Skip to main content

 

001.jpg

যা ঘটে চলেছে কার্যকারণ সুতোয় ঘটে চলেছে। একটার পর একটা। এখানে করুণার প্রশ্ন আসছে কেন? যা ঘটছে, তা অবশ্যম্ভাবী বলেই ঘটছে। অন্যথা হতে পারত নাকি? কিন্তু আমি তো ঘটনা নই। আমার তো ক্রম নেই। আমি এই কার্যকারণ শৃঙ্খলের অনন্ত ক্রম দেখতে দেখতে বিষণ্ণতায় ডুবে যাচ্ছি। এর থেকে বাইরে যাই কী করে? আমি কীসের কারণ? আমার কারণ কী? আমি কে?

প্রজাপতিটা গাছের গুঁড়িতে বসল। রোদ মাখছে। পাহাড়ি কুয়াশা। সদ্য ছিঁড়ে রোদ উঠেছে। এত আয়োজনের মধ্যে আমি কেন? চারদিকে ঘুরে চলেছে লক্ষ লক্ষ কার্যকারণের চাকা। একটা চাকায় নিজেকে জড়িয়ে নিলেই হয়। কিন্তু কেন? চাইছি না তো। এক মুহূর্তের জন্যেও চাইছি না।

গাছের গুঁড়িটায় শেওলা জমে। সবুজ কম্বলের মত। কয়েকটা জায়গা বাদামী। ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। পিছানো যায় না। কিন্তু বলো আমাকে, আমি কীসের কারণ? আমার কারণ কে? কে আমি?

মাথায় বোঝা আটকে পিছন দিকে ফেলা। কী ভার নিয়ে উঠছে বৃদ্ধা উপরে। উপরে ওর ঘর। সংসার। গোটা জীবন কেটে গেল এই পাহাড়ে। ওদের পাহাড়ের সুখ তো আমার মত পর্যটকের সুখ না। নিত্য জীবনের দানা দানা সুখ। অল্পেই গুঁড়িয়ে যায়। উবে যায়। জীবনকে কী পর্যটকের সুখে দেখাই একমাত্র উপায়? “মন চলো নিজ নিকেতনে?”।

আমাকে ঘিরে কর্তব্যের জাল। আমি বানাইনি। ওরা আমাকে বানিয়ে নিতে চাইছে। এর থেকে বেরোতে চাই আমি। এখনই। সব জাল ছিঁড়ে ছিন্নভিন্ন করে চলে যেতে চাই। প্রজাপতিটা বসে আছে। ডানা দুটো ধীরে ধীরে খুলছে, বন্ধ করছে। রোদটা সরে গেলে, ও সরে যাচ্ছে।

বাজার দিয়ে হাঁটছি। ভীড় অনেক। অচেনা হয়ে হাঁটতে আরাম লাগছে। একা একা কথা বলা যায়। বাইরের কথা জালের মত। নিজের সঙ্গে নিজের কথা ঘাসের মত। সেই ঘাসের উপর ছোটো ছোটো পা ফেলে হাঁটছি। প্রজাপতিটাকে ফিরে গিয়ে দেখব উড়ে গেছে। রোদ চলে গেছে। সবুজ শেওলা জড়ানো গাছের গুঁড়ি নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলছে। আমি সামনে গিয়ে দাঁড়ালে নিজের কথা থামিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করবে, কিছু বলবে? আমি বিভ্রান্ত, সংশয়ের দোলাচালে ভাঙা মাথা নেড়ে কিছু একটা বলতে চাইব। গাছের গুঁড়ি বলবে, এই রোদ, প্রজাপতি, শেওলা, পাহাড়ের মাথা, কুয়াশা, নীল আকাশ….এ সবের কোনো ভাষা নেই। তোমার অনুমানের ভাষায় ওদের নিস্তব্ধতা নষ্ট করো কেন? কেন? গর্জে উঠবে গুঁড়ি। আমি কুঁকড়ে যাব ভয়ে। সে বলবে, যা কিছু দেখো সব কিছুকেই তোমার অনুমানের স্বাদে চাখতে চাও কেন? ছেড়ে দিতে পার না? পার না? লোভী! দুর্বল! কামুক!

গতকাল এই কথাগুলোই বলেছে। আমার মনে ছিল না। এই বাজারে হাঁটতে হাঁটতে এখন আবার সব মনে পড়ছে। হাঁটতে হাঁটতে হোঁচট খেলাম। ধাক্কা খেলাম। এই সবের মানে খুঁজতে গিয়ে কার্যকারণ সুতোয় জড়ালাম। গাছের গুঁড়ি আবার বলল, অনুমানের ভাষা…সর্বনাশা…..নীরবতা নেই তোমার, লোভী…. শয়তান…কুটিল?

