Skip to main content

 

দুটো খুচরো পয়সা নিয়ে দরজায় দাঁড়ালাম। করতালের ধাতব শব্দ আসছে। এখনি সে এসে দাঁড়াবে। বলবে, ভিক্ষা দাও।

সে এসে দাঁড়ালো। চিনি না। নতুন মুখ। নাকি আগে দেখেছি। যে এসে দাঁড়িয়েছে তার বয়েস হয়েছে। কিন্তু শরীর শক্ত। করতাল বাজিয়ে কৃষ্ণ নাম গাইল। বললাম, খালি পা যে, চটি নেই কেন পায়ে?

আমার চোখের উপর চোখ রেখে বলল, নাম করার সময় পায়ে চটি রাখতে নেই যে।

ফিরে গেল। যেতে যেতে বলল, আমার গুরুদেবের আশ্রমে এসো। মাঝদিয়া।

ভিক্ষা নিয়ে গেল। ভিক্ষা দিয়ে গেল।

মন তুমি কী খেতে ভালোবাসো সব চাইতে বেশি?

মন মুচকি হেসে বলল, কী ন্যাকা গো তুমি। জানো না যেন। তোষামোদ। কী মিষ্টি কী মিষ্টি। যে তোষামোদ করে সে আমার কাছে ঈশ্বরের দূত। আমি চাই ঈশ্বরও আমাকে তোষামোদ করুক। আমার জ্ঞানের, নিষ্ঠার, ভক্তির স্বীকৃতি দিক। আমার জীবনের সব মাধুর্যে সার যোগায় তোষামোদ। সব জানো তো তুমি। দুনিয়ায় এই মুহূর্তে ঘরে বাইরে যুদ্ধের দামামা বেজে যাবে তোষামোদের যোগান বন্ধ হলে।

যখন কেউ নিন্দা করে? মন্দ বলে?

মনের মুখের ভাব বদলে গেল। বলল, থাক। অভিশাপ আমিও দিতে জানি। দিই না সে আলাদা কথা। তুমি কী বলতে ফিরলে আমার দিকে সেই কথা বলো।

বললাম, ওর খালি পা। তবু আনন্দের ভাটা নেই দেখলাম। আমের মুকুলের গন্ধে ভরে যে রাস্তা, সদ্য খুঁড়ে গেছে নর্দমা বানাবে বলে, সেই রাস্তা দিয়ে সে হেঁটে গেল। কৃষ্ণনাম গাইতে গাইতে। কে এই কৃষ্ণ মন? এত এত মানুষকে ঘোরে রেখেছে, না ভরিয়ে রেখেছে যুগ যুগ ধরে? তার বাঁশির এমন কী মধু? কেউ তো গীতার তত্ত্ব বলে না শুনি। ইহকাল পরকালের সুযোগ সুবিধার কথাও গেয়ে বেড়ায় না। তবে পায় কী যে এত গায়?

মন বলল, তুমি চুপ করো। আমি আমার দিকে ফিরে থাকি, তাই থাকি। তুমি বাইরের দিকে তাকাতে বললে আমি দাঁড়াই কোথায়?

বোলের ভারে ঝুঁকে পড়া সামনের আমগাছে কাক বসেছে। একটু দূরে মাছ কাটতে বসেছে সে বাড়ির বউ। কাকের তীক্ষ্ম চোখ মাছের দিকে। মাছের রক্তে লাল হচ্ছে চাতাল। জল পড়ে ফিকে হয়ে যাচ্ছে একটু বাদেই।

সংসারে মানুষের কষ্টের তো শেষ নেই। সীমা নেই। কী যন্ত্রণা এই শরীর মন হৃদয় নিয়ে। এ সবের থেকে তো পার নেই বলো?

কাক বলল, নেই। তুমি এই আমের গাছে কোকিলের ডাক শুনেছ। চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া রাতে প্রেমের তৃষ্ণায় তৃষিত হয়েছ। ভালো লেগেছে। গান গেয়েছো, কবিতা লিখেছো। কিন্তু তারপর? পরেরদিন রোদ যখন চড়তে শুরু করেছে? এই আমগাছের ছায়া যখন এই এতটুকু হয়ে গাছের গোড়ায় লুটিয়ে আছে? উদাস হওনি তুমি? গত রাতের সব কিছু অলীক, অধরা, বোকামি মনে হয়নি? আমার ডাকে বিরক্তি জাগেনি? আমার কর্কশ গলায় সে উদাস স্বর ধরা পড়ে না হয় তো। হয় তো তোমার আমাকে লোভী আর স্বার্থপর মনে হয়। কিন্তু তুমি জানো তোমার মধ্যের উদাসীনতা যখন বিষাদের টকে টকে যায় তখন তুমি নিজের কাছে নিজেই হয়ে ওঠো অসহ্য! আমার স্বরের মত। হয় কিনা?

