১
আজ শ্রীরামকৃষ্ণের পুণ্য জন্মতিথি। সকালবেলা মাহেশ জগন্নাথ মন্দির দাঁড়িয়েছি। এক মধ্য বয়েসী ভদ্রলোক পাশে এসে দাঁড়ালেন। অবাঙালি। শ্রীজগন্নাথদেবের সামনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে যা বললেন তা কোনো স্তব না। কোনো শাস্ত্রে লেখা নেই। তিনি বলতে শুরু করলেন হিন্দিতে। যার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়, "প্রভু, তুমি তোমার সামর্থ্যের উপযুক্ত ব্যবহার করো প্রভু। তোমার দ্বারা কী না ঘটা সম্ভব প্রভু। সে সব ঘটাও। সবার কথা শোনো প্রভু। সবার কথা শোনো মালিক।" এই বলে তিনি প্রণাম করলেন মাথা ঠেকিয়ে।
ভগবান উত্তরে কী বলবেন সে সেই ভক্তই বলতে পারবেন। কিন্তু এমন গণতান্ত্রিক প্রার্থনা আমি কোনোদিন শুনিনি।
২
আরেকটা গপ্পো। মানে সত্যি গপ্পো।
দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে তো অনেকগুলো দিকে লাইন পড়ে। আমি মন্দিরের পেছনের দিকের লাইনে সিঁড়িতে দাঁড়িয়েছি। একজন বয়স্ক মহিলার গলা পেলাম। তিনি বলছেন, হ্যাঁ গো, এ কী লাইনে এনে দাঁড় করালে, রেলিং নেই, আমি উঠব কী করে?
তাকিয়ে দেখি এক মহিলা, হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছে, তিনি তাঁর স্বামীকে কথাটা বলছেন।
রোগা লম্বা বয়স্ক মানুষটা বেশ বিরক্তি নিয়ে বললেন, "উফ দেখছ না অন্য লাইনগুলোতে কী রোদ! এদিকেই যা ছায়া। তুমি রোদে দাঁড়াতে পারতে? আর রেলিং যে নেই সে তো আমিও দেখছি, তুমি আমার হাতটা ধরে আছ তাতে হচ্ছে না?"
মহিলা লজ্জা পেয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, হাঁটতে খুব কষ্ট হয়। তো ওনার হাতটা ধরেছি সে তো ঠিকই।
লজ্জা পেয়ে গেলেন বলতে গিয়ে। আমি বললাম, আসুন সামনের দিকে।
ওর স্বামী বললেন, আর একটুখানি তো লাগবে। উফ তুমি শান্ত হয়ে দাঁড়াও তো।
মহিলা দুই ধাপ উঠে আবার আমায় বললেন, আমার বোনের বর হাঁটু অপারেশন করেছিল। কিন্তু ভালো হয়নি। অতগুলো টাকা সব জলে গেল। আমি আর ভয়ে হাঁটু অপারেশনে গেলুম না।
ভদ্রলোক আবার বিরক্তির সুরে বললেন, আচ্ছা জ্বালা তো। আবার এত কথা বলার কী আছে? মন্দিরে এসেছ মাকে চিন্তা করো। তা না, কী সব আচিষ্টি-কুচিষ্ঠি কথা নিয়ে পড়ল।
ভদ্রমহিলা ধমক খেয়ে চুপ করে গেলেন। ভদ্রলোক ওর দিকে তাকিয়ে একটু নরম সুরে বললেন, মা যেমন রেখেছেন তেমনই তো থাকতে হবে।
কথাটা বড্ড অভিমানের সুরে বাজলো। মহিলা উদাস চোখে মন্দিরের চাতালে ঘুরে বেড়ানো পায়রাগুলো দেখতে দেখতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, সে তো নিশ্চয়ই।
এই সময়ে আমার মনে হয় বলি, আপনি বলুন। আপনার কথা শুনব বলেই তো মন্দিরে, চায়ের দোকানে, স্টেশনে, শ্মশানে কান পেতে থাকি। আমি তো পাথরের দেবীর বাণী শুনতে পাইনে। তুমিও যদি কথা না বলো তবে যাই কোথায়?
বাসে উঠেছি। এক জায়গায় বাস দাঁড়াতে অল্প বয়েসী একটা ছেলে আর মেয়ে উঠল। বয়েস একুশ বাইশ হবে। ছেলেটার গায়ে সবুজ টিশার্ট। কাঁধের জায়গাটা ফাটা। পায়ে প্রায় ক্ষয়ে যাওয়া হওয়াই চটি। মেয়েটার হাত ধরে দাঁড়িয়ে। বলল, তোকে তো উলা উবেরে নিয়ে যেতে পারব না। এই বাসেই ঘোরাই চল। বেলুড় মঠে আজ ঠাকুরের জন্মোৎসব। ফ্রিতে খিচুড়ি খাওয়াব, চ। ছেলেটার চোখ দুটো ভীষণ উজ্জল। রোগাটে শরীরে ওইটুকুই আদতে চোখে পড়ার মত।
মেয়েটা বড় বড় দুটো চোখ মেলে ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে। কী দেখছে সে ওই জানে। কিন্তু তার দেখায় এমন কিছু একটা আছে যা এই জিটি রোডের ধুলো ওড়া আঁকাবাকা রাস্তাতেও গীতগোবিন্দ মনে পড়ায়। মেয়েটা চোখের পাতা ফেলতেও যেন ভুলে গেছে।
একটু পর মেয়েটা বলল, সন্ধ্যের আগে বাড়ি ফিরব তো?
