পুঁটে জেল আর বাড়ি সামাল দিতে দিতে হয়রান। আইনে যে এত নিয়ম কে বানাল, কেনই বা সে সবের এদিক ওদিক হলে জেলে পাঠানো হয়, এ পুঁটের বোধগম্যির বাইরে। বলি সব আইন মুখস্থ করে একজন মানুষ বাঁচতে পারে?
যা হোক দিন পনেরো হল পুঁটে বাইরে বেরিয়েছে। বেরিয়েই দেশে এতবড় একটা কাণ্ড হচ্ছে সে কথা জানতে পেরেছে। মহাকুম্ভ।
পুঁটের গুরুদেব পুঁটেকে একদিন অর্ধবাহ্য দশায় দীক্ষা দিয়েছিল। শ্মশানে। অনেক রাত। বৃষ্টি পড়ছিল। পুঁটে কয়েকজন বন্ধু নিয়ে শ্মশানের পাশে গঙ্গার ধারে বসে পানরত ছিল। এমন সময়, “জয় তারা” হুঙ্কারে একজন এসে দাঁড়াল। জিজ্ঞাসা করল, কী পান করছিস বাচ্চারা….দে প্রসাদ করে দিই…..
সবাই এ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রথমে ঠিক করতে পারল না দেবে কী দেবে না। তারপর পুঁটেই বলল, দে ভাই, যদি বলি দিয়ে দেয়…..যা অবস্থা আমাদের আমরা বুঝতেও পারব না…..ওই অবস্থায় বাড়ি গিয়ে হাজির হলে কী ভাববে সবাই…..
ততক্ষণে অবশ্য পুঁটের হবু গুরু কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা না করেই কয়েক ঢোক গিলে ফেলেছে। তারপর যখন সবারই বাহ্যজ্ঞান প্রায় শূন্য….তখন বাবাজী হঠাৎ বলল, আয় তোদের মায়ের পায়ে দিয়ে দিই…..দীক্ষাটা দিয়ে দিই…..
পুঁটে আর তার চার বন্ধুর দীক্ষা হয়ে গেল। কী মন্ত্রে দীক্ষা হল সে গুরু শিষ্য কারোরই অবিশ্যি পরে মনে ছিল না। কিন্তু একটা ঘটনায় পুঁটের প্রবল বিশ্বাস জন্মাল গুরুর উপর। সেদিন রাতেই বানের জলে তার তিন বন্ধু ভেসে যায়, কিন্তু সে আর গুরুদেব বেঁচে যায়। ব্যস, সেই থেকে পুঁটে জেল থেকে বেরিয়ে, জেলে যাওয়ার আগে গুরু দর্শন করবেই।
যা হোক, পুঁটে এসেছে গুরু দর্শন করতে। গুরু পুঁটেকে দেখেই বলল, তা আজই জেলে যাচ্ছিস বুঝি…..
পুঁটে বলল, না বাবা, সঙ্গমে ডুব দিতে যাচ্ছি…..
পুঁটের গুরু এক হাত জিভ কেটে বলল, ছি ছি, ওইতেই তো ডুবে আছিস রে….সে আবার বাড়ি বয়ে ঘটা করে বলতে এসেছিস কেন রে শালা……
পুঁটে অপ্রস্তুত হয়ে বলল, আরে না না গুরুদেব…..ওই সঙ্গম না….ছি ছি….আমি প্রয়াগরাজ যাচ্ছি….কুম্ভে…..থুড়ি…মহাকুম্ভে…
গুরুদেব চিন্তিত হয়ে পড়ল। বলল, কিন্তু পুঁটে, তুই তো আবার দু মাসের বেশি জেলের বাইরে থাকতে পারিস না…..ভিনদেশে জেলে ভরে দেয় যদি….মানে তোর মত সরল প্রাণ…ন্যায়-অন্যায় বুঝিস…..কিন্তু আইনকানুন তো কিছুই বুঝিস না…..হিন্দি বলতে পারিস না….ফাঁসি দিলে শেষ ইচ্ছাই বোঝাতে পারবি না…..
পুঁটে একটু চিন্তায় পড়ল। বলল, তবে কী করব? প্রাণ চাইছে যে….
গুরুদেব বলল, তবে যা….কিন্তু….আচ্ছা যা……
যদিও পুঁটের কুম্ভে যাওয়া হল না। কী হল তা বলি। ট্রেন বাস কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না দেখে পুঁটে ঠিক করল রম্ভাবৌদির বরের বাইকটা নিয়ে চলে যাবে। তার বর তো ছ'মাস বাইরে থাকে। জাহাজে কাজ করে। বাইকটা পড়েই থাকে। ঘুরে এসেই দিয়ে যাবে। একজন মেয়ের কাছ থেকে ওরকম সোজাসুজি তো চাওয়া যায় না। লজ্জা লাগে। তাই রাতে কায়দা করে গ্রীল কেটে বাইকটা নিয়ে বেরোলো। ভালোই যাচ্ছিল। আসানসোলে এসে আবার পুলিশ ধরল। সে যত বোঝায় সে ফিরে এসেই দিয়ে দেবে, কিন্তু কে কার কথা শোনে। অগত্যা জেল হল। জেলে যাওয়ার আগে পুলিশের অনেক হাতেপায়ে ধরে গুরুদেবকে একটা ফোন করার অনুমতি পেল। গুরুদেব ফোন ধরে সব শুনে বলল, যা হোক বাচ্চা….বাংলায় কথা বলতে পারবি….এর থেকে বেশি কী চাই….ফিরে আসিস….
শিষ্য কাঁদকাঁদ গলায় বলল, আপনার জন্য একটু কুম্ভের জল আনব ভেবেছিলাম……
গুরুদেব ধরা গলায় বলল, তুই ভেবেছিস…এতেই আমার কুম্ভস্নান হয়ে গেল…..ভালোবাসার চাইতে বড় ডিটারজেন্ট আর কী আছে রে…..ভালো থাকিস……
পুঁটে ছলছল চোখে বলল, আপনিও।