Skip to main content

 

মাথাটা ভার। চোখটা খুলতে ইচ্ছা করছে না। রোদটা বিচ্ছিরিভাবে চোখের উপর পড়ছে।

চোখের পাতাটা খুলতেই দুটো কালো পায়ের পাতা সামনে। লাল নেলপালিশ আঙুলগুলোতে। তার কী মনে হল, ডান পায়ের কড়ে আঙুলটা তার বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে ছুঁলো।

মেয়েটা বলল, অ্যাই ঘাটের মড়া।

সে মাথা তুলে তাকাল, আবছা আকাশ, ঝাপসা মুখ। সে বলল, তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?

মেয়েটা বলল তুই মাল খেয়ে পড়ে আছিস কেন? বাড়ি ঘর নেই?

লোকটা লজ্জা লজ্জা মুখ করে তাকালো। বলল তুমি বুঝলে কী করে আমি মাল খেয়েছি?

মেয়েটা বলল রাস্তার কুকুরগুলো অবধি জানে।

লোকটা বলল, ঠিক বলেছ। আমি মাল খাই। এখানেই পড়ে থাকি। ঘর আছে। ওই অবধি যেতে পারি না।

মেয়েটা বলল, বাস আসবে। সরে শো। চাপা খাবি।

লোকটা আবার মাথা তুলে তাকালো। ঝাপসা আকাশ। ঝাপসা মুখ। কিন্তু সূর্যের আলোটা ভালো। বড় ভালো।

লোকটা ঘুমিয়ে পড়ল। সরে শো…..সরে শো….

=======

মেয়েটা বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে। লোকটা বসে পাঁচিলে ঠেস দিয়ে। বলল, আমায় চিনতে পেরেছ?

মেয়েটা মুখ বেঁকিয়ে বলল, আজ গিলিস নি?

লোকটা হাসল। বলল, কোথাও কাজে যাও?

মেয়েটা বলল, দশ বাড়ি। জেনে কী হবে?

========

সেদিন আবার মদ খেল। খাবে না ভেবেছিল। পারলো না। তবে নিজেকে নিয়ে মাঠের একটা কোণায় গিয়ে পড়ল। মেয়েটা যেন না দেখুক।

রোদ এসে পড়ল সকালে। চোখ খুলল। দুটো কুকুর পাশে শুয়ে। মেয়েটা বলেছিল কুকুরগুলোও জানে। আবার চোখ বন্ধ করল।

খানিকবাদে উঠল। বাস স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়ালো। পা টলছে। মেয়েটা উঠে গেছে?

=======

পরেরদিন মেয়েটা এলো না। পরপর কদিন এলো না। লোকটার এর মধ্যে রক্তবমি শুরু হল। হাসপাতালে ভর্তি হল। ভীষণ রুগ্ন হয়ে ফিরে এলো। আগে ইটভাটায় কাজ করত। এখন শরীর দেয় না। ভিক্ষায় বসল। স্টেশনে। একদিন মেয়েটা তার পাশ দিয়ে গেল। তাকে চিনতে পারল না।

এরপর মেয়েটা রোজ তার পাশ দিয়ে যায়। তার দিকে তাকায় না। ভিক্ষা দেয় না।

লোকটা একদিন ডাকল। সে বলল, চিনতে পেরেছ আমাকে?

মেয়েটা বলল, প্রথম দিন থেকেই চিনেছি। ভিক্ষা করছ। ভালো। মদটা গিলো না। তোমায় ভিক্ষা দেওয়ার মত টাকা আমার নেই। চেও না।

=========

সেদিন গুমোট গরম। একটা বড় পাখার তলায় স্টেশনে শুয়ে আছে সে। দুপুর। খাওয়া হয়নি। ইচ্ছা করছে না।

মেয়েটা এসে বসল। কিছুটা দূরে।

দুপুরে খেয়েছ? সে উঠে জিজ্ঞাসা করল।

মেয়েটা বলল, না। তুমি?

না। বমি হয়ে যায় খেলেই।

মেয়েটা বলল, ডাক্তার কী বলে?

মরবে তাড়াতাড়ি। দেরি নেই।

মেয়েটা তাকালো। সোজাসুজি।

সে চোখ নামিয়ে বলল, তুমি খাওনি কেন?

মেয়েটা বলল, আমার মেয়েটা ফেল করেছে পরীক্ষায়। আজ উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোলো।

সে বলল, অ।

========

মা মেয়ে দুজনকে দেখল মাস ছয় পর।

মেয়েটা বলল, ওকেও কাজে নামিয়ে দিলাম।

মায়ের কথা শুনে মেয়েটা চোখ নামালো।

সে ভাবল জিজ্ঞাসা, তোমার এত অল্প বয়সে এত

বড় মেয়ে। সে কি ভুল মানুষ ছিল?

মা মেয়ে চলে গেল।

========

বছর গেল। সে মরল না। একদিন দেখল মেয়েটার মেয়েটা একটা ছেলেকে নিয়ে দৌড়ে ট্রেন ধরল। মেয়েটার কী সাজ! ছেলেটা ভালো না। এমনই মনে হল তার।

একদিন মা কাজে যাচ্ছে। সে ভাবল বলে, ডেকে বলে, মেয়েকে সামলাও।

বলল না।

একদিন দুপুরে। ভ্যাপসা গরমের পর সেদিন বৃষ্টি সারাটা দিন। মা এসে বসল তার থেকে কিছুটা দূরে। বলল, মেয়েটা পালিয়ে গেছে।

সে বলল, জানি।

মা চমকে তাকালো। বলল না কিছু। সেও চোখ নামিয়ে নিল।

======

মায়ের যাতায়াত অনিয়মিত হল। শরীর ভাঙল। একদিন সে জিজ্ঞাসা করল, কে আগে মরবে, তুমি, না আমি?

সে বলল, খাবে? আমি ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু মনে হয় ভুল করেছি। খাবে? যে আগে যায় যাব। চলো, সব ভুলে যাবে, অন্তত কিছুক্ষণ। খাবে?

মা অনেকক্ষণ সদ্য ট্রেন চলে যাওয়া শূন্য প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলল, মেয়েটাকে নাকি বিক্রি করে দিয়েছে। মুম্বাইতে। যাবে? যদি খুঁজে পাই।

সে বলল, যদি তার আগে রাস্তায় মরে যাই? পৌঁছাতে না পারি?

মা বলল, মরেই তো আছো।

সে ভাবল একবার বলে, তোমায় দেখার আগে অবধি মরেই ছিলাম। আজ নেই। কিন্তু বলতে পারল না।

বলল, চলো।