একটা সময় ছিল যখন রাজনীতি নিয়ে কথা তর্ক রাজনীতি নিয়েই হত। এখন সে সময় নয়। এখন ধর্ম, সামাজিক রীতিনীতি, প্রথা, সংস্কৃতি এ সব কিছুর মোড়কে রাজনীতি ঢুকে পড়েছে। আমি আর আমার সম্প্রদায়। তুমি ও তোমার সম্প্রদায়। কথায় কথায় বিদ্বেষের চাষ। এ সময়টা আমরা প্রত্যক্ষ করিনি আগে এত বৃহৎ পরিসরে।
এটা ভালো না মন্দ? এ প্রশ্ন অবান্তর। এটা বাস্তব। এটা ঘটছে। আমি নিরামিষ আমিষ, মন্দির মসজিদ নিয়ে মাথা ঘামাব কী ঘামাব না সেটা আলোচ্য নয়। কথা হচ্ছে এগুলো নিয়ে ঝগড়া কোন্দল তর্ক বিতর্ক আলোচনা ইত্যাদির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েই যাচ্ছে। এটা বাস্তব। স্বামী বিবেকানন্দ বলছেন, আমাদের ধর্ম রান্নাঘরে সেঁধিয়েছে। যে জাত ডান হাতে জল খাবে কী বাম হাতে জল খাবে ভেবে মাথা ঘামায় তার কাছে আর কী আশা করা যায়?
স্বামীজি ধর্মকে মানুষের ধর্ম দেখতে চেয়েছিলেন। সম্প্রদায়ের কিছু আচার বিচারকে কায়েম করে যেতে জীবনপাত করেননি। হৃদয়ের প্রসার উন্নতির লক্ষণ, সংকোচন পতনের লক্ষণ। এ ছিল স্বামী বিবেকানন্দের অনুভব। বাণী। জল তেষ্টা পেলে কেউ জল ঘুলিয়ে দিয়ে খায় না, যতটা জল স্বচ্ছ সেটুকুই আঁজলা ভরে পান করে। এ ছিল ঠাকুরের বাণী। বাণী বিদ্বেষের কথা বলে না। ত্যাগের কথা বলে। স্বামীজির মূল কথাটা ছিল ত্যাগ। নিষ্ঠা। এগুলোর অভাবে কী হয় সদ্য ঘটে যাওয়া অযোধ্যার রামমন্দিরের ঘটনায় দেখতে পাচ্ছি। এমন আড়ম্বরে, এমন বিপুল অর্থ, পরিশ্রম ইত্যাদির মাধ্যমে যা গড়ে তোলা হল আজ তাকেই কলুষিত করছে কিছু মানুষের লোভ। এত এত মানুষের, বলা ভালো ভক্তের অনুদান যা তারা বিশ্বাস করে তাদের আরাধ্য দেবতার পায়ে দিয়ে এসেছিল তাকে শোষণ করতেও তাদের বিবেকে বাধল না। আজ দৈনিকের প্রথম পাতা জুড়ে নিত্য তারই চর্চা। এটা লজ্জার।
স্বামীজির ছিল “ম্যান মেকিং মিশন”, সম্প্রদায় মেকিং মিশন না। স্বামীজির উচ্চাকাঙ্খা ছিল মায়াবতীর অদ্বৈত আশ্রম নিয়ে। সেখানে এমনকি শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ছবি পর্যন্ত রাখতে নিষেধ করেছিলেন। সব ধরাছোঁয়ার ঊর্ধ্বে এক সাধন পদ্ধতি চেয়েছিলেন। পরে ঠাকুরের ছবি এসেছিল সেটা অন্য কথা। কিন্তু চেয়েছিলেন কী? সেটাই আসল। মানুষের কাজের মাহাত্ম্য নির্ভর করে তার উদ্দেশ্য আর উপায়ের সততার উপর। এর একটার অবমাননা সবটাকে ব্যর্থ করে।
মানুষের শ্রেষ্ঠধর্ম তার মানবিকতা। হিউম্যানিটি। মানবধর্ম। রাজনীতি, সমাজনীতি, সাম্প্রদায়িক আচারবিচার বিশ্বাস, বিজ্ঞান, বিনোদন প্রভৃতি যা কিছুই মানুষের মানবিকবোধকে ছাপিয়ে বাড়তে থাকে তাই বিকার হয়ে দাঁড়ায়। মানুষের শেষ আশ্রয় মানুষ। মানুষের অন্তিম ভরসা মানুষ। “যার কেউ নেই তার ভগবান আছেন” বলা মানুষটাও ভগবানকে মানুষের ভালোবাসার মধ্যে পাবে বলে দরজা খুলে হাপিত্যেশ করে বসে থাকে।
সুস্থ সমাজে সব চর্চাই অবশেষে মনুষ্যত্ববোধের চর্চা। সব সাধনাই অবশেষে তাই। জ্ঞান যেন বিবেকহীন না হয়। সম্প্রদায় যেন সাম্প্রদায়িকতায় কেবল শেষ না হয়। মনুষ্যত্বের মধ্যে দিয়ে নতুন ভারতে জাগুক। অতীতের যা কিছু ভালো আসুক। বর্তমানের যা কিছু ভালো আসুক। ভারতের এই মাটিতে রবীন্দ্রনাথ, স্বামীজি, রামমোহন, লালন, বিদ্যাসাগর মনুষ্যত্ব সাধনের যে বীজ দেখতে পেয়েছিলেন, যাকে বিশ্বমানবের সম্পদ বলে প্রচার করেছিলেন, সে মনুষ্যত্বের সাধন সত্য চেতনা আর আনন্দের জয়গানে। অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে যাওয়ার প্রার্থনায়। অসত্য থেকে সত্যে নিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়। সেখানে ক্ষুদ্রস্বার্থ, সংকীর্ণতার বিদ্বেষ বিষ নেই সর্বোপরি লোভের কোনো স্থান নেই সেখানে। লোভ যেখানে নেই সেখানে ভয় নেই, বিদ্বেষ নেই। সেখানে শ্রীরামের আসল তহবিল। সেখানে কোনো লোভীর লোলুপ দৃষ্টি পৌঁছায় না। তুলসীদাস লিখেছিলেন যার হৃদয়ে লোভ, ক্ষোভ কপটতা নেই, হে রাম, তুমি সেই হৃদয়ের অধিবাসী। ভারত সেই সত্যে আবার জাগুক। সত্যে, প্রেমে, করুণায়।