সুজাতার চুল আঁচড়াচ্ছিল আরতি। সুজাতা হুইলচেয়ারে বসে। বয়েস হয়েছে ষাটের কাছাকাছি। সুজাতা গঙ্গার দিকে মুখ করে বসে। দুদিন হল আরতির সঙ্গে কাশী এসেছে। আরতি সুজাতার দেখাশোনা করে। বিধবা, নিঃসন্তান। বয়েস চল্লিশ ছুঁই ছুঁই।
বিকেলের রোদ এসে পড়েছে সুজাতার মুখের উপর। সুজাতা হঠাৎ বলল, ভগবান কারোর আপন হয় না আরতি, এ কথাটা মনে রাখিস।
আরতি বলল, কেন বলছ হঠাৎ?
সুজাতা বলল স্পষ্ট কিছু কারণ আছে তা হয় তো নেই। কিন্তু দেখ আমি সেই স্কুল জীবন থেকে কত কী করলাম। দীক্ষা হল সেই কোন বয়সে। তোর জামাইবাবু ধার্মিক মানুষ ছিলেন। কত তীর্থে ঘুরলাম। পুজো-আচ্চা তো বাড়িতে লেগেই থাকত। জামাইবাবু গেলেন। আমিও কতদিন ওই নিয়ে থাকলাম, কিন্তু জীবনে যত পশ্চিমের রোদ পড়ছে আরতি তত বুঝছি সবই কোথায় যেন মানে হারাচ্ছে। পায়ের তলায় সেই আগের মাটি পাই না। এখন অবশ্য পায়ের তলায় কোনো মাটিই খুঁজি না। যা আছে সে আমি স্বীকার না করলেও আছে, আর যা নেই সে আমি স্বীকার করলেও নেই। কিন্তু এটা জানিস ভগবান কারোর আপন হয় না রে। তোর ভাগ্য তোর জীবন নিয়ে যা করার করেই যাবে। তুই সান্ত্বনার জন্য অনেক কিছু করতে পারিস, শেষে কিন্তু তুই একা। তোর সেই একা তুই এর যদি বিশ্বাস থাকে ঈশ্বর তোর আপন তবে আপন, যদি মনে হয় না, তবে না। নির্ভর করছে গোটাটাই তোর উপর।
আরতি বলল, দাঁড়াও চা নিয়ে আসি, হোটেলের ছেলেটা ডাকছে।
========
বিশ্বনাথ মন্দিরে একটা চাতালের উপর বসে আছে সুজাতা। পাশে আরতি। মন্দিরে সন্ধ্যারতি চলছে। সুজাতা দুটো হাত জড়ো করে কোলের উপর রেখে। দুটো চোখ বন্ধ।
আরতি শেষ হল। সুজাতা চোখটা খুলে বলল, আরেকটু বসি। তারপর ঘাটের কাছে গিয়ে বসব।
আরতি মাথা নাড়ল।
========
অন্ধকার গঙ্গার দিকে তাকিয়ে বসে সুজাতা। আরতি বলল, তুমি বললে ভগবান কারোর আপন হয় না, তবে মন্দিরে অত নিষ্ঠার সঙ্গে কাকে ধ্যান করছিলে?
সুজাতা হাসল। বলল, কেন রে, মহাদেবকেই।
সে তো তোমার আপন না।
কিন্তু পরও তো না। সে আপন পর দুটোর কোনোটাই না। সে সে-ই। তুই তাকে ভাবতেও পারিস, নাও পারিস। কিন্তু তাকে কোনোদিন নিজের করে পাবি, এ ভাবনা রাখিস না, কষ্ট পাবি অবশেষে।
তবে মানুষ বাঁচে কী নিয়ে? কী আশ্বাসে? এত যে গানে আছে, মহাপুরুষের বাণীতে আছে, ভগবানই একমাত্র আপন, বাকি সব পর। কী হবে এগুলোর মানে তবে?
শোন, ওরা যে “আমি”র আত্মীয় ভগবানকে বলে, সে “আমি” নিয়ে কি সংসার চলে রে? এই যে গঙ্গার জেটি, নিজেকে বেঁধে রাখে মাটির সঙ্গে, গঙ্গা কি তার আপন হয়? কিন্তু থাকে তো পাশাপাশি। এমনিতেই আমরা মেয়েমানুষ, ধর্মের যত ভয়, শাসন, অনুশাসন সব আমাদেরই উদ্দেশ্য করে। আমাদের নিয়ে ওদের ভয়। তার মধ্যে এমন বড় “আমি” নাকি আমাদের বানাতে হবে যে ভগবান আপন হয়ে যায়। ধুর ধুর! ছেলে ভুলানো কথা সব! ক্রমে গুটিয়ে নিজের মধ্যে নিজেকে নিয়েই বাঁচতে হয় আরতি। তুই ছাড়া তোর আপন কেউ নেই। এটা মন মানে না, কিন্তু অভিজ্ঞতা মানে। তাই না রে?
তবে কাশী এলে কেন? দীঘা গেলেই হত।
কেন রে? আমি কি এসব অভিমানে বলছি যে কাশী আসব না? তাছাড়া দীঘায় যাই কি সমুদ্রকে আপন করতে? এখানেও তো সুখ আছে। এত এত মানুষের শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, ভালোবাসা। এও কী কম! এর মধ্যেও তো আনন্দ আছে। নেই?
কিন্তু সে তো অন্ধবিশ্বাসও হতে পারে?
দেখ, আমি বললাম আনন্দের কথা, তুই আনছিস বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথা। আনন্দ পেতে কি অত হিসাব লাগে? ভগবান আপন না হোক, কিন্তু এত এত মানুষের যোগাযোগ যে সুতোয়, সে সুতোর তো একটা মর্যাদা আছেই। নেই? নইলে যে এত এত মানুষকে অপমান করা হয়।
আরতি বলল, চলো, ঠান্ডা লাগবে এবার। ভগবান আপন হোন না হোন, কিন্তু তোমায় তো নিজের বলে জেনেছি, ওতেই হবে আমার। চলো।
সুজাতা বলল, চল।