Skip to main content

 

111.jpg

 

জীবন তো বিনুনির মত। দুই ধারা একে অপরকে জড়িয়ে পেঁচিয়ে। অন্তর্লোকের ভাবের ধারা আর ইন্দ্রিয়জগতের বস্তুজগতের ধারা। ওই যে গোপেশ্বর শিব। রাত কত হল? প্রায় দশটা। ওই যে তরুণযুগল উদাত্তকণ্ঠে শিবস্তোত্র গেয়ে চলেছেন, সে পরমার্থিকের প্রতি পরমার্তি ছাড়া কী? পরম কে? যে সাধারণকে ছাপিয়ে সে? ভুল। যে সব ক্ষুদ্রতুচ্ছ, মহৎকে এক ডোরে বেঁধে আপন, সে-ই পরম। এ ক্ষুদ্র মন্দ বুদ্ধি নিয়ে বৃন্দাবন নিয়ে লিখতে সঙ্কোচ হয়। যে মধু পাড়তে ওঠে, তাকে মৌমাছির দংশন সহ্য করতেই হয়। কিন্তু মধু না আনতে পেরে যদি শুধু দংশনের জ্বালাই দিই, তবে? তবু না লিখেই যা যা-ই কই। স্বভাব বলে তো একটা জিনিস আছেই না! একদিনের ভোরের গল্প দিয়ে শুরু করি।

তখনও আলো ফোটেনি। ভীষণ ঠাণ্ডা। বৃন্দাবনে পৌষের ঠাণ্ডা যারা অনুভব করেছেন তারাই জানেন কী ভীষণ সে ঠাণ্ডা!

পাঁচটা সবে বেজেছে। ভীষণ কুয়াশা। সব অচেনা লাগছে। রাস্তার আলোগুলোর সঙ্গে কুয়াশা মিশে এক অদ্ভুত পরিবেশ। যমুনার পাশ দিয়ে পরিক্রমা মার্গ, কদাচিৎ একজন কি কয়েকজন মৃদু গলায় “রাধে রাধে” গাইতে গাইতে খঞ্জনি বাজিয়ে যাচ্ছেন।

একজন সন্ন্যাসী এলেন কুয়াশা ভেদ করে। কেসিঘাটের কাছে। তখন কেসিঘাটে একটা-দুটো চায়ের দোকান খুলে সাজাচ্ছে। সন্ন্যাসী পরিক্রমা করছেন। আমাদের দিকে হাত তুলে বললেন, "সীতারাম… সীতারাম!"

কী মনে হল, হাঁটতে শুরু করলাম ওঁর পিছন পিছন। উনি হাঁটতে হাঁটতে গান গাইছেন। হিন্দি দেহাতি ভজন কোনো। যেই সামনে এসে পড়ছে তাকেই বলছেন, রাধে রাধে… কি, সীতারাম… সীতারাম.। হাঁটতে হাঁটতে সন্ন্যাসী, গৃহীরা প্রত্যুত্তর দিচ্ছেন --- রাধে রাধে... সীতারাম সীতারাম। আবার রাস্তার ধারে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা মানুষগুলোও বলে উঠছেন, রাধে রাধে।

সন্ন্যাসী হাঁটছেন যমুনার ধার দিয়ে। আমরা পিছনে আছি খেয়াল করেছেন? জানি না। হাঁটিই না। দেখাই যাক না কোথায় যাচ্ছেন। একটা-দুটো ঘন অন্ধকার বাঁকে দু'একবার ভীতু মন ভ্রুকুটি করল। মনকে বললাম, মর গে তুই ভয়ে, আমি তো যাবই।

একটা জায়গায় কিছু মানুষ বসে আগুন পোহাচ্ছেন। উনি হঠাৎ পিছন ফিরে হিন্দিতে বললেন, আগুনে হাতটা সেঁকে নাও… গরম করে নাও….

তার মানে উনি জানেন আমরা ওঁর সঙ্গ নিয়েছি। আমাদের অনাহূত, অবাঞ্ছিত উপদ্রব বলে তাড়াবেন না তবে।

আমি বললাম, আপনি?

উনি হেসে বললেন, আমার তো অভ্যাস আছে ভাই এই ঠাণ্ডার…..

আবার শুরু হল হাঁটা। আচমকা দাঁড়িয়ে পড়লেন। বললেন, চলো।

একটা মন্দির থেকে কীর্তনের আওয়াজ ভেসে আসছে। বেশ বড় মন্দির। ভিতরে ঢুকে আশ্চর্য হলাম। মহিলারা গর্ভগৃহের সর্বাগ্রে বসে। তাঁরা কোনো একটা পদ গাইছেন। তাঁদের অনুসরণ করে সন্ন্যাসীরা গাইছেন পিছনের সারিতে বসে।

বাইরে তখনও আলো ফোটেনি। সন্ন্যাসী বলছেন, এই হল সেই জায়গা, যেখানে রাস হয়েছিল। এ হল রাধাবল্লভ সম্প্রদায়ের মন্দির।

