Skip to main content

 

তা হল কী, একদিন সকালে সুধাকান্ত বাজারে যাচ্ছে, মাঝপথে দেখে রমাকান্ত পুকুরধারে নগ্ন হয়ে বসে মাথা ধুয়েই যাচ্ছে, ধুয়েই যাচ্ছে। কাঁড়ি কাঁড়ি জল ঢালছে ঘাড়টা নীচু করে। সুধাকান্ত থমকে গিয়ে বলল, মাথাটা কী পুরোটাই গেল রমাকান্ত..... এমন ভাবে লোকসমাজে বসে, মাথা ধোও কেন? জ্বর?

রমাকান্ত বলল, না দাদা জ্বর না। ওই বাঁশঝাড়ে বসে হাগছিলাম....তো দেখলাম ওখানে জল নেই....তাই......

সুধাকান্ত বলল, তা বাপু মাথা ধুচ্ছো কেন? যে অঙ্গটি ধোয়ার সে অঙ্গটি ধুয়ে কাপড়চোপড় পরে বাড়ি গেলেই হয়। নিজেরও মান থাকে। গ্রামেরও থাকে।

রমাকান্ত আরেক মগ জল পুকুর থেকে তুলে ঘাড়টা নীচু করে মাথায় ঢেলে, চুলে দুটো ঝাড়া দিয়ে বলল, কী বলেন দাদা....মনের যাবতীয় ময়লা যদি শরীর ডোবালে যায়.....তবে আমার এই পোঁদের ময়লা মাথা ধুলে যাবে না কেন? মাথাটাই তো আসল। সব কিছুর মূল তো এই মাথা। মাথায় হাগার বোধ এল বলেই যে না এদিকে এলাম....নইলে তো কাপড়চোপড়ে করে কী যাচ্ছেতাই কাণ্ড করতাম, তাই না, বলো দেখি......

সুধাকান্ত শাস্ত্র জানা মানুষ। বলল, তুমি বাড়ি যাও, নিম্নাগ্নটি ধুয়ে। সন্ধ্যেবেলা আমি যখন পাঠে বসব, এসোখনে.....তোমার এ বাতুলতা আমি ঘোচাচ্ছি…..

========

সন্ধ্যেবেলা সুধাকান্ত পরিকর নিয়ে বসে শাস্ত্র আলোচনা করছেন। বাড়ির নাম সুধাপরিকর। শাস্ত্রজ্ঞানের জন্যে সবাই গ্রামে বেশ মান্যগণ্যিও করে সুধাকান্তকে। রমাকান্ত এসে হাজির হল। এদিকে রমাকান্তের কাণ্ডকারখানা তো কারোর জানতে বাকি নেই গ্রামে। সে যেই না ঢুকেছে অমনি সব তাড়াতাড়ি সরে বসল। কে জানে সে অঙ্গটি ধুয়েছে কিনা। অনেকে তো আবার গন্ধও পেল। নাকে কাপড় দিল।

রমাকান্ত হেসে বলল সর কেন, কিন্তু আমি যে সারা রাস্তা পুণ্ডরীকাক্ষকে স্মরণ করতে করতে এসেছি গো….মন্ত্রতেই তো আছে…..য স্মরেৎ পুণ্ডরীকাক্ষ স বাহ্য অভ্যন্তর শুচি….নমো শুচি…নমো শুচি….নমো শুচি…..আমি তো বাইরে ভেতর দুইই শুচি…..

এই বলতে বলতে রমাকান্ত লক্ষ্মীকান্ত ভটচাযের ঘাড়ে এসে বসল। লক্ষ্মীকান্ত কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, আহা করো কী রমাকান্ত….. আমার বাড়িতে নারায়াণ শিলা আছে….তুমি……

ব্যাপারটা গোলমালে হয়ে যাচ্ছে দেখে সুধাকান্ত বলল, ভাই রমাকান্ত তুমি না হয় একটু দূরেই বসলে আজ….সকালে যে কাণ্ডটি ঘটালে….

