Skip to main content

 

শীতের হাওয়া ভালো না। শাড়িটা গায়ে যতটা জড়ানো সম্ভব ততটাই শক্ত করে জড়িয়ে। শীতের হাওয়ায় তার হাঁফ ধরে।

দিনের মধ্যবেলা। রাস্তায় মানুষ কমে এসেছে। সে বাজারের মধ্যে হেঁটে চলেছে। বাজারে ভিড় ততটা কম নয়। সকাল থেকে খাওয়া হয়নি আজ। বাড়ি গেলেও হয়, কিন্তু না গেলেও কেউ অপেক্ষা করবে না। সে তো পাগল! তার নিজের ভাষায় "রাবিশ"। সে মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখে কোনো একটা ভারী লোহার যন্ত্রের চাপে পিষে যাচ্ছে তার শরীর। সে মুক্তি পাচ্ছে। সব লাঞ্ছনা, গ্লানি থেকে সেই চরম মুক্তি।

তার বয়েস পঞ্চাশ পেরিয়ে আটকে আছে। কেউ হিসাব রাখেনি। তার নিজের হিসাব রাখার অবস্থা নেই।

একদিন তাকে দয়াপরবশ হয়ে কেউ কফি খাইয়েছিল। সে নিজেই চেয়েছিল যদিও। ভিক্ষা না। আবদার। মানুষে মানুষে আবদার চলে না? তারা কফি দিল কাঁচের কাপে। উফ! সে কী বিড়ম্বনা। কফি শেষ তো হল, কিন্তু কাপটা? সে নিজে তো রাবিশ। এই রাবিশ কাপটা ভেঙে চুরমার করে দেবে? জিজ্ঞাসা করেছিল। তারা বলেছিল, কিছু হবে না। কেন হবে না সেটা সে বুঝতে পারেনি যদিও।

এই বাজারের রাস্তা দিয়েই সে একদিন বউ হয়ে এসেছিল। রাণাঘাট থেকে কাঁচরাপাড়া বেশিদূর না। কিন্তু বাপের বাড়ি থেকে বেরোনোর যত কারণ ছিল ফেরার কারণ তেমন ছিল না। ফেরেওনি। তারপর দিনে দিনে বুঝল তার স্বামীর জীবনে সে একা নয়। আরেকজন আছে। স্বামী অস্বীকার করল না। বরং বলল, এতে তার খাওয়াপরাতে কোনো সমস্যা হবে না। সে জানত হবে না। যেখানে অসুবিধা হবে সেখানে তার স্বামী কোনোদিন আসেইনি। সেখানে সে একা। একা। একা।

“দিদি চিনতে পারছেন?”

হ্যাঁ ভাই চিনি তো। তুমি রিনাদির মেয়ে তো?

“না গো। আমার বাবার দোকানে তুমি যেতে। শাড়ি ইস্ত্রি করাতে।”

সঙ্গে সঙ্গে নিজের শাড়ির দিকে তাকালো। তাই তো। কতদিন কাচা হয় না? ছি ছি।

মেয়েটাকে অবাক করে সে আচমকাই উল্টোদিকে হাঁটতে শুরু করল। একটা গলিতে ঢুকে একটা ভাঙা দোকানের মধ্যে ঢুকল। ভেতরে জঙ্গল হয়ে আছে। সে শাড়িটা খুলে বসল। মেলল। কিন্তু এদিকে রোদ কোথায়? সায়া ব্লাউজ পরে সে উবু হয়ে ঝোপের মধ্যে নিজেকে আড়াল করে। কয়েকটা কুকুর ডেকেই যাচ্ছে বাইরে থেকে। কেউ বলল, ওই মল্লিক বাড়ির পাগলীটা নাকি রে?

যে বলল, তাকে সে চেনে। তার দর্জির দোকান।

পাশের দোকান থেকে বলল, কী মানুষ কী হয়ে গেল….যা হারামি বর শালা….ওকে ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে মারতে হত!

মরলও তো ওইভাবে….যা পাপ করেছে আজীবন…..শালা এক নম্বরের মাগীবাজ…..

সে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার বরের মাথাটা কাটা। লাইনের ডানদিকে গড়িয়ে গেছে কিছুটা। বাঁদিকে ধড়টা। সেই জামাটা পরে যেটায় বোতাম লাগিয়েছে সে, বহুবার। সেই প্যান্টটা পরে যে প্যাণ্টের পেছনের পকেটে রাখা ওয়ালেট থেকে টাকা বার করেছে সে বহুবার। ছেঁড়া ব্লাউজ শাড়ি সেলাই করতে দেবে বলে। মদ খেয়ে বাড়ি ফিরত। কথা বলবে কখন? আর সে নিজে তখন ঘুমের ওষুধ খায়। বেলা হত উঠতে। উঠে দেখত সে নেই। ঘরে শুধু মদের গন্ধ ম ম করছে। তার ভালো লাগত।

তার মনে থাকে না কেন ও নেই আর? এখনও কেন মনে হয় সব অভিমান, অভিযোগ শুনবে সে একদিন বসে? কেন মনে হয় সে আছে বলেই সে বেঁচে আছে? কেন ভুলে যায় বারবার, থাকা, না থাকা সব গুলিয়ে যায়? সত্যিই কি সে পাগল? নাকি মনে, বুদ্ধিতে সহায়সম্বলহীন সে? কেউ সঙ্গে নেই তার। সে নিজেও নেই।

আজ প্রথম সে সেই চেনা ভাঙা দোকানের ঝোপজঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলো শুধুমাত্র সায়া ব্লাউজ পরে। কারোর দিকে তাকালো না। স্টেশানের দিকে রুদ্ধশ্বাসে হাঁটছে সে। তখন সন্ধ্যের ভরা বাজার। কৌতুহল, করুণা, উপেক্ষা, উদাসীনতা সব এড়িয়ে যখন সে স্টেশানে পৌঁছালো তখন আপে মালগাড়ি আসছে হর্ণ দিতে দিতে। তার লাইনে এসে দাঁড়ানোর সময় আর গাড়ির শত শত চাকা গড়িয়ে যাওয়ার সময়ে এমন কিছু ফারাক হল না।

বহু যত্নে মেলা শাড়িটা তার অপেক্ষায় অমনভাবেই পড়ে থাকল তিনদিন সেই ভাঙা দোকানের ঝোপে। একদিন একটা রুগ্ন কুকুর মুখে করে টান দিল সে শাড়িতে। তার বাচ্চা হয়েছে সদ্য পাঁচটা। এত ঠাণ্ডায় সেগুলোকে নিয়ে সে যায় কোথায়? শাড়িটা জড়ো করে বসল ভাঙা দোকানের এক কোণায়। বাচ্চাগুলো বসল তাকে ঘিরে। দর্জি বলল, দেখো কতগুলো বাঁচে.... শীতের হাওয়া ভালো না।