Skip to main content

 

চক্কোত্তিমশায় হাতে গুণে বলতে পারেন সারাটা জীবন কত শ্রাদ্ধশান্তিতে গীতা পাঠ করেছেন। সে নাকি দেড়হাজার একশো চব্বিশ। যদিও পরিবারের লোকেদের সে কথা বিশ্বাস হয় না। স্ত্রী বলেন আরো বেশি। ছেলেরা বলে আরো বেশিও হতে পারে, কমও হতে পারে। বন্ধুবান্ধব পাড়াপড়শিরা বলে, ঢপ!

যা হোক। কিন্তু এই সত্তর ছুঁইছুঁই মানুষটা আজীবন এই কাজই যে করে গেছেন এই নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। তো হল কী, তিনি এত এত মানুষ একসঙ্গে গীতাপাঠ করছে টিভিতে দেখে কিছুটা ঘাবড়ে গেছেন। তিনি আজীবন গীতা পড়েছেন বটে কিন্তু সংস্কৃত আর কতটা বোঝেন? ক্লাস এইট অবধি পড়াশোনা। এ গ্রামের জন্যে তখনকার দিনে সেই ঢের ছিল।

শীতের দুপুর। ঠাণ্ডা ভালোই পড়েছে। চক্কোত্তিমশায় বাড়ির বাইরে রোদে একটা খাটিয়ায় শুয়ে শুয়ে মনে মনে গীতার কয়েকটা শ্লোক আওড়াচ্ছেন। কতটা মনে আছে দেখার জন্য। মনে আছে তো অনেকটাই। কী মনে হল, হঠাৎ উঠে বসলেন। বাড়ির ভিতরে গিয়ে গীতাটা নিয়ে এলেন। এসে রোদে পিঠ দিয়ে জোরে জোরে পড়তে শুরু করলেন। এই প্রথম শ্রাদ্ধশান্তি ছাড়াই গীতা পাঠ করছেন। শব্দের মানে বুঝছেন না এখনও, কিন্তু যেন বুঝছেন মূল কথাটা।

চক্কোত্তিমশায়ের গীতাপাঠ শুনে এদিক ওদিক থেকে বেশ কয়েকজন জড়ো হয়ে গেল। তারা খাটিয়ার চারপাশ ঘিরে বসে হাত জোড় করে শুনতে লাগল। শীতের রোদে কৃষ্ণ এসে দাঁড়িয়েছেন ওই বটগাছের পাশে। রাখালদের গরু চরানো দেখছেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। এরকম কত ছবি এর ওর মনে ভেসে আসতে লাগল। কেউ কোনো প্রশ্ন করছে না। তর্কের কথা তো উঠছেই না। শুধু চক্কোত্তিমশায়ের গলার আওয়াজ ভেসে যাচ্ছে চারদিকে। চক্কোত্তিমশায়ের গিন্নি এতগুলো মানুষ দেখে চায়ের জল চাপালেন। নাতনিকে দিয়ে খবর পাঠালেন কেউ যেন চা না খেয়ে বাড়ি চলে না যায়। যদিও চিনি বাড়ন্ত, তবু পুজোর বাতাসা দিয়ে চলে যাবে।

চক্কোত্তিমশায় একাদশ অধ্যায়ে এসে দাঁড়ালেন। থামলেন। জল খেলেন। বললেন, এই হল অর্জুনরে বিশ্বরূপ দেখানোর অধ্যায়। অর্জুন ভয় পেলেন। টিভিতে দেখেছেন না?

