Skip to main content

 

333.jpg

 

মানুষের পেটে কতটা গোঁজামিল সহ্য হয়? যেখানে সেখানে গোঁজামিল দিতে দিতে আমরা আমাদেরই উপর সন্দিহান হয়ে পড়েছি। মনে মনে ভাবছি, মিল তো পাচ্ছি, কথায় যুক্তিও আছে, কিন্তু কতটা আসল সেটা?

এই আসল না নকল, এ ভয় আমাদের সব কিছু নিয়ে। এমনই গা সওয়া হয়ে গিয়েছে এই দ্বন্দ্ব যে এ নিয়ে আলাদা করে ভাবার দরকার হয় না। তবু গোঁজামিল তো দিনের শেষে গোঁজামিলই।

আমরা যতটা স্মার্ট নিজেদের ভাবি, আদতে যে তা নই সে তো প্রতি পদে পদে টের পাই। জীবনের পরতে পরতে এত জটিলতা, আমরা বুঝি আমরা আর থই পাচ্ছি না। কিন্তু তাও জীবন তরীর দাঁড় টেনে যাই, কারণ ওটাই আমার ভবিতব্য।

আমরা কোনোদিন গোটাগুটি বুদ্ধিমান হব না। কিন্তু গোঁজামিলের পরিমাণ অল্প অল্প কমাতে পারি। এটা সাধন হতে পারে। অনেক প্রিয় গোঁজামিলকে ত্যাগ দিতে হবে। কষ্ট হবে। কিন্তু উপায় কী? নিজেকে সুখী রাখার জন্য কম গোঁজামিল জড়ো করেছি! নানা অসঙ্গতির খবর জানি। আর যেখানে যেখানে যা যা হাতের কাছে পেয়েছি সে সব গোঁজা গুঁজে মিল ঘটিয়েছি। দিনে দিনে সে সব আবর্জনায় ভরে গিয়েছে। ভিতরে ভিতরে আমাকে দুর্বল করে দিচ্ছে প্রতিদিন। কিন্তু তাও ছাড়তে পারছি না। কারণ অনেক শখ করে বহু যত্নে বানানো আমার সেই গোঁজামিলের মালা। ফেলে দেব? হ্যাঁ, দিতে তো হবেই। কেন? কারণ একটাই, ওতে সত্য নেই। কিন্তু সত্য দিয়ে তো আমাদের জীবন চলে না, আমার অনেক মিথ্যা লাগে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে। এও সত্য। কিন্তু ভাবের অসঙ্গতি আর তথ্যের অসঙ্গতির মূল্য আলাদা আলাদা দিতে হয় যে। ভাবের অসঙ্গতিতে ভেতরের লোকসান আর তথ্যের অসঙ্গতিতে বাইরের। মানুষের চিত্তে তথ্য অনুযায়ী ভাব নির্মাণ হয়। আবার সেই ভাব তথ্যকে রঞ্জিত করে নিজের রুচি অনুযায়ী। এ জটিল একটা জাল। এই জাল ফাঁদ হয়ে যায় যদি এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে গোঁজামিলের বাসা থাকে। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের যা যথেষ্ট আছে। আমাদের শিক্ষার একটা প্রধান কাজ হচ্ছে এই গোঁজামিলগুলোকে চিনে চিনে উৎপাটন করা।

সমস্যা এইখানে আরো গুরুতর। এই সংশোধনের চেষ্টার কয়েকটি বাধা আছে। একটা আমাদের পুরোনো অভ্যাস। দুই আমাদের অন্ধ শ্রদ্ধা। তিন বহু নকল অথরিটি। একে একে আসা যাক।

পুরোনো অভ্যাস ছাড়া শক্ত। তার জন্য ব্যক্তিগত চেষ্টা লাগে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু অন্ধ শ্রদ্ধা? একটা উদাহরণ দেওয়া যাক।

আমাদের দেশে সাপে কাটলে ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়ার রীতি ছিল। কারণ সাপের বিষ ও তার কারণ নিয়ে আমরা গবেষণা না করে দেবীর উপর ভরসা রেখেছিলাম। এই ভাবনাও বাস্তব আর যুক্তির অসংগতির ঠেকনা দেওয়ার আরেক গোঁজামিলের উদাহরণ। দুর্ভাগ্য হচ্ছে আজও এই অন্ধ শ্রদ্ধা বহু বহু প্রাণ কাড়ছে। যদিও এই নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য অনেক কাজ হচ্ছে, কিন্তু তাও প্রয়োজন আর মিটছে কই? সাপে কাটলে ওঝা না হাসপাতালে নিয়ে যান, এ কথা বলেই যেতে হবে তদ্দিন অবধি যতদিন না সব মানুষের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়।

