জনাইয়ের ঠাকুমার সঙ্গে যে জনাইয়ের মা, রতিমণির সাপে-নেউলে সম্পর্ক সে গ্রামের সবাই জানত। সেদিন জ্যৈষ্ঠমাসের চাঁদিফাটা গরম, জনাইয়ের ঠাকুমা বিকেলে গা ধুয়ে এসে জনাইয়ের মায়ের ঘরে ঢুকেছে। জনাইয়ের মা নেই। বাজারে গেছে। জনাইয়ের ঠাকুমা সেই সুযোগে জনাইয়ের মায়ের সুগন্ধি পাউডার ভালো করে ঘাড়ে, বুকে, মুখে, পেটে মেখে সারা গ্রাম ঘুরে এসেছে। গ্রামে সবার মুখে এক কথা, আজ ঠাকুমার গায়ে কী গন্ধ! যেন অপ্সরা!
জনাইয়ের মা সন্ধ্যেবেলা গ্রামে পা দিতে না দিতেই সব জেনে ফেলল। শুধু জানা না, যেন গ্রামের সব গাছের প্রতিটা পাতায় পাতায়, জলে স্থলে মায় গোবরেও পাউডারের গন্ধ পেতে লাগল। বলাবাহুল্য সেদিন ভোর রাত অবধি জনাইয়ের বাড়িতে হাঁড়ি চড়েনি, ভোর রাত অবধি কেউ ঘুমায়নি পর্যন্ত। পাড়াপ্রতিবেশিরা খেয়েদেয়ে শোয়ার চেষ্টা করেছিল প্রাণপণ। কিন্তু পারেনি।
পরেরদিন জনাইয়ের ঠাকুমাকে দেখে সবাই আঁতকে উঠল। সারা কপাল চন্দনের ফোঁটা, গলায় গাঁদার মালা, আর নামাবলী জড়িয়ে জনাইয়ের ঠাকুমা গ্রামের রাস্তায় হেঁটে বেড়াচ্ছে। কারণ? কারণ হল জনাইয়ের মা নাকি শপথ নিয়েছে, বুড়ি তুই যেভাবেই মরবি সেইভাবেই তোকে চিতায় তুলব। কোনো সাজানো গোছানো হবে না।
এখন জনাইয়ের বাবা পেটে থাকতে জনাইয়ের ঠাকুর্দা মারা গিয়েছিল। জনাইয়ের ঠাকুমার যা একটু শখ ছিল সাজার সেদিন সব বিসর্জন দিতে হয়েছিল। একবার শহরে এক আত্মীয়ের বাড়ির বিয়েতে সেজেছিল বলে সেই ছবি নিয়ে গ্রামের লোকেরা কম হেনস্তা করেছে তাকে? যা হোক, জনাইয়ের ঠাকুমার শেষ ইচ্ছা, মরার পর তাকে যেন সুন্দর করে সাজিয়ে চিতায় তোলা হয়। জনাইয়ের মা সে কথা জানত। তাই বুড়ির লুকিয়ে লুকিয়ে তার সাজের জিনিস নিয়ে ছুঁক ছুঁক করা থামানোর জন্য এই মোক্ষম চালটা সে চেলে দিয়েছে। কাজও হয়েছে। বুড়ি সারাদিন নিজের মরার সাজ সেজে ঘুরে বেড়ায়, শুতে যায়। লোকে হাসাহাসি করে। বুড়ি কানে নেয় না। এখন হাসুক, কিন্তু তার কুশ্রী সাজশূন্য মৃত শরীর দেখে যেন না হাসে!
কিন্তু বিধাতার লীলা কে বুঝবে! একদিন জনাইয়ের মা গেছে শহরে সিনেমা দেখতে। জনাইয়ের ঠাকুমা দুপুরে দুটো ডালভাত খেয়ে চন্দন, গাঁদার মালা, নামাবলী পরে রামায়ণটা নিয়ে বসেছে, হঠাৎ কী যেন মাথায় খেলে গেল। ধীরে ধীরে জনাইয়ের মায়ের ঘরে ঢুকল। তার বিয়ের হাজার জায়গায় কাটা বেনারসিটা বার করল। জনাইয়ের মায়ের লিপস্টিক, পাউডার, কাজল -- সব একে একে পরল। এমনিতে ব্লাউজ পরত না, সেদিন জনাইয়ের মায়ের একটা ব্লাউজ গায়ে না হতেও পরল। পরে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালো। গোধূলির আলো এসে জানলা দিয়ে তার মুখের উপর পড়ল। জনাইয়ের ঠাকুমার মনে হল তার মা একগ্লাস দুধ এনে বলছে, কাল তোর বিয়ে পুতুল, আজ এটাই শেষ খাওয়া। খেয়ে নে। জনাইয়ের ঠাকুমা হাত বাড়িয়ে দুধের গ্লাসটা নিতে গিয়ে মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ল। মরল।
জনাইয়ের মা যখন রাতে এসে ঘরে ঢুকল তখন জনাই কী ওর বাবা কেউ ফেরেনি। জনাইয়ের মা ঘরে ঢুকে আলো জ্বেলে ওই দৃশ্য দেখে থ হয়ে দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর কোথা থেকে বুকের মধ্যে নাড়ি ছেড়া কান্না জন্মালো কে জানে! এত অসহায় নিজেকে আর ওই মৃত বৃদ্ধাকে যেন তার কোনোদিন লাগেনি। এত সুন্দরী ছিলেন উনি? জনাইয়ের মা শাশুড়ির পায়েতে হাত বুলাতে বুলাতে কাঁদতে কাঁদতে এক সময় থামল। ততক্ষণে সারা গ্রাম জেনে গেছে।
জনাইয়ের বাবা এসে বলল, খাট আনা হয়ে গেছে, মা-কে সাজিয়ে দেবে কী?
জনাইয়ের মা বলল, না… উনি সেজেই তো আছেন…. ওইভাবেই যাবেন।