Skip to main content

 

মাফলারটা গলায় পেঁচিয়ে যাচ্ছে রহমনের। দুপুরে মারকাটারি ঠাণ্ডা হাওয়া। বিঁধছে পাঁজরে, শিরদাঁড়ায়, গলায়। হরেকমাল নিয়ে সাইকেলে বেরিয়েছে। আগে ভ্যান নিয়ে বেরোত। এখন শরীর দেয় না। বয়েস ষাট পেরোলো। তার উপর লিভার ভালো না। হজম হয় না। সপ্তাহে দিনে রাতে কতবার যে বমি হয়।

আজকাল মনটায় চিনচিনে অসুখ লেগে থাকে। ভোটের লিস্টে নাম এসেছে তার। তাও কেউ কেউ বলছে তাকে নাকি এ দেশ ছাড়তে হতে পারে। যাবে কোন দেশে? দেশ বলতে কয়েকটা গ্রাম। কাঁচা, পাকা রাস্তা। ক’টা স্কুল। জেলা হাসপাতাল। স্বাস্থ্যকেন্দ্র। বাজার। মসজিদ। মন্দির। আর বিঘা বিঘা ক্ষেত। আর মানুষ। চেনা অচেনা। আসা যাওয়া করা মানুষ।

ওদিকে ভিড় কেন? ওহ, আজ তো পাঁচু বিশ্বাসের মায়ের কাজ। পাঁচুর বাবা তার সমবয়সী ছিল। হাঁপানিতে ভুগত বারোমাস। করোনায় চলে গেল। পাঁচুর প্যাণ্ডেলের ব্যবসা। ভালোই জমানো ব্যবসা। আজ বোধহয় ঘাটকাজ। রহমন সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়ালো। দুটো পাকা ঘর আর একটা মাটির ঘর। ওখানেই পাঁচুর বাবা মা থাকত আগে। এই পাকাঘর দুটো পরে পাঁচু তুলেছে। রহমনের কাঁচা বাড়ি। টালির ছাদ।

পাঁচু ওদিকে পুকুরধারে বসে। মাথা ন্যাড়া। সাদা ধুতি জড়ানো কোমর থেকে। তাকে দেখেই হাসল, বলল, চাচা ভেতরে আসেন।

রহমন সাইকেলটা একটা নারকেল গাছে ঠেস দিয়ে বাড়ির উঠানে নামল। ডানদিকে কাঁচাবাড়ি আর বাঁদিকে পাকাবাড়িটা পেরিয়ে পুকুরের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। বলল, একটা চাদর গায়ে দিসনি কেন পাঁচু? ঠাণ্ডা লেগে যাবে…কী হাওয়া দেখছিস না……

পাঁচু হাসল। বলল, হাওয়া তো ভালো না চাচা….কোনোদিকেই হাওয়া ভালো না। বুঝছ না?

রহমন বুঝেও কথাটা এড়িয়ে গেল। এসব কথা ভালো না। আজকাল কথা বড় বুঝে বলতে হয়। রহমনের নাতনি বড় মোবাইল চালায়। টুয়েলভে পড়ে। সে এটাসেটা দেখায়। উদ্বেগ জন্মায়। নাতনি বলে, এখন থেকে বুঝে কথা বলবা…ফস করে যা মুখে আসবে বলবা না। যা শুনবা সেখানেই রেখে আসবা। বুঝলে?

রহমন গাজরের ক্ষেতের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে। একা। নাতনির মোবাইলে দেখানো ভিডিওর কথাগুলো ভাবে। উদ্বেগ বাড়ে। মানুষে মানুষে উদ্বেগ বাড়া ভালো নয়। যে জাতেরই হোক না কেন, উদ্বেগ দেওয়া ভালো না। কিন্তু কারা জানি অলক্ষ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে। এই গাছ, মাটি, আকাশ, জল এদের তো উদ্বেগ হয় না? এরা তো সে তার দেখা ছেলেবেলা থেকেই একই প্রকার। তবে মানুষ এত মাথাগরম করে কেন?

মাথাটা ঘুরছে। একটা চেয়ারে বসল রহমন। পাঁচুর মেয়ে একটা ডিসে দুটো রসগোল্লা, দুটো সন্দেশ নিয়ে এসে বলল, তুমি খাও দাদু, আমি জল আনছি।

রহমন প্রথমে বলতে গেল পেটের কথা, রোগের কথা। বলল না। হাত পেতে নিল। বমি হতে পারে। হোক। কিন্তু ভুলবোঝাবুঝি হওয়া আর মনে ব্যথা দেওয়া ভালো না। সেটা না হোক। চুমকি জলের বোতল নিয়ে এসে পাশে রাখল। বলল, ফরজানা দিদি কেমন আছে? ওদের স্কুলে প্র‍্যাক্টিকাল পরীক্ষা কবে থেকে জানো?

