Skip to main content

 

পরীক্ষা শেষে বই ছেঁড়া নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। অনেকেরই কাছে ধাক্কা। স্বাভাবিক, যারা এ সব থেকে কিছুটা দূরে থাকেন তাদের আশ্চর্য লাগবেই। কথাটা হচ্ছে বাংলার মাটিতে বাংলা বোর্ডেই এই ঘটনা ঘটল, নাকি এ ঘটনা সিবিএসই, আইসিএসই এইসব বোর্ডের পরীক্ষা শেষেও একই ঘটনা ঘটবে। অন্যান্য রাজ্যেও ঘটবে? ছাত্রছাত্রী বলতে কী বোঝায়? ধনীর স্কুল, গরীবের স্কুল, মধ্যবিত্তের স্কুল যেমন আছে, তেমনই আছে বঙ্গীয় বোর্ড, কাউন্সিল আবার কেন্দ্রীয় বা দিল্লীর। ধনী সন্তানের ক্ষোভের প্রকাশ আর গরীব, মধ্যবিত্তের ক্ষোভের প্রকাশ একরকমের হয় না। কিন্তু এটা অনস্বীকার্য যে ছাত্রজীবন গভীর ক্ষোভ দ্বারা আক্রান্ত। কারণ? সে গল্প বলা যাক। কিন্তু এ গল্প বলা বাহুল্য একটা বৃহদাংশর গল্প, সর্বাংশের না আপাতত।

 

১) মোবাইল ---

'ব্রেন রট' শব্দটা এখন সেলিব্রেটেড শব্দ। আমি মোবাইলে ডুবে আছি। কেন? কারণ আমার ভালো লাগছে। 'নেশা লাগছে' শব্দটা আমরা বলব না। ওটা নেগেটিভ শব্দ। বরং আমি বলব, আমার ভালো লাগছে। কেমন একটা ভালো লাগা, যে ভালো লাগাটা আমার পাশের এই কঠোর প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবটাকে আমার পাশ থেকে সরিয়ে দেয়। আমি যত ডুবে যাই, তত হারিয়ে যাই। নিজেকে নিয়ে কোনো চাপ লাগে না আমার। বাড়ির লোক, শিক্ষকেরা যে চাপ সৃষ্টি করতে চায় আমার উপর, ওগুলো আর কাজ করে না। আমি দেখতে দেখতে অবশ হয়ে যাই। আমার সুখ লাগে।

 

২) বিভ্রান্তি ---

ক) দেখো, লেখাপড়ার সঙ্গে তো এখন আর জীবিকা বা ওই সবের সরাসরি যোগাযোগ নেই। ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক করে কত কত মানুষ বাড়ি-গাড়ি-টাকা সব করে ফেলছে। শুধুমাত্র সিনেমা নিয়ে খিল্লির ভিডিও বানিয়ে দেখো কী করে ফেলছে। সবাই চেনে। ফেমটাও তো একটা বড় ফ্যাক্টর।

খ) তাছাড়া শেয়ার বাজার বোঝো? আমি বুঝি। আমি ক্লাস নাইনে পড়লেও আমি বুঝি। এই দ্যাখো ইউটিউবে কত টিউটোরিয়াল আছে। কখন পড়বে, কখন ধরবে, সব বোঝানো আছে। আমি জানি এটা আমি পারব। আজ না হয় কাল এতেই আমার প্রচুর টাকা হয়ে যাবে। কীভাবে টাকা বাড়বে হিসাব করে দেখানো আছে।

 

৩) মেরিট বনাম মানি ---

ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ঠিক একটা না একটা সিট তো পাবই। আরো আছে, নার্সিং, হোটেল ম্যানেজমেন্ট, মায় ডাক্তারি। না না, ওখানে মেরিট লাগে না। টাকা লাগে। যাদের অত মেরিট নেই, তারা কোথায় যাবে? আগে তো অত সুযোগ ছিল না। এখন আছে। এদেশে অতটা না থাকলেও বাইরে আছে। ওই যে অমুক দাদা…. তমুক দিদি…. হায়ার সেকেণ্ডারিতে কত পার্সেন্ট পেয়েছিল? বলাও যাবে না। দেখো টাকার জোরে কোথায় পড়ছে এখন।

 

৪) পাশ করিয়ে দেওয়া গৃহশিক্ষক ও তার সর্বরোগহরা নোটস্‌ ---

বই খুলতে হয় না স্যার। ও গোটা বই পড়ে পাশ করতে হলে আমার ছেলের / মেয়ের হয়ে গিয়েছিল। অমুক স্যারকে ছাড়িয়ে তমুক স্যারের কাছে দিয়ে দিলাম। ওহ্‌! কী পার্সোনালিটি স্যারের! হোয়াটসঅ্যাপে নোটস্‌ পাঠিয়ে দিচ্ছেন। যা বলবেন, সেই বিষয়ে। ওই চ্যাটজিপিটি না কি আছে? স্যারের নখদর্পণে। উনি বলেন, আমি আছি যখন বই পড়বি কেন? ওসব বই লেখে যারা তারাও মূর্খ আর যারা পড়ে তারাও। নোটস্‌ পড়। সাজেশান পড়। এরা টাকার জন্য বই ছাপায়, আর তাতে এত সব বাড়তি লেখে!

