অনেক না হারালে মানুষ বুঝতে পারে না তার সীমারেখা কতটা। নেগেটিভ মানসিকতা অবশ্যই খারাপ। তবে সিউডো-পজিটিভিজমও কম ক্ষতিকর নয়। ভাগ্যের সঙ্গে কতটা লড়াই করা সম্ভব আর কতটা মেনে নিয়েই চলতে হয় এ হিসাব অনেক না খুইয়ে করা সম্ভব নয়। একটা দিনের গল্প বলি।
সেদিন সকাল থেকে আমার মন নানা পীড়ায় ক্ষুণ্ন। অতীতের হিসাবনিকাশ, এটা হলে ভালো হত, ওটা হলে ভালো হত - এমন নানা চিন্তায়, কল্পনায় মন ভারাক্রান্ত। বুঝতে পারছি এসব সময়ের অপচয় ছাড়া কিছুই নয়, কিন্তু নিজেকে থামানোর সবটুকু ক্ষমতা যেন খুইয়ে বসেছি। চিন্তা যত বাড়ছে ক্ষোভ তত লাফিয়ে লাফিয়ে মনের আনাচেকানাচে ধিকিধিকি আগুন লাগিয়ে যাচ্ছে। যে কোনো মুহূর্তে যেন সেটা দাবানলের আকার ধারণ করতে পারে। শান্তি নেই, স্বস্তি নেই। বিচার করবার যুক্তিও অসহায়। তখন প্রার্থনাই ভরসা, প্রভু রক্ষা করো। আমার নিজের হাত থেকে আমাকে রক্ষা করো।
বাড়িতে সেদিন ইলেক্ট্রিকের কাজের জন্য একজন বয়স্ক মানুষ এলেন। আগেও এসেছেন, কাজ করে গেছেন, ব্যস অতটাই। কিন্তু সেদিন তিনি যেন ঈশ্বরের দূত হয়ে এলেন। কীভাবে? সেই গল্প বলব বলেই তো লেখা।
একটা জীর্ণ হাফহাতা জামা, তেমনই একটা ফুলপ্যান্ট পরনে। কাঁধে মই। চোখে চশমা। শরীর চলতে ফিরতে কাঁপছে। ভাবছি এই অশক্ত শরীরে কাজ করবেন কী করে?
মই বেয়ে উঠতে লাগলেন। আমি ধরলাম মই। উনি বারবার আপত্তি জানাচ্ছেন। বলছেন, ছেড়ে দিন, আমি পড়ে যাব না, ভয় নেই। কিন্তু ভয় তো লাগছেই। মইটা ধরেই থাকলাম। ধীরে ধীরে কাজ করছেন আর গল্প করছেন। অনেক পুরোনো গল্প। কী করে কাজ শুরু করলেন, ধীরে ধীরে শিখলেন সেই সব গল্প। বললেন, জানেন আমার বাবা চুরাশি সালে বোনাসের টাকা দিয়ে প্রথম সিলিং ফ্যান কিনেছিলেন। দামী কোম্পানির। তখন ওরা শুধু একটা রঙের পাখাই বাজারে এনেছে। ঘিয়ে রঙের। সেটা এই দুহাজার ছয়ে গিয়ে খারাপ হল। ভাবেন!
এরকম নানা গল্প চলছে। কোনো তাড়া নেই ওর যেন। কোনো ক্ষোভ নেই। কী প্রশান্ত মুখ। হাসি। দৃষ্টিতে কোনো চাতুরী নেই। যা বলছেন সেটা বলার জন্যেই বলছেন। কিছু বোঝানোর জন্যে না।
কথা যত চলতে লাগল, ওর সঙ্গ যত দীর্ঘ হতে লাগল খেয়াল করলাম মন তত শান্ত হতে শুরু করেছে। কী পদ্ধতিতে হচ্ছে জানি না। কিন্তু হচ্ছে।
কাজ শেষ হল। উনি মই কাঁধে বাইরের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। চটিটা পায়ে গলাতে গলাতে বললেন, জানেন আমারও চাকরি হয়ে যেত। চোখের জন্য আটকে গেলাম। ভাই দাদার হল। তাও হত জানেন। কত বড় বড় নেতাদের সঙ্গে বাবার চেনাজানা ছিল। অমুকের নাম শুনেছেন?
বললাম, শুনেছি।
কত বড় নেতা ছিল বলুন। বাবার কাজের দিন এলেন। আমি পরিবেশন করছি, আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কী করো? আমি বললাম, এরকম ছোটখাটো ইলেক্ট্রিকের কাজ করি। উনি অবাক হয়ে বললেন, চাকরি পাওনি? বেকার! এ বাবা! তোমার কথা তো কোনদিন তোমার বাবা বলেননি। তবে তো…..
ভদ্রলোক থামলেন। কথা বলতে বলতে মইটা পাশে রেখে দাঁড়িয়েছেন। আবার তুলে কাঁধে নিলেন। হাসলেন। সারাদিন তেতেপুড়ে আসা চোখেমুখে ঠাণ্ডা জল ছিটানোর শান্ত হাসি। বললেন, বাবার উপর রাগ করি না। আমার ভাগ্যই এমন। কী করা যাবে।
উনি চলে গেলেন। আমার সকালটা সত্যিকারের সকাল করে দিয়ে। ভারতীয় দর্শনে সুখের প্রতিশ্রুতি নেই। প্রসন্নতার কথা আছে। প্রসন্নতা জীবনকে পিষে জন্মায়, এ মানুষটা আবার প্রমাণ করে গেলেন। মন আমার আবার সুস্থ। শান্ত। ভদ্র। জীবনে ভাগ্যের সঙ্গে কতটা লড়ব আর কতটা সেটা বিনা পরিবর্তনের আশায় গ্রহণ করে নেব, এ সত্যিই ভীষণ জটিল হিসাব। আর এই হিসাবের উপরই আমার অন্তর জীবনের সবটুকু শান্তি নির্ভর করে আছে।
প্রতিদিন পেপার পড়লে অল্প অল্প বয়েস ছেলেমেয়েগুলোর আত্মহত্যার খবর পড়তে হচ্ছে। সে আদৌ সুখকর অবশ্যই নয়। কিন্তু ওই যে শুরুতেই বললাম, নেগেটিভ মানসিকতার মত সিউডো-পজিটিভিজমও সমান ক্ষতিকর। সে কোরিয়ান ড্রামাই হোক, কী মোবাইলের গেম, বিষ ওই আপাত সুখের নেশাতেই ধরে। যার মধ্যে লুকিয়ে মরণফাঁদ।