Skip to main content

 

কল্পনা ব্যতীত আনন্দের জন্ম হয় না। বিপরীতটাও সত্য, কল্পনা ছাড়া মানুষের উদ্বেগের জন্মও হয় না।

প্রথমে আনন্দের দিকটা দেখি। রাশি রাশি জলরাশির সামনে দাঁড়ালে মনের মধ্যে যে আনন্দ, শান্তি, মুক্তির অনুভব হয়, সে চোখের বাইরের ওই জলরাশির দৃশ্যের সঙ্গে কল্পনাকে মিশিয়েই। যাকে আমি সমুদ্র দর্শনের আনন্দ বলি।

ঠিক তেমন, বিশাল উঁচু ভূখণ্ডের উপর বরফ পড়ে আছে, এটুকুর জন্যেই মানুষের আনন্দ হয় না, ওর সঙ্গেও তার কল্পনা মেশে। তবেই সেটা কাঞ্চনজঙ্ঘা বা অমন কোনো পাহাড় পর্বত দর্শনের আনন্দ বলা যায়। ঠিক তেমন জঙ্গল, ঐতিহাসিক শহরের ধ্বংসাবশেষ ইত্যাদিতে মানুষের চিত্তের আনন্দ, ছুটি, মুক্তি।

কল্পনা করছি - এ বোধটা যখন সচেতনভাবে আমরা করি, তখন তাকে ঠিক খাঁটি কল্পনা বলা যায় না। তার মধ্যে আমার অতৃপ্ত বাসনার রঙ লাগে। সে কখনও তাই দিবাস্বপ্নের সুখ জাগায়, কখনও উদ্বেগে প্রাণ অস্থির করে তোলে। সে কল্পনা বাসনারই রঙিন পোশাক। হঠাৎ দেখলে চেনা যায় না, কিন্তু তলিয়ে দেখলেই ধরা পড়ে।

তবে আমাদের মধ্যে দুটো কল্পনা আছে কী? একটা বাসনার দ্বারা রঙিন, আর একটা আমার সত্তার স্বভাবের দ্বারা? একটু উদাহরণে দেখা যাক। একটা গোলাপ ফুল চোখে পড়ল, আমি তাকালাম। ভাবলাম ফুলটা তুলব, অমুককে দেব, তারপর কী হবে? এই শুরু হল বাসনার আগ্রহে জাগা কল্পনার ধারাবিবরণী। কখনও দিবাস্বপ্নের সুখ, কখনও অঘটনের ভয়। দুই-ই জাগে আমার কল্পনায়।

আবার অন্যভাবে যদি ভাবি? গোলাপটা চোখে পড়ল। তার লালরঙ দৃষ্টিতে আসা মাত্র মনের মধ্যে কী যেন শুরু হয়ে গেল। মাধুর্য জাগল। এক বিন্দু বালিকণা যেমন ঝিনুকের বুকে জমে থাকা মুক্তোর আবেগকে মুক্ত করে দেয়, ধীরে ধীরে মুক্তো গড়ে ওঠে, এও তেমন। একটা গোলাপ মনের মধ্যে জমে থাকা মাধুরী, যা কল্পনাই আদতে, বিশুদ্ধ কল্পনা, তাকে জাগিয়ে তুলল। মনের মধ্যে আনন্দ জন্মালো।

এই মাধুরীকে আমাদের বৈষ্ণবসাহিত্য বড় দরদ দিয়ে ফুটিয়েছে তার কাব্যে। একটা উদাহরণ দিচ্ছি। সংস্কৃত জানা পণ্ডিত হতে হবে না, শুধু একবার মন দিয়ে যদি পড়ি, দেখি কী অদ্ভুত মাধুর্যে সব মধুময় করে তুলেছেন কবি।

 

