Skip to main content

 

333.jpg

 

এই চায়ের দোকানে ভিড় থাকেই। রঞ্জনের উল্টোদিকে ছেলেটা বসে। রঞ্জনের পাশে মেয়েটা। মাঝখানে টেবিল। চায়ের দাগে অপরিষ্কার। রঞ্জন বলল, কফি বলি?

ছেলেটা বলল, বল। চিনি বেশি দিতে বলিস।

রঞ্জন পাশ ফিরে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল, তুই?

মেয়েটা বলল, ইচ্ছা করছে না। গলায় ঈষৎ বিরক্তি।

ছেলেটা সিগারেট ধরিয়ে সামনে রাস্তার দিকে তাকালো। এক বয়স্ক স্ত্রী পুরুষ নামল টোটো থেকে। বৃদ্ধা ভাড়া মেটাচ্ছে। বৃদ্ধ চায়ের দোকানের সামনে একটা চেয়ার ধরে দাঁড়িয়ে।

রঞ্জন বলল, কিছু খা।

মেয়েটা বলল, একটা চা বলে দে। চিনি ছাড়া।

=======

ছেলেটা বলল, ফিরবি আজ?

মেয়েটা বলল, রঞ্জনদা কোথায় গেল?

ছেলেটা বলল, আমি ট্রেনে তুলে দিয়ে আসতে পারি।

মেয়েটা বলল, এরা চা টা এত তিতো করে দেয় না…..

ছেলেটা বলল, আজ সকালে জ্বর এসেছিল। দুদিন হল।

মেয়েটা বলল, হুম। অন্যদিকে ফেরানো মাথা।

ছেলেটা বলল, বাপি বলল এন্টিবায়োটিক লাগবে না এখনই।

মেয়েটা তাকালো। বলল, আমি ডাক্তার নই। এসব শুনে লাভ নেই। রঞ্জনদাকে কল করি একটা।

ছেলেটা মোবাইলটা হাত থেকে নিতে গেল। মেয়েটা হাতের আড়ালে আগলে নিল।

ছেলেটা মোবাইল আগলানো হাতের আঙুলের মধ্যে নিজের ডান হাতের আঙুলগুলো ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, ইচ্ছা না হলে যাস না।

মেয়েটা মাথা ঘোরালো। চোখ ভর্তি জল। এত লোক চারদিকে। চোয়াল দুটো শক্ত।

ছেলেটার বাঁ হাতে তখনও ধরা জ্বলন্ত সিগারেট। সেটা ফেলে, হাতটা হাতের মধ্যে রেখেই পা দিয়ে নেভালো। উঠে এসে পাশে বসল। মেয়েটা অন্যদিকে ফিরে। সামনের টেবিলে বৃদ্ধা আর বৃদ্ধ চায়ে চুমুক দিচ্ছে। পশ্চিমের রোদ এসে পড়েছে চায়ের দোকানের সামনে। দোকানের পাশেই একটা পলাশগাছ। অল্প কয়েকটা পলাশ ফুটে আছে। কিছু মাটিতে পড়ে।

মেয়েটা বলল, যেতে হবেই। মায়ের চোখ দেখানো আছে। দিদিদের জানো তো, কেউ নিয়ে যাবে না। ফেলে রেখে দেবে।

ছেলেটা বলল, মনে হচ্ছে জ্বরটা আসছে আবার। শীত করছে। আমার হাতটা কি ঠাণ্ডা?

মেয়েটা বলল, হাতটা ঘামছে তোমার। উঠবে? হোস্টেলে ফিরবে?

ছেলেটা বলল, থাক। চল হাঁটবি? মেয়েটা বলল, থাক।

=======

রঞ্জন বলল, এটিএম যেতে হয়েছিল। টাকা তোলার ছিল। তোরা আরেকটু বোস। আমি দুটো জিনিস নিয়েই আসছি। আমার বাইকেই ছেড়ে দেব তোদের। উঠিস না।

======

ছেলেটা বলল, যাবি?

