সুনীতা উইলিয়ামস পৃথিবীতে ফিরলেন। সারা বিশ্ব উচ্ছ্বসিত। সেটাই স্বাভাবিক। ভারতীয়ারও উচ্ছ্বসিত। গুজরাটের যে গ্রাম সুনীতার সঙ্গে যুক্ত তারাও উচ্ছ্বসিত। এখানেই খটকা।
মাত্র কদিন আগে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান মিলিয়ে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় নদীতে স্নান করে এলো। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ভারতীয় জ্যোতিষীর দরজায় লক্ষ লক্ষ টাকা ঢেলে আসেন তার গ্রহ-নক্ষত্রকে ঠিক করে দেওয়ার জন্য। টিভির চ্যানেলে চ্যানেলে চুটিয়ে ব্যবসা চলে।
এখন এর মধ্যে কোনটা সত্য? দুটোই সত্য। সুনীতার ফিরে আসাটা আবেগী সত্য। আর জ্যোতিষের দরবারে হানা দেওয়াটা বুদ্ধির ভ্রান্তিক সত্য। প্রথমটা ক্ষণস্থায়ী। দ্বিতীয়টা দীর্ঘস্থায়ী। এই তো বৈশাখ আসছে। রমরমিয়ে পাঁজি বিক্রি হবে। সেখানে জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি, মায় গর্ভাধানও গ্রহ-নক্ষত্রের চলন ছন্দে কীভাবে প্রভাবিত হতে থাকবে সব লেখা থাকবে। মরেও যে শান্তি নেই, সে পাঁজি পড়লেই জানা যায়, গ্রহ-নক্ষত্র ঠিক করে দেয় সে কত পাদ দোষ পেল।
ভারত যেদিন স্বাধীন হয়েছিল সেদিন পণ্ডিত নেহেরুর ‘'সায়েন্টিফ টেম্পারামেন্ট” এ দেশের একটা ভিত্তি স্থাপন হয়েছিল। এখন যত দিন যাচ্ছে সেই টেম্পারামেন্টটা অদৃশ্য হতে শুরু করেছে এমনকি তরুণ প্রজন্ম থেকেও, এটা আশঙ্কার। সুনীতা উইলিয়ামসের বিশ্বাসে আমরা বিশ্বাসী নই। আমরা জ্যোতির্বিজ্ঞান আর জ্যোতিষবিদ্যায় খুব একটা ফারাক দেখি না। সে দেশে গ্যালিলিও, ব্রুনো এই সত্যকে স্বীকার করার জন্য যাতনা ভোগ করেছিলেন, মৃত্যুবরণ করেছিলেন। আমাদের দেশে এমন উদাহরণ নেই বললেই চলে। নাই থাক। সত্য কোনো দেশের সম্পত্তি তো নয়। তাকে গ্রহণ করলেই মঙ্গল। কিন্তু যে সত্যের সঙ্গে বাস্তব-বুদ্ধি-অভিজ্ঞতা এক সূত্রে এসে বসে, সে সত্যে আমাদের তেমন আগ্রহ কোনোকালেই ছিল না। আমরা পক্সের জীবাণু খোঁজার চাইতে মা শীতলার উপর নির্ভর করেছি। চিত্তের পাপ সৎকর্মে শুদ্ধিকরণের চাইতে নদীতে ডুব দেওয়াকে চলনসই পন্থা জেনেছি। অর্থাৎ বাস্তবকে আমরা আমাদের ইচ্ছা-কল্পনানুগ দৃষ্টিতে দেখতে চেয়েছি। সেই অনুযায়ী নানা ন্যারেটিভও বানিয়ে নিয়েছি। তাই দিনে দিনে গোটা বিশ্বের দরবারে অপ্রাসঙ্গিকও হয়েছি।
তবে কী আমাদের দেশে বিজ্ঞান ছিল না, দর্শন ছিল না?
অবশ্যই ছিল। কিন্তু ওই যে বললাম, সায়েন্টিফ টেম্পারামেন্ট, ওটা আমাদের পরকালের মোহ আর অতীন্দ্রিয় লোকের অনুভবে বারবার হারিয়ে গেছে। আজ তো আরো বিপন্ন যখন গোটা দেশ ধর্মের আবেগকে আবার জাগিয়ে তুলতে চাইছে। সে আবেগ কতটা দৃষ্টিকে পরিষ্কার করবে আর কতটা দাহ করবে সে সহজেই অনুমেয়। কিন্তু মোহ বড় বিষম বস্তু। সে ততটা স্বচ্ছ দৃষ্টি চায় না যতটা ইচ্ছানুগ দৃষ্টি চায়। সায়েন্টিফিক টেম্পারামেন্ট স্বচ্ছ দৃষ্টি দেয়। উন্মুক্ত মনে যা কিছুকে তুল্যমূল্য বিচারের আলোয় দেখে। আবেগ সেখানে একপেশে অন্ধ গোঁয়ার্তুমি না। সত্যের আলোয় ধৌত হওয়ার আনন্দ। কিন্তু সে আনন্দে না দল খোলা যায়, না দেওয়াল তোলা যায়। তাই তা দিয়ে কোনো ক্ষুদ্রস্বার্থ চরিতার্থও করা যায় না।
মানুষের বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা আছে। মানুষ বিস্মিত হতে ভালোবাসে। একটা মাত্রা অবধি অবশ্যই। বিজ্ঞান সে রাস্তাকে উন্মুক্ত করে। অজ্ঞতা না। আমি যদি মানি সূর্য পশ্চিম দিকে ওঠে, ওটা আমার স্বাধীন মত না, ওটা আমার দৃষ্টিভঙ্গি না। ওটা আমার অজ্ঞতা। অজ্ঞতা কারোর মতামত হতে পারে না। অজ্ঞতার বিস্ময় আর বুদ্ধির নিজের সীমানা অনুভব করা বিস্ময় এক কথা নয়। প্রথমটা শিশুর বুদ্ধির মত নির্বোধ। দ্বিতীয়টা প্রাজ্ঞের মত শান্ত, সত্য।
সুনীতার প্রত্যাবর্তন উৎসব এ দেশে উদযাপিত হওয়া তখনই সার্থক হবে যখন এ দেশের শিক্ষিতেরা যুক্তির উপর দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেবে, জ্যোতিষীর গণনার উপর দাঁড়িয়ে না। ভয় তো ওই শিক্ষিতদের নিয়েই, যারা চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণে কপট বৈজ্ঞানিক যুক্তি দিয়ে খাবার ফেলে দেয়। যারা ছেলেমেয়েকে পরীক্ষার দিনে এক ঘন্টা আগে রাস্তায় বার করে দেয় শুভযোগ আছে বলে। তারাই যদি সুনীতা ফিরেছে বলে ধৈ ধৈ করে নাচে, বড্ড কেমন যেন লাগে। এতবড় বৌদ্ধিক অসংগতি নিয়ে বাঁচা যায় সুস্থভাবে?