অধরং মধুরং বদনং মধুরং

নযনং মধুরং হসিতং মধুরম্ ।

হৃদযং মধুরং গমনং মধুরং

মধুরাধিপতেরখিলং মধুরম্ ॥ 1 ॥

বচনং মধুরং চরিতং মধুরং

বসনং মধুরং বলিতং মধুরম্ ।

চলিতং মধুরং ভ্রমিতং মধুরং

মধুরাধিপতেরখিলং মধুরম্ ॥ 2 ॥

বেণু-র্মধুরো রেণু-র্মধুরঃ

পাণি-র্মধুরঃ পাদৌ মধুরৌ ।

নৃত্যং মধুরং সখ্যং মধুরং

মধুরাধিপতেরখিলং মধুরম্ ॥ 3 ॥

গীতং মধুরং পীতং মধুরং

ভুক্তং মধুরং সুপ্তং মধুরম্ ।

রূপং মধুরং তিলকং মধুরং

মধুরাধিপতেরখিলং মধুরম্ ॥ 4 ॥

করণং মধুরং তরণং মধুরং

হরণং মধুরং স্মরণং মধুরম্ ।

বমিতং মধুরং শমিতং মধুরং

মধুরাধিপতেরখিলং মধুরম্ ॥ 5 ॥

গুংজা মধুরা মালা মধুরা

যমুনা মধুরা বীচী মধুরা ।

সলিলং মধুরং কমলং মধুরং

মধুরাধিপতেরখিলং মধুরম্ ॥ 6 ॥

গোপী মধুরা লীলা মধুরা

যুক্তং মধুরং মুক্তং মধুরম্ ।

দৃষ্টং মধুরং শিষ্টং মধুরং

মধুরাধিপতেরখিলং মধুরম্ ॥ 7 ॥

গোপা মধুরা গাবো মধুরা

যষ্টি র্মধুরা সৃষ্টি র্মধুরা ।

দলিতং মধুরং ফলিতং মধুরং

মধুরাধিপতেরখিলং মধুরম্ ॥ 8

তেমনই মাতৃভক্ত সাধক-কবি, শিবভক্ত সাধক-কবি প্রত্যেকেই নিজ নিজ রুচি অনুযায়ী জগতকে নিজের মাধুরীর কল্পনায় রাঙিয়ে নিয়েছেন। কোনো বাসনার প্ররোচনা নেই বলে সেখানে না আছে ভয়, না ক্রোধ।

কিন্তু জীবনে সব সময় তো এমন মাধুরীর জোগান থাকে না চিত্তে। তখন? রবীন্দ্রনাথের গানে আছে এর কথা - “সকল মাধুরী লুকায়ে যায়, গীতসুধারসে এসো।”

জীবনে সব চাইতে বড় সম্পদ দাদা মনের মধ্যে এ মাধুরীটুকু। নইলে সব থাকে আমাকে ঘিরে, সম্পদ-সৌভাগ্য-স্বাস্থ্য-পরিজন ইত্যাদি ইত্যাদি… কিন্তু আমিই থাকি না।

কেউ বলবে, কিন্তু কল্পনা মানে তো মিথ্যা। মানুষ কি শেষমেশ মিথ্যার বেসাতি নিয়ে থাকবে?

এর উত্তর আরেকটু কঠিন দার্শনিকের মত। আমার এই যে আমি, যে নানা মাধুরীতে ডুবে কল্পনায় মজেছে, সে নিজেও তো এক অকৃত্রিম কল্পনা। চিকিৎসকের কাছে যে আমি, আদমশুমারীর কাছে যে আমি, সে আমি কী আর আমার আমি? চিকিৎসক আমাকে অজ্ঞান করেও আমার অস্তিত্বকে বস্তুজগতে খুঁজে পায়। কিন্তু অজ্ঞান হয়ে গেলে সে কল্পনাকারীই বা কই, আর সে মাধুরীর ধারকই বা কই?

তাই ভারতীয় দর্শনে একদল এ সত্যের দিকে তাকিয়ে বলছে সব মায়া, আরেকদল বলেছে সব লীলা। দুই-ই সত্য, অবস্থাভেদে, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন।

মহানাদের জটেশ্বর শিবমন্দিরে দাঁড়িয়ে আছি যখন, একজন বয়স্ক মহিলা কাঁসর বাজাচ্ছেন, দুজন মধ্যবয়সী পুরুষ ঢাক, মাদল বাজাচ্ছেন, পূজারী আরতি করছেন পঞ্চপ্রদীপে….সব মিলিয়ে সন্ধ্যের সেই মুহূর্তটায় এ কথাগুলোই মনে হচ্ছিল। মানুষ রাতদিন তার মধ্যে এক মহামানবের অস্তিত্বকে খুঁজছে। না পেলে গ্লানিতে জর্জরিত হচ্ছে। নিজের মধ্যে মহতের শূন্যতাকে মহতী বিনষ্টি বলছে। সে যে-ই হোক না কেন। সংসারের সম্পদ আর মানের প্রতিযোগিতায় যত তুচ্ছ হোক না কেন সে, সেও চায় নিজের মধ্যে মহতের সার্থকতা। রবীন্দ্রনাথের বাণীতে…

“……তিনি রহিয়াছেন— ভয় নাই, ভয় নাই! সম্মুখে যদি অজ্ঞান থাকে তবে দূর কর, অন্যায় থাকে তবে আক্রমণ কর, অন্ধ সংস্কার বাধাস্বরূপ থাকে তবে তাহা সবলে ভগ্ন করিয়া ফেল; কেবল তাঁহার মুখের দিকে চাও এবং তাঁহার কর্ম্ম কর। তাহাতে যদি কেহ অপবাদ দেয় তবে সে অপবাদ ললাটের তিলক করিয়া লও; যদি দুঃখ ঘটে সে দুঃখ মুকুটরূপে শিরোধার্য্য করিয়া লও; যদি মৃত্যু আসন্ন হয় তবে তাহাকে অমৃত বলিয়া গ্রহণ কর! অক্ষয় আশায়, অক্ষুণ্ণ বলে, অনন্ত প্রাণের আশ্বাসে, ব্রহ্ম-সেবার পরম গৌরবে সংসারের সঙ্কট পথে সরল হৃদয়ে ঋজু দেহে চলিয়া যাও! সুখের সময় বল, অস্তি—তিনি আছেন, দুঃখের সময় বল, অস্তি—তিনি আছেন, বিপদের সময় বল, অস্তি— তিনি আছেন! পরমাত্মার মধ্যে আত্মার অবাধ স্বাধীনতা, অপরিসীম আনন্দ, অপরাজিত অভয় লাভ করিয়া সমস্ত অপমান দৈন্য গ্লানি নিঃশেষে প্রকাশিত করিয়া ফেল!”