Skip to main content

 

001.jpg

 

শালগ্রাম শিলার মত ভালো মানুষ হয়ে কী লাভ? জাভেদ আখতার একটা সাক্ষাৎকারে বলছেন, ফিশিং একটা দারুণ অবসরযাপন, কারণকে মাছ বঁড়শিতে আটকালে, ধরা পড়লে, ছাল ছাড়িয়ে নুনহলুদ মাখিয়ে তাকে ভাজা হলেও সে চীৎকার করে না। তাই একজন নিরীহ মানু্‌ষও মাছ ধরার সুখে অবসরযাপন করে। কারণ মাছের ভোকাল কর্ড নেই।

সাধু হব বলে আমি সততা ছেড়েছি। তবে সে সাধুত্বের কী মূল্য? দেখেছি আমাদের সমাজে সাধু হওয়া সহজ, সৎ হওয়া না। কোনো থিওলজিতে নিজের বিচারবুদ্ধি সর্বস্ব অর্পণ করলে সাধু হয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু সত্যের কোনো থিওলজি নেই। হৃদয়ের কোনো প্রতিষ্ঠান হয় না। কমোন সেন্স থেকে আনকমোন সেন্সের জগতে ঢুকতে যত ভর্তুকি দিতে হয়, সে সব চুকিয়ে স্বাধীন স্বাভাবিক বুদ্ধি আর তেমন কিছু অবশিষ্ট থাকে না। যেটুকু পড়ে থাকে, সে নিতান্ত কিছু কেজো, হিসেবী বুদ্ধি।তখন ব্রেন ওয়াশ থেকে হীরকরাজার যন্তরমন্তর সব কিছুর শিকার হওয়া সোজা হয়ে যায়।

সত্যের মধ্যে সব সময় এক নতুনত্বের স্বাদ থাকে। এই সময়ে অনেক গাছে নতুন পাতা আসার সময়। কী সতেজ তারা। সে পাতাগুলো না রঙে এখনও অবধি পুরোপুরি সবুজ হয়েছে, না আকারে গোটা পাতা হয়েছে। কিন্তু সূর্যের আলো এসে যখন পড়ে, তার আনন্দে কোনো খামতি নেই যেন। কিছু একটা হতে হবে এমন কোনো দায় নেই, যতটুকুনি হয়েছে তাতেই তার প্রফুল্লতার সীমাপরিসীমা নেই যেন। তেমনই বৈষ্ণবের পদাবলীতে। সেখানে যে আনন্দ সতেজ হয়ে ফুটে ওঠে, সে ভাব অনেক সময় খুব পাকা কিছু তত্ত্ব নয়, কিন্তু তার মধ্যে একটা সুখ আছে। সেখানে অনেক কিছুই আধো আধো বলা, কিন্তু তাও তার মধ্যে সুখ। কিন্তু বোষ্টুমির “আমার কৃষ্ণকে না মানলে সব মিথ্যা” - এ কথায় সে আনন্দ নেই। জোর আছে। যেখানেই মানুষের স্বাভাবিক আনন্দ নেই, সেখানেই জোর আছে, শাসন আছে, নিয়ম আছে। কোনো না কোনোভাবে সঙ্কীর্ণতা আছেই। আনন্দের সঙ্কীর্ণতা হয় না। লাভ-লোকসান খোঁজা বুদ্ধির হয়।

অনেকের সঙ্গে কথা হয়। অনেকেই বেশ উচ্চভাবের কথা, সাহিত্য-ধর্ম-দর্শন, কত বিষয়ে কথা বলে যান। স্পষ্টভাবে বলে যান। কিন্তু ওই স্পষ্টতার মধ্যেই যেন কোথাও একটা কী ফাঁকি থেকে যায়। স্পষ্টতা আর অস্পষ্টতার মধ্যে যে আলোছায়া, যেখানে সত্যের আনাগোনা, সে ফাঁকিতে পড়ে যায়। সত্যের অতি সামান্য প্রকাশ্য, অপ্রকাশিতই বাকি সবটা। এ জায়গায় দাঁড়িয়ে আমার সত্যি কী খুব স্পষ্ট করে, জোর দিয়ে, ভীষণ নিশ্চিতভাবে কিছু বলার আছে? আমার তো মনে হয় না।