এরপর আসে নকল অথরিটির দল। এরা সমাজে, রাজনীতিতে, ধর্মে বিরাট বিরাট ফাঁদ পেতে বসে। রাতদিন প্রোপাগান্ডা চলছে। পা দিয়েছ কী ফেঁসেছ। এদের একটাই জাদুকাঠি, ভাষার চাতুরী। সে চাতুরী দিয়ে তারা হয় ভয় দেখায় নয় নকল আশ্বাস দেয়। দুর্ভাগ্য হল মানুষের দুই দুর্বল জায়গা। ফলে প্রোপাগান্ডার শিকার হয়ে যায় সহজেই। দলাদলি, সাম্প্রদায়িকতা, প্রাতিষ্ঠানিকতা ইত্যাদি সমস্যা সব এই নকল অথরিটিদের জন্যই। মানুষ প্রতিবাদের গলা উঁচু করলেই এরা চোখ রাঙায়। দাঁত নখ বার করে দল পাকিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এদের ক্ষমতা বেশি, কারণ এদের অর্থ বেশি, অন্ধ অনুসারী বেশি। ব্যস, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিবাদের গলা শান্ত হয়ে যায়। তবে বিদ্রোহ বিপ্লবও কি হয় না? হয়, সময়ে সময়ে সেও হয়। তবে ওই যে সময়ে সময়ে। তাতেও ফল হয়। কিছুদিনের জন্য নতুনের হওয়া বয়। আবার নতুন নকল অথরিটির জন্ম হয়।

আমাদের সমাজে নকল অথরিটির অভাব নেই কোনোদিন। পাড়ার গুণ্ডা থেকে নকল গুরু, দুষ্ট নেতা থেকে খোসামুদে mnc কোম্পানি কে নেই সে তালিকায়? যাকে মাথায় তুলি সেই মাথায় উঠে নাচে, মাথা চিবিয়ে যায়। আমি অসহায় হয়ে তেত্রিশকোটি দেবতার পায়ে মাথা কুটে মরি। ঘুমন্ত ডাকে কে আর সাড়া দেয়? তাই কোনো দিক থেকে কোনো সাড়াই পাওয়া যায় না।

পশ্চিমের দেশে সক্রেটিস জন্মেছিলেন একটি কথাই বলতে, নিজেকে জানলে এটুকু জানা যায় যে কিছুই জানা হল না। অন্যকে জ্ঞান দেওয়ার তথ্য আমার ভাণ্ডারে হয় তো ভরে আছে। প্রতিবেশীকে তাক লাগিয়ে দেওয়ার মত সম্পদও বা হয় তো আছে। কিন্তু আমি নিজে কী? কী জানি? কতটুকু জানি? কী শিখেছি? আসল শিক্ষা কেতাবি শিক্ষার থেকে একটু আলাদা। আসল শিক্ষা আর ক্রিটিকাল থিংকিং একই কথা। আসলে নকলে, মঙ্গলে অমঙ্গলে যদি ফারাকই না করতে শিখলাম তবে আর কীসের শিক্ষা?

সক্রেটিস এই ফারাক করার শিক্ষাটা দিয়ে আমাদের বাঁচিয়েছিলেন। আমাদের জানায় চিরকাল অনন্ত ফাঁক থেকে যাবে। কিন্তু সেই ফাঁক যেন গোঁজামিলে না ভরাই। সে অপূর্ণতার জ্ঞান যত খাঁটি হবে মাথা তত শান্ত হবে। আমি জানব যে আমার জীবন আজ না হয় কাল শেষ হবে কিন্তু এ জগতে জীবনধারা তো শেষ হবে না। এ ধারায় কোনো ফাঁকি, গোঁজামিল যেন ভেসে না বেড়ায়। আমার জন্য না হলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অন্তত আমাকে তৎপর হতে হবে। আমাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকা সাজে না আমাকে। সে গোঁজামিল দূর করতে হবে আমার দ্বারা যতটা সম্ভব।