এতক্ষণ মন্দিরের গর্ভগৃহে পর্দা দেওয়া ছিল। এইবার পর্দা সরল। আরতি শুরু হল। সবাই দাঁড়িয়ে। পাশাপাশি দুই সারিতে দাঁড়িয়ে সন্ন্যাসী, গৃহী, পুরুষ, নারী সবাই। কোনো ভেদাভেদ নেই। গানের পর গান হচ্ছে ব্রজভাষায়। হরিবংশের লেখা পদ হবে হয় তো। গানের মূল আকূতি শ্রীরাধার কাছে, সুখে-দুঃখে, সম্পদে-বিপদে শ্রীরাধিকা যেন সঙ্গে থাকেন, যেন এই ব্রজভূমি ছেড়ে কোথাও না যেতে হয়। মন্দিরের বিগ্রহ শ্রীরাধিকা। রাধারাণী। সন্ন্যাসী দুই ছলছল চোখে গাইছেন। আত্মমগ্ন। গৃহীকেও প্রণাম করতে দুইহাত জোড় করে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে এই প্রথম দেখলাম।

======

112.jpg

হালকা আলো ফুটেছে। সন্ন্যাসী বললেন, নিধিবন যাই চলো।

ভোরের আলোয় নিধিবনে এসে দাঁড়ালাম। সন্ত হরিদাসের সঙ্গপূত স্থল। কবি ছিলেন। গায়ক ছিলেন। রাগ ভৈঁরোতে স্তব গাইছেন একদল মানুষ বসে বসে। ধ্রুপদাঙ্গে গাওয়া হচ্ছে। এও শ্রীরাধিকার স্তব। প্রার্থনা। মন থেকে সব বাসনা মিটিয়ে ব্রজভূমির আনন্দে ডুবে যাওয়ার সাধ।

রাস্তায় নামলাম আবার। চা তৃষ্ণা জেগেছে। চায়ের দোকান দেখেই জেগেছে। উল্টোদিকে রাধাদামোদর মন্দির। এইখান থেকেই উনি বিদায় জানাবেন। কথা হয়েছে। কিন্তু চা খেলে হয় না?

উনি বললেন, তোমরা খাও। আমি তো খাই না।

আমি বললাম, তবে থাক।

উনি তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বললেন, সেকি! না না, বেশ বেশ আমিও খাই….শীতের দিনে একটু চা খেলে কিচ্ছু হয় না।

আমরা চা খাচ্ছি। বাইকে করে একজন এসে দাঁড়ালো। বেশ কেউকেটা ভাব। বলল, তা আপনি যাচ্ছেন তো মহাকুম্ভে? যা আয়োজন হয়েছে। আরে আপনাদের জন্যেই তো সব! যান যান। যা উপার্জন হবে চার বছর বসে খাবেন।

সন্ন্যাসী হেসে বললেন, রাধারাণীর পায়ের কাছে পড়ে আছি…পরমানন্দে রেখেছেন….আবার কোথায় যাই……বৃন্দাবনমে পগ পগমে প্রয়াগ যাঁহা!....

সন্ন্যাসীর সঙ্গে পরিক্রমা শেষ হল রাধা

দামোদর মন্দিরে এসে। মহাপ্রভু'র অন্তরঙ্গ পার্ষদ রূপ গোস্বামীর সাধনস্থল। এখানেই চৈতন্যচরিতামৃতের লেখক কৃষ্ণদাস কবিরাজের সমাধি।

সন্ন্যাসীকে বিদায় জানালেন। হাতদুটো ধরে বললেন, আনন্দে থাকো। খুব আনন্দে থাকো। বৃন্দাবনে ঘোরো। খুব ঘোরো। খুব মজায় থাকো। মশগুল হয়ে থাকো।

113.jpg

যমুনার ঘাটের দিকে হাঁটছি। বৃন্দাবন ধ্যানের জায়গা না। পদব্রজে ব্রজের ধুলিতে মাখামাখি হওয়ার জায়গা। ধুলোয় মিশে যেতে হবে। যে আশ্রমে প্রসাদ পেতে বসলাম, সে আশ্রমের মোহান্ত একই আসনে বসে প্রসাদ পান। একই অন্নব্যঞ্জন। পরিবেশন করে সাধুরা। জাতপাত জিজ্ঞাসা করেন না। এখানে কেউ জাত জিজ্ঞাসা করে না প্রসাদ দেওয়ার আগে।