রমাকান্ত একটু দূরে বসতে বসতে বলল, এমন ধারা অবিশ্বাস মন্ত্রে তোমাদের.. আগে তো জানতুম না গো…..

সুধাকান্ত বলল, আহা, বাস্তবজ্ঞান বলে তো একটা ব্যাপার আছেই নাকি……

রমাকান্ত বলল, আজ্ঞে তা তো বটেই…..আজই সকালে আমাদের চরণদাস ময়রার দোকানে গিয়ে দুটো মশারি আর বালিশের ওয়াড় চাইতে আমাকে সেও এই একই কথাই বলল…..আসলে কী হয়েছে মশারিটা অনেকদিন ধরে অনেক জায়গায় কেটে গেছে….এত মশা ঢুকছে….গিন্নী বলল…..

সুধাকান্ত তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, তোমার মাথাটা কী একেবারেই গেছে….মিষ্টির দোকানে মশারিই বা কিনতে কেন গিয়েছিলে বাপু….

রমাকান্ত বলল, সেই হল কথা। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবকে একজন জিজ্ঞাসা করছেন, গঙ্গাস্নান করলে পাপ যায়? তিনি বললেন, যায়, কিন্তু সে যখন নাইতে যায় তখন পাপগুলো গঙ্গার পাশে গাছে চড়ে তার জন্যে অপেক্ষা করে থাকে, যেই না স্নান করে পাড়ে ওঠে অমনি আবার চড়ে তার ঘাড়ে… তা এমন কথা যখন শোনা আছে….তারপরেও তুমি কোন আক্কেলে আমাকে ডেকে বলো এসো তোমাকে শাস্ত্র বুঝাই…..তুমি নিজেই কী মিষ্টির দোকানে মশারি বেচছ না? যা নিজে জানো না, তা নিয়ে অনুমানে সিদ্ধান্ত বানিয়ে বলো কেন?

সুধাকান্ত একটু রেগেই গেল। বলল, তার মানে তুমি বলতে চাও এসব স্নানস্নানাদি অন্ধবিশ্বাস?

রমাকান্ত বলল, তা দাদা আমায় একটা কথা বলো….হিঁদুর পাপ আর মুসলমানের পাপ কি আলাদা? ক্রেশ্চানের পাপ আর বৌদ্ধের পাপ কি আলাদা? ঠাকুর বলেছেন এক ঈশ্বর অনেক হয়, যেমন এক পুকুরের চারটে ঘাট….কেউ বলে পানি, কেউ জল, কেউ অ্যাকুয়া, কেউ ওয়াটার….এ তত্ত্ব বুঝি। কিন্তু হিঁদুর পাপ, মুসলমানের পাপ, ক্রেশ্চানের পাপ আলাদা….এ কী করে হয়? মানুষকে কষ্ট দেওয়াই তো পাপ? শোষণ পীড়ন অত্যাচারই তো পাপ?

হঠাৎ করে লক্ষীকান্ত বলে উঠল, কেন দাদা? বিদেশ থেকে এলে মনে হচ্ছে? বৃহস্পতিবার আমিষ খাওয়া পাপ না? কার্তিক মাসে লাউ খাওয়া পাপ না? আচমন না করে খেতে বসা পাপ না?

অমনি হরিনাথ মণ্ডল বলল, তা দাদা আমরা তো আচমন করি না….আমাদের তো মঙ্গলবার নিরামিষ….. তক্ষুনি যাদব দাস বলল, তা কেন? আমাদের তো সোমবার নিরামিষ……