 

৫) “আমার চোখে তো সকলই শোভন” টাইপের অভিভাবক ---

স্যার, স্কুল থেকে ওই দশ হাজার টাকা দেয়, ওতে কী ফোন হয় বলুন, তাই আরো কুড়ি দিয়ে ওকে একটা ভালো ফোন দিলাম। যা হোক, একটাই সন্তান, তাছাড়া রোজ রোজ তো কিনছে না।

ল্যাপটপ দিলাম…. পঞ্চাশ হাজারের গেমিং সেট দিলাম….. ব্র‍্যাণ্ড ছাড়া পরতে পারে না…. তাই চিপ শপিং মলে নিয়ে যাই না….

পড়াশোনা হচ্ছে না? ওমা মারবেন….. মেয়ে তো কী হয়েছে…. ছেলে বড় হয়েছে তো কী হয়েছে মারবেন….. না মারলে কিচ্ছু হয় না….. মারেন না? ওমা কেন? আমরা কিচ্ছু বলব না… এত এত দামী জিনিস কিনে দিচ্ছি….. মারলেই পড়াশোনা হবে স্যার….

 

৬) তাৎক্ষণিকতায় বাঁচি ---

কাল কিসনে দেখা হ্যায়?

তাৎক্ষণিকতা মানুষকে দিয়ে যা খুশী করিয়ে নিতে পারে। তার ভবিষ্যতের সম্ভাবনা যে ধৈর্য, সাধনের অপেক্ষা রাখে, সে সবকে নিঃশব্দে শেষ করে দিতে পারে এই তাৎক্ষণিকতা। সে সব কিছুকে এখনই দেখছে। তার চারপাশে সে একটা জিনিসকেই বড় করে দেখে, লোভ। সোশ্যাল মিডিয়া তাকে অন্তত এটুকু বুঝিয়েছে লোভ একটা সেলিব্রেটেড জিনিস। লোভ ভবিষ্যতের অপেক্ষা করে না, ছিনিয়ে আনে। আত্মম্ভরিতা, আত্মকেন্দ্রিকতা, নার্সিসিজ্‌ম ইত্যাদি সব লোভেরই প্রকারান্তর। আমি যদি লোভের চাবুক স্বীকার না করি তবে পিছিয়ে যাব। তাই পিঠ পেতে সে চাবুক নেব। লোভ রাবণের মত দশ মাথায় চলে। রক্তবীজের মত মাথা চাড়া দেয় একবার মারলেও। লোভের সহায়ক হল তাৎক্ষণিকতা আর দুর্বুদ্ধি। স্বভাব হল অধৈর্য আর বিকার।

৭) বিকার ---

অবসাদ বাড়ছে। যে বয়েস কয়েক প্রজন্ম আগে এইভাবে শব্দটা জানত না, এখন জানে। কী ভয়ংকরভাবে নানারকম মানসিক বিকার বাড়ছে! ওই অল্পবয়সে যারা কাছ থেকে ওদের ডিল করেন তারাই জানেন। বিকৃত যৌনতা থেকে নানাবিধ নেশা -- সব কিছুর দরজা খুলে যাচ্ছে অনেক আগে। আনন্দ কী জানে না। উত্তেজনা আর অবসাদে ডুবে থাকা একটা ধারা হয়ে যাচ্ছে।

এখন এ সব থেকে বেরোনোর উপায় কী? একটাই উপায়, নিজেদের আগে ঠিক করা। মার্জিত জীবনবোধে নিজে না আসতে পারি তবে আমার আশেপাশে আমাকে অনুকরণ করে পরবর্তী প্রজন্ম বড় হবে, তারা বিপদে পড়বেই। তার জন্য দায়ী আমি নিজে। মার্জিত হওয়া বলতে আমি রিজনেবল, সেনসেবল হওয়ার কথা বলছি। সেটাকে যতক্ষণ না কায়েম করতে পারছি নিজের জীবনে, ততক্ষণ আমিও মরীচিকার পেছনে দৌড়াব, প্রজন্মের পর প্রজন্মও দৌড়াবে।

এত ক্ষোভে মাত্র বইয়ের ক'টা পাতাই তো ছিঁড়ে উল্লাস জানিয়েছে। সামনে আরো কিছু হবে। আমাদের তো দেখে যাওয়া ছাড়া আপাতত তেমন কিছু করার নেই।