মেয়েটা চুপ করে বসে। ছেলেটা উঠে দুকাপ কফি আর দুটো কেক আনল। সামনের টেবিলে বৃদ্ধ বৃদ্ধা চা শেষ করে চুপ করে বসে। রাস্তার দিকে তাকিয়ে। কতগুলো কুকুরছানা রাস্তার ওদিকে খেলছে। কিছুদূরে যে কুকুরটা ঘুমিয়ে, হয় তো ওদের মা।

মেয়েটা বলল, সব ভীষণ জটিল হয়ে যাচ্ছে। হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। পড়াশোনাটাও কদ্দিন চালাতে পারব জানি না।

ছেলেটা বলল, বড্ড বেশি ভাবছিস।

ছেলেটা হাতের বেড়ে মেয়েটাকে কাছে টেনে নিল। মেয়েটা বাধা দিল না। বলল, তুই চোখটা দেখিয়ে আয় কাকিমার। আর কত লাগবে অপারেশনের জন্য আমায় বলবি, আমি অনলাইন করে দেব।

মেয়েটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আর কত দেবে?

ছেলেটা বলল, টোটোতে ফিরবি? রঞ্জনকে বারণ করে দিই?

মেয়েটা বলল, থাক।

বৃদ্ধা উঠল। বৃদ্ধের হাতটা ধরে ওঠালো। বৃদ্ধা রাস্তার দিকে তাকিয়ে।

মেয়েটা বলল, দেখবে? ওরা বোধহয় টোটো খুঁজছেন? তুমি যাবে একবার?

মেয়েটার এ উদ্বিগ্ন গলা চেনা ছেলেটার। এ উদ্বিগ্নতায় গর্ববোধ হয়। ছেলেটা গেল। স্ট্যান্ড থেকে টোটো এনে দাঁড় করালো। বৃদ্ধের হাতটা ধরে ওঠালো। বৃদ্ধা হাসলেন ছেলেটার হাতটা ধরে। টোটো ছাড়ার আগে বৃদ্ধা মেয়েটার দিকে তাকালেন। হাত নাড়লেন। মেয়েটাও হাত নাড়লো, সঙ্কোচে।

ছেলেটা ফিরে তাকালো। মেয়েটা তাকিয়ে তার দিকে। পড়ন্ত সূর্যের আলো এসে পড়েছে ওর মুখে। কী মায়াবী লাগছে ওর দুটো চোখ। কী ভীষণ একটা প্রাণ বুক থেকে গলা অবধি এসে কামড়ে ধরল। শ্বাস আটকে এলো। এখনই চুমু না খেতে পারলে যেন সব নষ্ট হয়ে যাবে। সব বৃথা হয়ে যাবে। এ বিকেল, এ জীবন, যাবতীয় যা কিছু যেন সব ওর হাতে সঁপে দিতে পারলে বেঁচে যায় সে। জ্বরটা বাড়ছে। কাঁপুনি দিল। মেয়েটা এখনোও তাকিয়ে। অসহ্য। চারদিক পুড়ে যাচ্ছে। পাগল হয়ে যাচ্ছে যে সে। কী করে বোঝাবে। পৃথিবীতে কোনো অভিধানে কোনো শব্দ নেই ভালোবাসার অসহায়তাকে বোঝানোর জন্য। কান্না পেয়ে যাচ্ছে। মৃত্যু ছাড়া ভালোবাসার কোনো দরদী নেই। দোসর নেই।

মেয়েটা উঠে এলো। বলল, হাঁটবে চলো। রঞ্জনদা ব্যস্ত। আসতে পারবে না।

মেয়েটা স্মিত হাসল। হাতটা ধরল। জ্বরে পুড়ে যাওয়া হাত। মেয়েটা বলল, পারবে?

ছেলেটা বলল, চলো, যতটা পারি।