসা কটা কাক। উড়ে গেল। যেন অপেক্ষায় ছিল। যারা যায় তারা কাক হয়ে ফিরে আসে। কিন্তু এ মৃত্যু তো বড় অসামাজিক। এ শোক বড় অসামাজিক। কাক তো সামাজিক প্রাণী। আসবে?

শুকনো কাপড়গুলো বাঁহাতে ধরা। শরীরটা শুকাচ্ছে। নতুন ব্লাউজ বানানো হয় না। বাঁদিকের কাঁধ থেকে নেমে নেমে যায়। কয়েকটা সিঁড়ি নামতে নামতে শুনল গোঙানি। বালিশ চাপা। সিঁড়িতে বসল। শুকনো কাপড়গুলো কোলের উপর রেখে, বাঁ কাঁধ থেকে নেমে যাওয়া ব্লাউজটা তুলতে তুলতে বিনা নিয়ন্ত্রণে কয়েক বিন্দু জল পড়ল শুকনো কাপড়ে। এ কান্না বড় অসামাজিক।

অন্ধকার নামতে নামতে ঘর হল আরো অন্ধকার। আলো জ্বালতে জ্বালতে ঘর হল আরো শূন্য। দুটো প্রাণের আসা যাওয়া শ্বাস। অভিশাপ। বড় ভার। বাইরে যাবে?

কোথায়?

গঙ্গার ধারে।

সেই রেললাইন পেরিয়ে।

চলো।

রেললাইন। রাস্তা। দোকান। রাস্তার আলো। অন্ধকার আকাশ। হাজার চোখ মেলে তাকিয়ে। অসামাজিক শোকের দিকে। শকুনের মত।

সে চোখ এড়িয়ে, বাঁ কাঁধ থেমে নেমে নেমে পড়া ব্লাউজ সামলিয়ে, ওর হাতটা শক্ত করে ধরে এসে দাঁড়ালো শ্মশানের সামনে। একটা প্রদীপ যদি জ্বালা যায়। আছে তো শ্মশান কালী। শ্মশান কালী বিচার করে না। দুজনে এসে দাঁড়ালো। প্রদীপ জ্বালল। কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে বলল, মা!

ডোম বলল, ভালো আছেন?

লজ্জা ছুঁড়ে মারল। ঘেন্না ছুঁড়ে মারল।

দুজনে আড়ষ্ট হয়ে বলল, আছি….

কী লজ্জা। কী লজ্জা।

শ্মশান কালী একা দাঁড়িয়ে। প্রদীপের আলোয় চকচকে তাকিয়ে গলায় ঝোলানো মুণ্ডমালারা। গলায় রেখেছ মা? আমার ছেলেকেও? ভুল ছিল। মানুষ করতে পারিনি। ভুল ছিল। তবু গলায় রেখেছ। তবু হাতে রেখেছ ঝুলিয়ে। ঘেন্নায় ফেলে তো দাওনি, মা! মা!

শোও।

আলোটা নিভিয়ে দিলাম।

দাও।

আমাদের মরণ নেই, না গো।

অন্ধকার। ক্ষীণ আলো। সামাজিক ঘেন্না চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঢুকছে অসামাজিক শোকের ঘরে। কেউ আটকায় না। কেউ না। কেউ পারে না। গোটা সমাজকে ছাপিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে একা - শ্মশান কালী।