রহমন হাসল। বলল, না রে, ও জানে ওর দাদু কিস্যু লেখাপড়া জানে না। তাই ওসব আমাকে বলে না। তুই ফোন করে নিস না।

চুমকি একক্লাস নীচুতে পড়ে। ইংলিশ মিডিয়ামে। চারচাকা গাড়ি আসে নিতে ওকে। আরো অনেক বাচ্চা যায়। তার পাশের বাড়ির ফারুকের নাতিটাও যায়। তার নিজের সামর্থ্য নেই। সরকারি স্কুলে পড়ে ফরজানা। পড়াশোনায় ভালো। বলে ও নাকি নার্সিং পড়বে। তারপর কেরালা যাবে। ওখানে ওর মাসি নার্সিং করে।

রহমন দুটো মিষ্টি কোনোরকমে গিলতে পারল। গা পাক দিয়ে উঠছে। আজকাল খেতে বড্ড অসুবিধা হয়। প্লেটটা হাতে বসে। ইতস্তত লাগছে। এ বোধটা বাড়ছে। বয়েস বাড়ছে বলে? নাকি অন্য কিছু?

পাঁচু উঠে এসে দাঁড়িয়েছে। বলল, জোর করে খেওনা চাচা, তোমার নাকি গেল সপ্তাহে এণ্ডোস্কপি হয়েছে? মুখে নল ঢুকিয়ে পরীক্ষা করেছে? ঘামছ কেন তুমি? কী লাগছে? ও চাচা…..

সব কেমন ঝাপসা লাগছে। ঘাম নামছে বগল বেয়ে পেটের পাশ দিয়ে। হাত পা অবশ লাগছে। ঠাণ্ডা হয়ে আসছে শরীর। তার পিঠের দিকে এসে কেউ দাঁড়িয়েছে। ঘাড়ে জল দিচ্ছে। পাঁচুর গলা পাচ্ছে। একবার রাস্তার দিকে তাকালো। হরেকমাল নিয়ে তার সাইকেলটা ঠেস দিয়ে দাঁড় করানো। হরেকমালের রঙগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে। এখান থেকে চলে গিয়ে একলা গাজর ক্ষেতে গিয়ে শুয়ে থাকবে। চারদিক অন্ধকার হয়ে আসতে আসতে ধীরে ধীরে আবার সব ঠিক হল। হাতে পায়ে সাড় ফিরল। ঘাম বন্ধ হয়ে আরো শীত করতে লাগল। একগাল হেসে বলল, ঠিক আছি আমি পাঁচু….আজকাল মাঝে মাঝে এটা হয়।

মাফলারটা গলায় পেঁচিয়ে যাচ্ছে আবার রহমনের। সাইকেলটা নিয়ে তার চিরকালের ডেরায় এসে দাঁড়ালো। এখানে বসবে। চার পাঁচটা বড় বড় গাছ বেড় দিয়ে শান্ত দীঘি একটা। এদিকে তেমন বাড়িঘর নেই। দূরে রেললাইন দেখা যায়।

রহমন বসে থাকতে পারল না। শুয়ে পড়ল। এই মাটির সঙ্গে মিশে তার আব্বা, আম্মি। এই হাওয়ায় মিশে পাঁচুর বাবা, মা। গ্রামের কত কত মানুষ এইখানেই তো জন্মালো, বাঁচল, মরল। তারও সময় হয়ে এসেছে। এই বছরও রোজা রাখতে পারেনি। আর পারবেও না। জানে রহমন, হাতে গোনা আর ক'টা দিন আছে তার। কষ্টের দিন। এ জীবনের শেষ কষ্টের ভাগ। মানুষের মধ্যে আর মাত্র ক'টা দিন। এ সব অন্ধকার হয়ে যাবে। মানুষ মানুষের সঙ্গে কতদিন থাকে? নাতনি ভিডিওতে যা দেখায় সব সত্যিই? এমন সব ঘটনা ঘটছে? মানুষ মানুষের কাছে এত অসহ্য হয়ে উঠছে? তার চাইতে মাটির মধ্যে শুয়ে যেতে চায় রহমন। মাটির নীচে কত চেনা মানুষ, কত চেনা মানুষের উড়ন্ত ছাই বাতাসে….,তারাও কি অসহ্য একে অন্যের কাছে আজ? বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে না রহমনের। শীত ঘন হয়ে আসে। শরীরে সর্বত্র ব্যথা শুরু হয়। ঘরে ফেরা পাখির দল দিনের আলোকে বিদায় জানায় কাকলিতে। তারা ডাকতে ডাকতে ঘরে ফেরে। দূরে মসজিদ থেকে আজানের সুর আসে। শাঁখের আওয়াজ আসে এদিক ওদিক থেকে। রহমনের দুই চোখের কোল বেয়ে জল গড়ায়। মাটিতে মেশে। বাতাস সিক্ত হয়। এক সময় খোলা চোখে মণি স্থির হয় রহমনের। তার বুকের উপর এসে বসে একটা দোয়েল। ক্রমে দুটো। তিনটে। আরো অনেক অনেক।