একটা কুকুর, ঘেয়ো। মৃত্যুর সামনে বসে। মৃত্যু ঘুমিয়ে। কুকুরটা জেগে। কুকুরটার দগদগে ঘা বলল, জীবনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় বাঁচলে শুধু। জীবনকে বাঁচতে দিলে না। ধিক! ধিক!

আমার জ্বর, এই দেখো, কপালে তোমার নাকটা ঠেকিয়ে দেখো। জ্বরে পুড়ছে কপাল। মৃত্যু ঘুমিয়ে, পালাচ্ছ না কেন? কুকুর বলল, আবার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় যাচ্ছ। কেউ পালাতে পারে না। ওর ঘুম ভাঙলেই আমাকে ডাকবে। তুমি যাও। তোমার জ্বর।

হ্যাঁ আমার জ্বর। গাছের গুঁড়ির পাশ দিয়ে ফিরতে ফিরতে দেখলাম প্রজাপতিটার ডানাগুলো ছিঁড়ে পড়ে আছে টুকরো টুকরো হয়ে। কোনো সরীসৃপের কাজ। বুকের উপর বুকে হেঁটে চলে শীতল বিষাদ। সরীসৃপ। সব টুকরো টুকরো করে ফেলে। আমার ঘরে এলাম। কানের ভিতরটা ভোঁ ভোঁ করছে। কপাল ঘাড় পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। বাইরে কুয়াশা নামছে। বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। আমি মোটা মোটা দুটো কম্বলের মধ্যে ডুবে যাচ্ছি। পায়ের তলা, হাতের তলা হিম শীতল।

আবর্জনার মত স্বাধীন হয় কিছু মানুষ, জানো তো? সংলগ্নতা নেই। দায়িত্ব নেই। শুধুই আবর্জনার মত স্বাধীন। কম্বলের রোঁয়াগুলোর ভাষা সারাটা শরীর দিয়ে ঢুকছে। জ্বরে শরীরের ভাষা গ্রহণের ক্ষমতা বেড়ে যায়। চুপ করো, চুপ করো। আমার জ্বর। মরে যাচ্ছি।

তুমি লম্পট! তুমি কাপুরুষ! তুমি অলস! জ্বর তোমার আছিলা। আসল তুমি কই? তাকে বনসাই করে বাঁচিয়ে রেখেছ। তোমার ভাবনাগুলো শেকল। তোমার ভালোবাসাগুলো বঁড়শি। তোমার স্বপ্নগুলো সুদকারাবারির দস্তাবেজ। তুমি মরো। তুমি আবর্জনা।

দেওয়ালে প্রচণ্ড আকারের সরীসৃপ দাঁড়িয়ে একটা। শীতল। লেজের ঝাপটা দিচ্ছে কাঠের দেওয়ালে। বাইরে বৃষ্টি নেমেছে পাইনের জঙ্গলে। আমি সরীসৃপের দিকে তাকিয়ে বললাম, ঈশ্বরকে ডাকবে একবার? আমি মারা যাচ্ছি। তোমার কী নিষ্ঠুর নীল চোখ। ডাকবে একবার? কাছে এসো না, দোহাই।

প্রচণ্ড বৃষ্টিতে প্রজাপতির পাখার টুকরোগুলো ভেসে যাচ্ছে। ঈশ্বর খুঁজে বেড়াচ্ছেন টুকরোগুলো। কুয়াশায় মিলিয়ে যাচ্ছেন ঈশ্বর। বৃষ্টিতে মিলিয়ে যাচ্ছেন ঈশ্বর। ঈশ্বর আমাকে চেনো? এই যে….একটা বিশাল সরীসৃপের সামনে জ্বরে শুয়ে। ঈশ্বর, ওই কুকুরটা মারা গেছে? ঈশ্বর, বাজারে সব লোক নিরাপদে ফিরে গেছে? ঈশ্বর আমি যে যে পাথরে হোঁচট খেয়েছি তারা ভালো আছে? ব্যথা কমেছে ওদের ঈশ্বর? যাবেন না….মিলিয়ে যাবেন না…..একবার বলে যান…..আমি কী শুধুই লোভী, লম্পট, কাপুরুষ, কামুক ছিলাম ঈশ্বর?.....বৃষ্টি বাড়ছে। ঈশ্বর পেলেন সব কটা টুকরো?

ঈশ্বর হাত বাড়ালেন। বৃষ্টিতে ভেজা হাত। কুয়াশায় ঢাকা হাত। কয়েকটা টুকরো নীল প্রজাপতিটার ডানার। ঈশ্বর আমার বুকের মধ্যে হাত ডুবিয়ে দিলেন। যেন মা হাত ডুবালেন তালের ক্ষীরে। কী খুঁজছ? অবশিষ্ট ডানা? আমি কি চোর ঈশ্বর? নেই কিছু। কিছু নেই আমার। আমি কিছু নই।