শালগ্রাম শিলা যত স্পষ্ট, উপনিষদ যখন বলেন, সত্যম জ্ঞানম অনন্তম ব্রহ্ম, সে তত স্পষ্ট নয়। শালগ্রাম শিলার সামনে দাঁড়িয়ে বলাই যায়, এই তো আছে। স্পষ্ট, স্বচ্ছ। মাথা নীচু করে, সিন্নি মেখে দিলেই হয়। কিন্তু সত্যম জ্ঞানম অনন্তম ব্রহ্মকে নিয়ে আমি কী করব? তা তো স্পষ্ট বোঝাই যায় না। তাকে না আস্তিক হয়ে স্বীকার করা যায়, না নাস্তিক হয়ে অস্বীকার করা যায়। সত্য আর জ্ঞানের অসীমতা নিয়ে তো না সংশয় হয়, না বিশ্বাস। সে শুধুই এক বিস্ময়। কিন্তু বিস্ময়ে আমার লাভ কী? ঘর গোছাতে গিয়ে বহুকাল আগে আমারই লুকিয়ে রাখা টাকা যখন হাতে আসে, তার এক বিস্ময়মাখা সুখ আছে টের পাই। কিন্তু এ বিস্ময় নিয়ে আমি কী করব?

কিছু করার নেই। কিন্তু নিত্য জীবনের দাবী মিটিয়ে, সত্যের অন্বেষণ আর সে অন্বেষায় জাগা বিস্ময়ের সুখ - কেবল মানুষেরই সুখ। নইলে গ্রহ-নক্ষত্র থেকে এমন অনেক কিছুই আমাদের বৌদ্ধিক চর্চার উপজীব্য হত না। লাভের মানুষ রাতদিন কানের পোকা খেয়ে ফেলত, আহা, এ সব জেনে কী লাভ বলো তো…..থাক থাক, কিছু কাজের জিনিস খোঁজো।

কিন্তু অ-লাভের খোঁজার আগে হৃদয়কে ওই শালগ্রামী ভালোমানুষি ছেড়ে বেরোতে হয়। আপাদমস্তক অতৃপ্তির চাবুকের আঘাতে আহত হয়ে বলে উঠতে হয়,

"আবার যদি ইচ্ছা কর আবার আসি ফিরে

দুঃখসুখের-ঢেউ-খেলানো এই সাগরের তীরে ॥

আবার জলে ভাসাই ভেলা, ধুলার 'পরে করি খেলা গো,

হাসির মায়ামৃগীর পিছে ভাসি নয়ননীরে ॥

কাঁটার পথে আঁধার রাতে আবার যাত্রা করি,

আঘাত খেয়ে বাঁচি নাহয় আঘাত খেয়ে মরি।

আবার তুমি ছদ্মবেশে আমার সাথে খেলাও হেসে গো,

নূতন প্রেমে ভালোবাসি আবার ধরণীরে।। "

এ গান গুরুদেব লিখছেন বুদ্ধগয়াতে, ১৯১৪ সালের ১০ই অক্টোবর। পরেরদিনই লিখছেন, "এদিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিল দ্বার"। সে গানে শেষে লিখছেন,

"বনে বনে ফুল ফুটেছে, দোলে নবীন পাতা--

কার হৃদয়ের মাঝে হল তাদের মালা গাঁথা?

বহু যুগের উপহারে বরণ করি নিল কারে,

কার জীবনে প্রভাত আজি ঘুচায় অন্ধকার?।"

সেই নবীন পাতার দিকে ইঙ্গিত.....

[3 March 2025]