Skip to main content

 

 

সে সমুদ্রের ধারেই থাকে। ছোটো ঝুপড়ি তার। ঝড়ে ভাঙে। সে গড়ে। আবার ভাঙে। আবার গড়ে। তবু সে সমুদ্র ছেড়ে যায় না। কেন যায় না সে স্পষ্ট জানে না। কিন্তু যায় না।

সমুদ্রের ধারে মেলা বসেছে। কত লোক! সে আশ্চর্য হয়ে গেল। এত সামগ্রী, এত বিকিকিনি, এত কথা, এত উৎসব! সে মশগুল হয়ে মেলায় ঘোরে। সারাটা দিন ঘোরে। রাতে যখন মেলা ভাঙে, দোকানিরা ঝাঁপ ফেলে দোকানেই ঘুমায়, সে তখনও ঘোরে। সেও ঘুমিয়ে পড়ে কোনো কোণায়। মেলা চলল দশদিন। তারপর মেলা ভেঙে গেল। সে একা হল।

হ্যাঁ গো। সে একা হল। এই প্রথম তার একাকীত্বর যন্ত্রণা জাগলো। নিজেকে মনে হল বোকা! কী করেছে গোটা জীবন! হিসাব করে। হিসাবের শেষে ঘুরেফিরে শুধু শূন্যই আসে।

কদিন সে বিষণ্ণ হয়ে ঘরে পড়ে থাকল। সমুদ্রের গর্জন, যা তাকে পাগল করে দিত, তাকে টানল না। জ্যোৎস্নারাতে চাঁদের আলোয় দুধসাদা সমুদ্র তাকে মুগ্ধ করল না। এত বড় সমুদ্র, যা তাকে বিস্মিত করত, এখন শুধুই একঘেয়ে লাগে তার! সে শুধু ভাবে আবার কবে বসবে মেলা! আবার কবে হবে ভিড়! আবার কবে হবে বিকিকিনি!

বৃষ্টি হল তিনদিন টানা। সমুদ্র উত্তাল হল। বৃষ্টি থামল। সব শান্ত হল। সে ঝুপড়ির বাইরে এসে দাঁড়ালো। পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারদিক। সে সমুদ্রের তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা জায়গায় এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। মেলার একটা দোকানের মাথায় যে তিরপল দেওয়া ছিল, তার একটা ছেঁড়া টুকরো পড়ে; আর সে তিরপলে জমে জল। বৃষ্টির জল। সে জলে পড়েছে চাঁদের ছবি। সে দুটো হাঁটুতে ভর দিয়ে মাটিতে বসল। তিরপলের স্বচ্ছ জলে স্থির চাঁদের আলো। কী যেন নেই! ঢেউ নেই। দেখতে দেখতে দুটো কুকুর দৌড়াতে দৌড়াতে তিরপলে এসে পা দিল। জল গেল ছিটকে। চাঁদ হল ছিন্নভিন্ন। সে চমকে উঠল। তাড়া করতে গেল কুকুর দুটোকে, উঠতে গিয়ে বালিতে পা আটকে মুখ থুবড়ে পড়ল। তাকে ভিজিয়ে গেল সমুদ্রের এক বড় ঢেউ। তাকে নোনতা করে গেল। বালি বালি করে গেল। সে দেখল তার হাতের আঁজলায় জমা সমুদ্রের জল; আর চাঁদ। গোটা চাঁদ! সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। আঁজলা ভরা জল উছলালো না। চাঁদ টলমল করছে তার হাতে। সে ধীর পায়ে সমুদ্রে হাঁটু ডুবিয়ে দাঁড়ালো। জলশুদ্ধ চাঁদ সমুদ্রকে দিয়ে বলল, আমার মুঠোয় এসো না, ভুলিও না আর আমায়! আমায় ডুবিয়ে নাও, আবার আগের মত করে!

সমুদ্র এক বিশাল ঢেউয়ের আশীষে তাকে স্নান করিয়ে দিল।