একাদশী। যমুনার তট জুড়ে মানুষের ঢল। আজ পরিক্রমার দিন। সকাল থেকে কুয়াশা কাটেনি। বেলা তিনটে। দুপুরে খাওয়া বলতে দুটো শসা আর এক মুঠো বাদাম। আজ যে অন্ন খেতে নেই। মা মেয়ে দুজনে হাত ধরে হাঁটছে। যমুনায় এসেছে প্রচুর পাখি এবছর। মা মেয়ে পাখিদের কুয়াশা মেঘে ওড়া দেখছে।
দুজনেই বিধবা। তাদের অনেক গল্প। অনেক কথা। শুনবে কে? মেয়ে মায়ের বুকে মাথা রেখে ঘুমায়। মায়ের বুকে শীত জমে। মেয়ের চোখের জল, বড্ড শীত।
মা মেয়ে তুলসীর মালা বানায়। মন্দিরের দামী পাথর বসানো মেজে, মা মেয়ে মোছে। ওতেই পেট চলে যায়। পেট চললেই জীবন চলে। জীবন বলতে ওইটুকুই। পেটের উপর অবশিষ্ট ক'টা ভাঙা খড়কুটোয় গড়া হৃদয়। মাথার মধ্যে গত জীবনের ধ্বংসস্তুপ।
মেয়ে বলল, মা, একবার বাড়ি যাবে? এ বছরের পুজোয়?
শান্তিপুরে বাড়ি। স্টেশান থেকে অনেক দূর। গ্রামের বাড়ি।
যাবি? উঠবি কোথায়?
পিসিমার বাড়ি....
ধুর পাগল....মরে গেছে না...
আমার বন্ধু... স্বস্তিকার বাড়ি?
ওর বর আছে না? শ্বশুর আছে না?
তবে?
কদিন ভাবি আমরা......
এ এক পুরোনো খেলা। শীতের খেলা। শীতকালে মন খারাপের পরিযায়ী পাখিরা দুরাশার হৃদে আসে। ওদের ডানার সুরে পাগলামি বাড়ে। সব অসম্ভব সম্ভব হবে, কথা দেয়।
মেয়ে বলল, তোমার মনে আছে, আমার বিয়ের একমাস পরে...তোমার জামাইয়ের সেকি হেঁচকি...লঙ্কা খেয়ে….আমাদের বাড়ি...
মা হেসেই লুটিয়ে পড়ল। যমুনার জলে পড়তে পড়তে পা সামলালো।
মা বলল, তোর বাবার সেই শীতের দিনে স্নান নিয়ে ঝামেলা? কিছুতেই করবে না.....কী অশান্তি.....তুইও ছিলি তেমন ধারা...বাপের মত...
মেয়ের মুখে মিষ্টি হাসি। মায়ের মুখে লজ্জার।
গল্পের পর গল্প উড়ছে। ডালে বসছে। মা মেয়ে আধপেটা খেয়েও ওদের পোষে। মা মেয়ের একটাই ভয়, এ পাখিগুলো উড়ে গেলে বাঁচবে কী করে? কী নিয়ে?
মানুষের আত্মাই নাকি পরিযায়ী পাখি। দুঃখ পেতে সংসারে আসে। শরীরের ভেলায়। মাঝিকে শোনায় গল্প। মাঝি হাল ধরে বসে গল্প শোনে। কোনো গল্পই শেষ হয় না। মাঝি হাসে। বলে, আবার শুনব। আরেকদিন।