মঈনুদ্দিন চিস্তি যৌবনের প্রথমে এক ফকিরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, জীবন মানে কি শুধুই এই ধ্বংস, মৃত্যু, বিদ্বেষ, হানাহানি?
ফকির উত্তর দিয়েছিলেন, না।
মঈনুদ্দিন জিজ্ঞাসা করলেন, তবে?
ফকির হাসলেন। বললেন, এই ‘তবে’ এর উত্তরটা তোমাকে নিজেকেই খুঁজে বার করতে হবে। সবাইকেই তাই করতে হয়।
মঈনুদ্দিন জিজ্ঞাসা করলেন, খুঁজব কোথায়?
ফকির মঈনুদ্দিনের বুকে আঙুল ঠেকিয়ে বললেন, এই… এইখানে। এখানে ভালোবাসা আর আলোর ফোয়ারা আছে। মুখটা খুঁজে বার করো।
মঈনুদ্দিন হলেন গরীবের আশ্রয়। আজও আজমীর শরীফে লক্ষ লক্ষ মানুষ ধর্ম নির্বিশেষে যাচ্ছেন। শান্তির জন্য। আলোর জন্য। আশ্রয়ের জন্য। জীবনের উপর আস্থা ফিরে পাওয়ার জন্য।
====== ========
দক্ষিণেশ্বরের সেই ঘরটায় প্রদীপ জ্বলছে টিমটিম করে। রাত গভীর। একজন মানুষ, যাকে আশেপাশে বেশিরভাগ মানুষ পাগল বলে জানে, সে চোখটা বন্ধ করে চুপ করে বসে। মাঝে মাঝে “মা” বলছে। চোখের কোণা বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে।
ভাগ্য তাকে গ্রাম থেকে শহরে এনে ফেলেছে। আনলেই বা। সব শূন্য শূন্য লাগে। গলা চিরে ডাকে - মা মা। মাটিতে মুখ ঘষে। পাগলের পাগলামিতে কেউ বাধা দেয় না। বরং লোকে মজা পায়। হাসে।
আচমকা সব বদলে গেল। মানুষটা মজে গেল। কী রসে? রাস্তা হারানো মানুষ ভিড় করতে লাগল। রাতদিন গান, নাচ, কথা। এত মানুষকে কে খবর দিল? কেউ জানল না। কিন্তু তারা জেনে গেল। যেন গোপন ডাকহরকরা খুঁজে খুঁজে চিঠি বিলি করে এসেছে। সেদিন যেমন মঈনুদ্দিন চিস্তির খোঁজ নিয়ে ডাকহরকরা বেরিয়েছিল গোটা ভারত জুড়ে।
====== ========
আজমীর শরীফ থেকে দক্ষিণেশ্বরের রাস্তাটা দীর্ঘ। সুর এক। বাদ্যযন্ত্র আলাদা। সুর কী? “আমি আমি না, তুমি তুমি।” এই সুর।
নিজামুদ্দিনকে দেখে আমীর খুসরু গাইলেন, আমাকে তুমি ‘সুহাগন’ করলে। নরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বললেন, love personified. এক অদ্ভুত ভালোবাসার উপাখ্যান লেখা হল ইতিহাসের দলিলে। নিজামুদ্দিনের সঙ্গে আমীর খুসরু আর ঠাকুরের সঙ্গে স্বামীজির।
নিজামুদ্দিনকে শিষ্য জিজ্ঞাসা করছেন, ভালোবাসা কাকে বলে?
নিজামুদ্দিন বসেছিলেন। উঠে পায়চারি শুরু করলেন। কাকে বলে ভালোবাসা? পুঁথিতে তো অনেক কিছু লেখা আছে। আসলে কাকে বলে? কী করে বোঝাবো?
নিজামুদ্দিন হঠাৎ দাঁড়ালেন। শিষ্যের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি আমি হয়ে যাও, বুঝবে ভালোবাসা কাকে বলে।
ঠাকুর বলছেন, কখনও ঈশ্বর বড় চুম্বক, তুমি ছোটো চুম্বক। কিন্তু উল্টোটাও হয়। তুমি হলে বড় চুম্বক। ঈশ্বরকে আকর্ষণ করে আনলে।
এ হয়?
ভালোবাসায় সব হয়।
নিজামুদ্দিনের কোনো কারণে মন খারাপ। খুসরু-র ভালো লাগল না। নিজামুদ্দিনকে বিষণ্ণ দেখতে পারেন না। কিন্তু কী করবেন?
খুসরু রাস্তায় ঘুরছেন। হঠাৎ চোখে পড়ল একদল মেয়ে হলুদ শাড়ি পরে, হলুদ ফুল মাথায় গেঁথে আনন্দ করতে করতে যাচ্ছে।
নিজামুদ্দিন জিজ্ঞাসা করলেন, আজ কীসের উৎসব গো?
তারা বলল, আজ বসন্ত পঞ্চমী যে…..
নিজামুদ্দিনের মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। তিনি লিখে ফেললেন, “সকল বন ফুল রহি সরসো…সকল বন….. নিজামুদ্দিনকে দরওয়াজে পর আওন কহে গেয়ি আশিক রঙ….”
শুধু কী গান? আমীর খুসরু আরো কয়েকজনকে নিয়ে হলুদ শাড়িতে নিজেকে জড়িয়ে নিজামুদ্দিনের সামনে কী অদ্ভুত নৃত্যে মেতে উঠলেন। নিজামুদ্দিনের মুখে হাসি ফুটল।
ঠাকুর স্বামীজির চোখের দিকে তাকিয়ে ছলছল নয়নে গাইছেন, কথা কহিতে ডরাই, না কহিতেও ডরাই, পাছে তোমা ধনে হারাই…. হা রাই….
প্রেমধন কী আর বাজারে মেলে? চন্দন বাটতে বাটতে হাতে চন্দনের গন্ধ লাগে। “জো প্রেম গলিমে আয়া নেহি, উয়ো প্রীতমকা ঠিকানা কেয়া জানে….”
এ লেখার উপসংহার তো হয় না। বিষয় মানুষকে ইহলোকের স্বার্থে অন্ধ করে, তথাকথিত ধর্ম মানুষকে আরো গভীর স্বার্থে জড়িয়ে পরলোকের লোভে অন্ধ করে। দুই-ই বড় ঘোর। দরজা খোলে পাগল। আউলিয়া। মধুময় হয় জীবন। অন্তরের খোঁজ মানে তাই, পাগলের খোঁজ। আসল শান্ত দুনিয়ায় সে-ই।