অনেকেই মাথা নাড়ল। অনেকে ঝিমিয়ে গিয়েছিল। ভাতঘুমে ধরেছিল। বিশ্বরূপের কথায় কেটে গেল। চক্কোত্তিমশায় একবার ঘরের ভেতরে গিয়ে আবার এলেন। আবার পড়া শুরু করতে যাবেন, হঠাৎ একজন এসে দাঁড়ালো, দূরে গাছতলায় বাইক রাখা। গায়ে অশৌচের বেশ। হাতজোড় করে বলল, রবিবার আমার বাবার কাজ, আমি এত ভালো পাঠ শুনিনি। আমার বাড়ি কিছুটা দূরে। আপনি যাবেন? আমি গাড়ি পাঠিয়ে দেব।

সবাই তাকিয়ে আছে আগন্তুকের দিকে। চক্কোত্তিমশায় কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন তার মুখের দিকে। তারপর বললেন, না বাবা, আজকাল আমি আর ওসব কাজে যাই না। আগে করেছি অনেক। কতজন পরলোকে গিয়ে আমার এই ত্রুটিপূর্ণ গীতাপাঠ শুনে শান্তি পেয়েছেন না শাস্তি পেয়েছেন জানি না ভাই। আর ওসব করব না। আমার কাছে অক্ষর মানে ছবি। শ্রীগোবিন্দ মানে আমার রাখাল ঠাকুর। আমি তাঁর নির্বোধ গাভী। আমায় ক্ষমা করবেন।

এই বলে তাকে হাতজোড় করে তাকে ফেরালেন চক্কোত্তিবাবু। গীতাপাঠ শেষ করলেন। সবাই বাড়ি ফিরল চা খেয়ে। চক্কোত্তিমশায়ের মনে কোনো শান্তি নেই। এত এত মানুষের শেষগতিতে তিনি কী পড়লেন তবে? তার কী প্রায়শ্চিত্ত করা দরকার? কিন্তু কে বিধান দেবে? গ্রামের কয়েকজন মুরুব্বিগোছের মানুষকে জিজ্ঞাসা করলেন। কেউ-ই কিছু বলতে পারে না। সবাই উলটে সান্ত্বনা দেয়। সবাই বলে যা করেছেন ঠিক করেছেন। কিন্তু এগুলো শুনলে আরো ভয় করে। তাই কী?

একদিন চক্কোত্তিমশায়ের অবস্থা দেখে আর থাকতে না পেরে ওঁর গিন্নি বললেন, হ্যাঁ গো, এমন মন মরা হয়ে থাকো রাতদিন, খাও না, ঘুমাও না, কথা বলো না ঠিক করে…..তোমার মনের সংশয় তুমি ঠাকুরকে জানাও না কেন….আমার যখন কিছু দ্বন্দ্ব হয়….আমি ঠাকুরঘরে মালা নিয়ে বসি…..উত্তর পেয়ে যাই….মনের মধ্যেই ওঠে। তুমি পাও না কেন?

তবে কী আমার সে বিশ্বাস নেই? আহত মনে বললেন, তুমিই তবে জিজ্ঞাসা করে দেখবে, আমার কী উপায়? আমায় ছুঁয়ে বলো, মিথ্যা বলবে না। যা উত্তর পাবে, তাই বলবে।

গিন্নি বললেন, বেশ। তোমায় ছুঁয়েই বললাম। সত্যিটাই বলব। স্নান করে আজ যখন মালা করতে বসব। জেনে আসব।

চক্কোত্তিমশায় সকাল থেকে কিছু দাঁতে কাটলেন না। গিন্নি স্নানে গিয়ে মালা নিয়ে ঠাকুরঘরে গিয়ে দোর দিলেন। চক্কোত্তিমশায় মাটির দালানে বসলেন সদর দরজার দিকে তাকিয়ে। সদর দরজার সামনে মাটির রাস্তা। পাশে কিছুটা ফাঁকা জমি। এ রাস্তা গিয়ে মিশেছে শহরে যাওয়ার রাস্তায়। এই গ্রামেই জন্ম চক্কোত্তির। বাবা মা ঠাকুমা ঠাকুর্দা সব এই গ্রামের শ্মশানপথেই স্বর্গে গেছেন। কিন্তু তিনি এ কী করলেন? কত মানুষের শেষ যাত্রাটায় বিঘ্ন ঘটালেন। আজকাল স্বপ্নেও তারা আসে। মুখ ভার করে অভিমান করে।