রমাকান্ত সুধাকান্তর দিকে তাকিয়ে বলল, নাও দাদা বোঝাও…..তারপর ওদের দিকে ফিরে বলল, তোমরা যা বলছ সেই মতে একদিন বিধবাবিবাহ পাপ ছিল, সতীকে দাহ পুণ্য ছিল, কচি মেয়ের বিয়ে না দেওয়া পাপ ছিল…. পোপের কথা অনুযায়ী ট্রেনে চড়া পাপ ছিল.. সব ধর্মেই এমন সব নিয়ম বানানো আছে….ওগুলো পাপ না দাদা…অজ্ঞানের পেটে জন্মানো ভয়… আসল পাপ সে-ই যা বিবেকে জ্বালা ধরায়….অভ্যাসে না…..আমার বিধবা পিসিমার শাশুড়ি বাপের বাড়ি পরপর চারবার পুঁইশাক ছাগলে মুড়িয়েছিল, তাই সে বুড়ি ছাদে পুঁইশাক বুনত, টবে। ওদের বাড়ি চাউর হয়ে গিয়েছিল মাটিতে পুঁইশাক বোনা পাপ। একি পাপ দাদা? অভ্যাস। তুমি বুকে হাত দিয়ে বলো তো….যে তোমার জমিবাড়ি জাল করে লিখিয়ে নিল, সে সাতসমুদ্র নেয়ে এসে যদি বলে আমার পাপ মাফ করেছে ঠাকুর….তোমার বিবেকে সায় দেবে? তোমার ও শনিবারে পাঁঠার ঝোল খেয়ে ফেলার পাপের লজ্জা হয় তো গঙ্গা নেয়ে যাবে…..যেমন মিছে পাপ, তেমন মিছে উপায়…..আমরা যেমন কুকুর দেখলে সাতকড় ধরতাম…..খেলায় আব্বুলিশ, উবু বলতাম….এও সেই….কিন্তু কাউকে ঠকিয়ে….পীড়ন শোষণ করে তাঁর দরবারে দুটো ডুব দিয়ে রেহাই পাবে দাদা? মালিক এক….পাপও এক…..”এক ব্রহ্ম দ্বিধা জেনে মন আমার হয়েছে পাজি”…..সেখানে বড়বাবু ছোটোবাবু নেই দাদা….একজনই আছেন…..মনের মালিক….সেই জগতের মালিক…..মন অন্ধকার করে বাঁচলে ক্ষতি আখেরে দাদা তোমারই…..মন অন্ধকার করে তাকে দেখবে কী করে? জগতময় বিভীষিকাই দেখবে….আর বলবে ওই তিনি…..

সবাই চুপ করে বসে।

রমাকান্ত উঠে দাঁড়ালো। ছলছল চোখ। হাতজোড় করে বলল, বিশ্বাস ব্যক্তিগত বিষয়… জানি দাদা….তাই অ্যাদ্দিন তো কিছু বলিনি….কিন্তু ওদিন স্টেশানে অতগুলো বাচ্চার মৃতদেহ দেখে….সেদিন হুড়োহুড়িতে পদপিষ্ট হয়ে সঙ্গমের পাড়ে অত মানুষের মৃতদেহ থেকে আর থাকতে পারছি না দাদা…আর তো ব্যক্তিগত থাকল না দাদা…. বাড়িতে তোমাদেরও ছেলেমেয়ে আছে…..গীতায় ভক্তিতত্ত্ব, ঈশ্বরতত্ত্ব শেখাবার আগে গোবিন্দঠাকুর স্থিতপ্রজ্ঞ হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছেন, বলছেন…. বুদ্ধি স্থির করার কথা….দাদা, তুমি কুম্ভে না গিয়েও হিন্দু থাকতে পারো…কিন্তু মানুষকে পিষ্ট করে মানুষই থাক না তো দাদা হিন্দু……যেখানে খুশী সেখানে যাও….সাতসমুদ্র নেয়ে ফেরো…কিন্তু দাদা অন্তর্যামীকে ফাঁকি দিয়ে শাস্ত্র আর ঐতিহ্যের দোহাই দিও না…..ঠাকুর বিবেকে কথা বলে দাদা…..বইয়ে না।