115.jpg

রাস্তায় পড়ল মীরার ভজনস্থল। ঢুকলাম। বহু পুরনো জীর্ণ বাড়ি। সেটাই স্বাভাবিক। কিছুক্ষণ বসলাম। সুরের তো ইতিহাস হয় না। নীরব বীণার কোনো ভাষ্য হয় না। মীরা মানে একটা ব্যথা। কী যেন সে-ই ব্যথা। মীরা, আমি এখানে বসেছি। লজ্জায়। সঙ্কোচে। এত ক্ষোভ, অতৃপ্তি নিয়ে মাধুর্যের নাগাল কি পাওয়া যায়। সারা বছর কাঙালের মত অষ্টপ্রহর সহস্র হাত পেতে আছি সংসারের দিকে। শিব-সুন্দরকে দেখার সময় কই? আমার শুধু দাও দাও। চাই চাই। ওর আছে, তবে আমার নেই কেন? মীরা, আমার জীবনে শান্তি কই? আমি এক মুহূর্ত আমাকে তিষ্ঠতে দিই না। সব সমর্পণ করি, সে ইচ্ছা কোথায়? “আমার যা আছে, আমি সকল দিতে পারিনি তোমারে নাথ। আমার লাজ ভয়, আমার মান অপমান, সুখদুখ ভাবনা……যাহা রেখেছি তাহে কী সুখ…তাহে কেঁদে মরি, তাহে ভেবে মরি”।

116.jpg

যমুনার তীরে এলাম। কুয়াশা আর কুয়াশা। জল আকাশ করে দিয়েছে কুয়াশা বিদেশী পাখিদের ভিড়। সন্ন্যাসী বলেছিলেন, কিছু চেয়ে নিতে নিধুবনে। কী চাইব? চিত্ত ভিখারির সাজ কবে ছাড়বে? সুরের কাছে কী চাওয়া যায়? সুরকে সুর হিসাবে চেনাই সুরের কৃপা। সে সুরকে শুনছি অলিতে-গলিতে। সব অভাব-অভিযোগ কবে কার দূর হয়? সব ইচ্ছা, সব তৃষ্ণা, সব বাসনা কার পূরণ হয়? একদিন “সকল চাওয়ার বাহির দেশে” আসার আকুতি জন্মায়। সে-ই কি অভিসার? সে অভিসার হবে কবে?

117.jpg

======

ফেরার ট্রেনে সে উত্তর পেলাম। একই কোচে পঁচিশ-তিরিশজন নরনারী আসছেন 'গঙ্গাসাগর স্নানে'। কয়েকজন মুসলিম তরুণ ফিরছেন আজমীর শরিফের 'উরুস' উৎসব থেকে। আমরা ফিরছি বৃন্দাবন থেকে। ওদিকে ওরা দেহাতি ভাষায় গাইছেন শ্রীকৃষ্ণ আর রাধিকার পদ, অম্বাস্তোত্র। গাইতে গাইতে ওইটুকু পরিসরেই মহিলারা নাচছেন। এরই মধ্যে এক মুসলিম পরিবার তাদের কূপটায় চাদর আটকে কৃত্রিম অন্দরমহল বানিয়ে নিয়েছেন। আর আজমীর ফেরত তরুণ প্রজন্ম সুফীগানে মশগুল। বলল, আমরা দরগাতেই যাই। সেখানে সবাই যায়। সব ধর্মের লোক যায়। যেখানে মহব্বত নেই, যেখানে ইনসানিয়াত নেই, সেখানে আল্লাহও নেই। সুফী মুহব্বত শেখায়। আমাদের সে-ই ধর্ম। গল্প শুরু হল নিজামুদ্দিন, আমীর খসরু, মইনুদ্দিন চিশতী'কে নিয়ে। সে প্রসঙ্গে এল নানক, কবীর, মীরা, রবীন্দ্রনাথ...

গোটা কূপ জুড়ে এক অদ্ভুত সিম্ফনি বাজছে যেন। ভারতের নিজস্ব সিম্ফনি। বিরক্তি নেই, রাগারাগি নেই, অসন্তোষ নেই। বৃদ্ধ পাঞ্জাবি দম্পতি লোয়ার বার্থে শুয়ে শুয়ে গানে তাল দিচ্ছেন। চোখে চোখ পড়লে হাসছেন। ট্রেন চলেছে কলকাতার দিকে। যমুনা না, গঙ্গার দিকে। যে গঙ্গার ধারে ক'দিন আগে একজন মানুষ নানা পথ দিয়ে মানুষের চিত্তগুহায় প্রবেশ করে বলেছিলেন, একজনই আছে। পথ নানা। গন্তব্য এক।

হাওড়ার চোদ্দো নাম্বার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ালো ট্রেন। বৃন্দাবনের ধুলো, আজমীর শরীফের ধুলো, স্বর্ণমন্দিরের ধুলো, আরো নানা অজানা তীর্থের ধুলোয় ধুলোয় মিশছে হাওড়া স্টেশান। কোনো প্রান্তে যেন ঠাকুর দাঁড়িয়ে, হাসছেন। তৃপ্তির হাসি। সব পথ ভেঙে রাজপথ গড়ার কথা বলছেন না। নানা পথের সঙ্গমস্থলে এসে দাঁড়িয়ে আছেন, ডেকে নেবেন বলে। বলবেন, দেখলি তো, সব একজনকেই চাচ্ছে। এক চেতনারই নানা নাম। সে চৈতন্যে কবে জাগবি রে তোরা!

114.jpg

(ছবি একটিও আমার তোলা না। সব বন্ধুদের তোলা।)

[14 January 2025]

119.jpg

Category