দরজা খোলার আওয়াজ হল। গিন্নি গম্ভীর মুখে বেরোলেন। বললেন, যাও তোমার গীতাটা নিয়ে আসো দেখি।

চক্কোত্তিমশায় দৌড়ে গীতাটা আনলেন। এনে গিন্নির হাতে দিতে হাতটা থরথর করে কাঁপছে। গিন্নি বললেন, আমাকে দিতে হবে না…একশো ছিয়াত্তর পাতাটা বার করো।

চক্কোত্তি কাঁপা কাঁপা হাতে প্রায় তিনবার পাতাটা খুঁজলেন। পেলেন না। গিন্নি দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার কি মাথা চোখ দুই খারাপ হল গো…. পাচ্ছি না যে……

গিন্নি বললেন, পাবেও না। তোমার গীতায় ও পাতাটা ছাপাই হয়নি। গোবিন্দ বললেন, ওই পাতাটা টুকে নিতে কারোর গীতা থেকে। যাও। এখনই যাও।

চক্কোত্তি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেলেন। চাটগেঁয়ে পাড়ায় হারাধনের বাড়ি চললেন। তার বাড়ি নিত্য গীতাপাঠ হয়। তাড়াহুড়োতে খালি পায়েই বেরিয়ে গেলেন।

গিন্নি বসলেন দাওয়ায়। বড় ছেলের বউ পাশে এসে বসল। শাশুড়ির হাতটা ধরে বলল, বাবু পাতাটা ছিঁড়ে নেওয়া ইস্তক আমার মনে কী পাপবোধ ছিল গো মা। কিন্তু উনি যা গোঁয়ার, এই গীতাটা ছাড়া তো পড়বেনই না। আমার খালি ভয় হত কবে ওর চোখে পড়ে….আর নাতি হলেই বা .. কী যে করে বসেন……

শাশুড়ি বললেন, এ গীতা আমার শ্বশুরমশায়ের বৌমা…. ও কী ছাড়া যায়…. বাবু যা ছেলেবেলায় করেছে… সে ছেলেমানুষী…. ওর কি বিচার হয়?

চক্কোত্তি ফিরলেন। মুখে হাসি। বললেন, জানো গিন্নি এ পাতার শ্লোকে লেখা আছে যে কাউকে উদ্বেগ দেয় না, আর কারোর প্ররোচনায় উত্তেজিতেও হয়ে যান না তিনিই আমার আসল ভক্ত। আহা কী কথা গিন্নি! আমি কি কাউকে উদ্বেগ দিই?

গিন্নি মনে মনে হাসলেন। বললেন, যাও নেয়ে এসো…..

চক্কোত্তি লজ্জা লজ্জা মুখে বললেন, হারাধন কী বললে জানো…..তোমার গীতাপাঠ কী অপূর্ব চক্কোত্তি। শুনলাম তুমি আর শ্রাদ্ধশান্তিতে গীতা পড়ছ না। তা আমার বাড়ির গোপালকে গীতা শোনানোর ভারটা নাও। মাসোহারাও হল আবার তোমার গীতাপাঠ শোনার সৌভাগ্যও আমার হল। আমি বললাম, আমি যে ব্যাখ্যা জানি না। হারাধন বলল, গোপালের ব্যাখ্যা লাগবে না চক্কোত্তি….ওই ব্যাখ্যা করতে গিয়েই তো সহজ কথাটা জটিল করে পণ্ডিত….তুমি আর যাই হও পণ্ডিত তো নও…সেই স্বস্তির…. কী বলো গিন্নি, যাই?

গিন্নি কত্তার মুখের দিকে সস্নেহে তাকিয়ে বললেন, আগে স্নান করে মুখে কিছু দাও, তারপর বলছি।