ছেলেটা বলল, ফিরবি। কিন্তু আর এই নিয়ে কথা বলিস না। বসবি?
মেয়েদের একটা সিট ফাঁকা হয়েছিল। মেয়েটা বলল, না। হাতটা আরো জোরে খামচে ধরে বলল, বোকা কোথাকার।
আমার মনে হল বাসটা একটা জোরে ঝাঁকুনি দিক। মেয়েটা যা বলতে চাইছে তা বলে ফেলুক। দোষ হোক না হয় খারাপ রাস্তার। খারাপ ড্রাইভারের।
৩
প্রসাদের খিচুড়ি ভর্তি থালা নিয়ে এসে বসলাম। আমার সামনে বসে একজন মহিলা, বয়েস ষাটের কাছাকাছি হবে। যেটায় চোখ আটকালো প্রথম, দেখি উনি দুটো খিচুড়ি ভর্তি থালা নিয়ে বসেছেন। একটা থেকে খাচ্ছেন, যেটা শেষের পথে, খানিকবাদে সেটা শেষ করে আরেকটা খাওয়া শুরু করলেন।
মন তো পাজির পা ঝাড়া। সেই মন বলল, যা বপু দেখেছিস, এ উনি খেতেই পারেন। হয় তো একটা খিচুড়িতে হয় না। আমি নিজের পাতের খিচুড়ি খেতে খেতে ওর খাওয়া দেখছি। উচিৎ নয়। তবু। ইতিমধ্যে আমার বন্ধুর সঙ্গে তার পাশে বসা একটা বারো তেরো বছরের ছেলে দারুণ গল্প জুড়ে দিয়েছে। তার গল্পের বিষয় হল একটা উদ্বেগ। কী, না, সে দেখে এসেছে গঙ্গার জল হুস হুস করে বেড়ে যাচ্ছে। যে কোনো মুহূর্তে এই বেলুড় মঠ ডুবে যাবে। তখন? তার কথা শুনে তার উল্টোদিকে বসা তার দিদিরা, যাদের সঙ্গে বাচ্চাটা এসেছে, তারা তো হেসেই খুন। লজ্জাও পাচ্ছে। আমার বন্ধুও তার উদ্বেগের সমর্থনে যাবতীয় সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির হিসাবে লেগেছে। উল্টোদিকের দুই খিচুড়ি ভদ্রমহিলাও শুনছেন আর হাসছেন। হাসিটা ভারি সুন্দর। বাড়ির আদুরে ঠাকুমার মত।
হঠাৎ আমার দিকে ফিরে মহিলা বললেন, "কী মুশকিলে পড়লাম বলুন তো। আমি আর উনি এসেছি। আমি দুটো প্লেট খুচড়ি নিয়ে ওঁকে আর খুঁজে পাচ্ছি না। কোথাও বসেছেন কে জানে। নিশ্চয় উনিও খিচুড়ি নিয়েছেন। এখন ঠাকুরের প্রসাদ, ফেলে দেওয়া যায় বলুন?"
আমি বললাম, ফোন করুন ওঁকে।
উনি খেতে খেতে বললেন, আরে সেও তো ওর কাছেই।
বললাম, আমার ফোন থেকে ফোন করুন। নাম্বার জানা আছে?
উনি খুব সুন্দর করে হাসলেন। বললেন, এই বরানগর থেকে আসছি। কাছেই। সঙ্গে টাকাও আছে। উনিও হারাবেন না, আমিও না। ঠিক চলে যেতে পারব। আমরা দুজনে প্রায়ই আসি।
উনি আবার খাওয়াও মগ্ন। কিন্তু এইবার আমার মনে দুশ্চিন্তা ঘনালো। স্বামী স্মৃতিশক্তি সংক্রান্ত কোনো সমস্যায় ভুগছেন না তো? উনিই বা এত নিশ্চিত কেন? কিন্তু ভদ্রমহিলার মুখের নিরুত্তাপ নিশ্চিত ভাব দেখে মনে হল হয় তো এমন কিছু আছে যা আমার বোধের বাইরে।
এর মধ্যে জয়ধ্বনি শুরু হল। ঠাকুর, মা, স্বামীজির পর বলা হল জয় গঙ্গামায়কী জয়। বাচ্চাটা আমার বন্ধুকে বলল, দেখলে গঙ্গার জয় দিল। কেন বলো তো? ওই জল বাড়ছে বলে।
ভদ্রমহিলা বললেন, কিচ্ছু হবে না ভাই!!
উঠলাম। এইবার বেরোবো। ভদ্রমহিলাকে বললাম, আসি তবে।
উনি আবার সেই প্রশান্ত হাসি হাসলেন। বললেন, এই দুই পাতের খিচুড়ি শেষ করে উঠব। এই এত খাওয়া যায় বলো?
শুধুই কি দুই পাতের খিচুড়ি? আর কী কী সহ্য করে এতটা রাস্তা এসে এমন প্রশান্তির অধিকারিণী হয়েছ সে তুমিই জানো। ছোট ছোট মোহগুলো ভাঙলে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়, অভিমানী হয়। আর বড় মোহটা ভাঙলে মানুষ এমন নিরুত্তাপ একা হয়। কার উপর অভিযোগ করবে সে! ওসব তো ছেলেমানুষী!