স্টেশনে ট্রেন ঢুকছে। কিন্তু এ ট্রেন সে ভিখারির নয় যে খালি পায়ে স্টেশনে চায়ের দোকানের সামনে এখন। রোদ চড়েছে। দোল আসছে। আশ্রমে উৎসব। খরচ আছে। আরও ঘুরতে হবে দোরে দোরে। হিসাব কাউকে ছাড়ে না। স্বয়ং গোবিন্দ দিন রাতের হিসাবে, এ অসীম সৃষ্টির অণু পরমাণুর হিসাবে বাঁধা। যাবে কোথায়? হিসাবের ভাষা হিসাব বোঝে, প্রেমের ভাষা প্রেম। দুই নিয়েই সংসার। জপের মালায় হিসাব আছে, আবর্তনের হিসাবও আছে। কিন্তু সেই আবর্তনেই মনের এক একটা ফের কেটে যাওয়াও তো আছে!

চা ভর্তি কাগজের একটা কাপ হাতে নিয়ে, আরেক হাতে বিস্কুট নিয়ে খালি পা প্ল্যাটফর্মের উপর দিয়ে হাঁটছে। টিকিট ঘরের কাছে এসে দাঁড়ালো। কম্বল মুড়ি দিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে শুয়ে একজন। উবু হয়ে বসে ডাকল, কী গো, ওঠো, হরে কৃষ্ণ, ওঠো গো। চা নাও।

এক বৃদ্ধা উঠে বসল। এত আলোয় চোখ কুঁচকে তাকিয়ে দেখল চারদিক। কী দেখবে, সব এক। কোনো কৌতুহল ফুটে নেই মুখের পেশীগুলোতে আর। চা আর বিস্কুট হাতে নিল। বলল, তোমারটা নিয়ে এসো?

আনছি, বলে, চা আর বিস্কুট নিয়ে ফিরে এলো, খালি পায়ের পাতা ভাসিয়ে তপ্ত প্ল্যাটফর্মের উপর দিয়ে সে। বসল।

বৃদ্ধা বলল, আমাকে ঘর থেকে বের করে দিল আর তুমি নিজে বেরিয়ে এলে। কী ভীষণ পার্থক্য, না গোঁসাই? তুমি বুঝলে কী করে এত আগেই যে ঘর থেকে বেরোতে হবে একদিন? আমি তো বার করে দেওয়ার পরও কত বছর বুঝতেই পারিনি যে ওদের আমাকে আর দরকার নেই বলে তাড়িয়েছে। আমি প্রথম প্রথম ভাবতাম, হয় তো আমার কোনো ব্যবহারে ওদের খারাপ লেগেছে, তাই তাড়িয়েছে। তা তো নয় গোঁসাই। আমি গোটা মানুষটাই বাড়তি হয়ে গিয়েছিলাম। কী মূর্খ ছিলাম গোঁসাই!

চোখের কোল গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। ও কী অশ্রু গোঁসাই? আনন্দাশ্রু, না ব্যথাশ্রু গো?

গোঁসাই বৃদ্ধাকে বলল, ঘরে গোবিন্দ ধাক্কা খাচ্ছিল চলতে ফিরতে। সে হাত ধরে বলল, পথে চলো, এ ঘরে ধাক্কা খেতে খেতে আমার সর্বাঙ্গে ব্যথা হয়ে গেল গো। ব্যস, বের হয়ে এলাম। ভুগতে যখন হবেই তখন প্রেমের সঙ্গে ভুগি। ঘরের অপমানের চাইতে বাইরের অনেকগুণ ভালো, কী বলো?

দুজনেই হাসতে হাসতে চোখের জলে ভাসছে। এ কী অশ্রু গোঁসাই?

এ কৃষ্ণাশ্রু। প্ল্যাটফর্মের উপর পড়ে থাকা, পায়ে দলে যাওয়া, রোদে শুকিয়ে যাওয়া গোলাপ বলল।

Category