শ্রাবণের মেঘলা দুপুর। জয়রামবাটিতে একটা বাঁধানো পুকুরঘাটে বসে আছি। ঠাণ্ডা জোলো বাতাস লাগছে গায়ে। দেখতে দেখতে হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামল। পুকুরের জলের উপর বৃষ্টির ধারা নামছে অঝোরে। মনের সব বোঝা কোথায় যেন ভেসে যাচ্ছে। কোথাও যাওয়ার নেই, কোনো তাড়া নেই। মনে পড়ল মায়ের দুটো চোখ। দরদী দুটো চোখ। কিন্তু এ চোখ আমি যেন স্পষ্ট দেখেছি, সে কথাই কী গভীর অনুভূতি নিয়ে প্রাণে জেগে উঠল।
ফুটপাতে দাঁড়িয়ে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছি। ও ফুটে একটা ষোলো সতেরো বছরের ছেলে ফল বিক্রি করছে ভ্যানে। রোগা গঠন। সাদার উপর কালো চেক চেক হাফ হাতা জামা আর ঘিয়ে রঙের একটা প্যান্ট পরে। একজন অন্ধমানুষ ওই ফুটপাত ধরে হেঁটে আসছে। হাতে লাঠি। কাঁধে দুটো ব্যাগ। ব্যাগদুটো ভর্তি বোঝা যাচ্ছে। বয়েস হয়েছে। লাঠি তার ফলের ভ্যানে ঠেকল। সে ছেলেটা উঠে গিয়ে তার হাত ধরে সামনের দিকে এগিয়ে দিতে গেল। কিন্তু সে মানুষটা এই ফুটপাতের দিকে আঙুল দেখালো। তাকে রাস্তা পার করে দিতে বলল নিশ্চয়ই।
ছেলেটা তার হাত ধরে ডানদিক বাঁদিক দেখতে দেখতে রাস্তা পার করে দিল। রাস্তায় গাড়ি তেমন নেই, তবু কী সাবধানে পার করল।
আমি যেদিকে দাঁড়িয়ে সেদিকে এসে বলল, পারবে তো এইবার যেতে?
অন্ধ মানুষ কৃতজ্ঞতার হাসি হেসে বলল, পারব।
ছেলেটা তার হাত ছেড়ে ওপারে যাচ্ছে। কিন্তু যেতে যেতেও ফিরে তাকালো দুবার। কী একটা দরদ উৎকণ্ঠা ওই অল্প বয়েসী ছেলেটার চোখে।
রাস্তা পার করে দেওয়াটা কর্তব্য হতে পারে। কিন্তু ওই যে ফিরে তাকানো। ওটা দরদ। মায়ের দরদ। যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা। এই তো মায়ের চোখ।
মনটা কী স্নিগ্ধ পবিত্রতায় ভরে এলো আমার। বৃষ্টি পড়ছে ভীষণ। সন্ধ্যে নামছে। আমার মনে আসছে রবীন্দ্রনাথের গান,
কোন্ দূরের মানুষ যেন এল আজ কাছে,
তিমির-আড়ালে নীরবে দাঁড়ায়ে আছে।
বুকে দোলে তার বিরহব্যথার মালা
গোপন-মিলন-অমৃতগন্ধ-ঢালা।
মনে হয় তার চরণের ধ্বনি জানি--
হার মানি তার অজানা জনের সাজে॥