“সত্যের আদর্শ নিয়ে চলো।”
একটা কুকুর লেজ নেড়ে এসে বসল। সন্ন্যাসী তাকিয়েও তাকালেন না। চোখটা বন্ধ করে বললেন, সত্যে থাকলে ঈশ্বরের কোলে বসে থাকবে। পরমহংসদেব বলেছেন। জানোই তো।
সন্ন্যাসীর সামনে গৃহী, সংসারী, কৃতদার, অকৃতদার সামাজিক মানুষের সারি। বেশিরভাগই অবসরপ্রাপ্ত। কেউ-ই এখানে আইনগতভাবে চোর-ডাকাত ঠগবাজ সাব্যস্ত হয়নি আজীবন। আর হওয়ার বয়েসও নেই। সৎ থাকার গর্ব, সৎ থেকে যাওয়ার সাহসহীন অসাহয়ত্বের গ্লানি এসব নিয়ে তারা বসে। ঈশ্বর সৎ মানুষ ভালোবাসেন, এই শুনতে শুনতে অনেকেরই চোখ জুড়িয়ে আসছে। খানিক আগেই দুপুরে ভরপেট প্রসাদ পাওয়া হয়েছে। এখন এই বাণীর স্রোত….গালমন্দ না, সমালোচনা নিন্দা না শুধুই বাণী। ঘুম এসে যাচ্ছে আরামে।
“তোমরা যদি সত্যকে ধরে থাকো ঈশ্বরকে ধরে আছো জানবে”।
সত্যের কারাগারে আটকে জীবন কেটেছে। ভয়ে। সবার না। অনেকেই কৌশলে সত্যকে সত্য সত্যই নিজের স্বার্থের সত্যের অনুরূপ বানিয়ে নেওয়ার বুদ্ধি ধরে। তারা পেরেওছে। সেটুকু বুদ্ধি থাকা গর্বের বিষয়। ধুরন্ধর বুদ্ধি। ঈশ্বর উজাড় করে জীবনযাত্রা সহজ করে দিয়েছেন। যেটুকু ফাঁকি সমাজের আইনশৃঙ্খলায় দেওয়া হয়েছে তা প্রণামীর বাক্সে, তীর্থে হিসাব মিলিয়ে দেওয়া গেছে। আর গেছে বলেই জীবনে না কমেছে সুখের আমেজ, না কমেছে খাতির-তোয়াজের বহর। সব মিলেছে। ঈশ্বর বুদ্ধিমান মানুষ সৃষ্টি করে গর্বিত। কিছু সেন্টিমেন্টাল সৎ-বাতিক ক্রিয়েচার দিয়ে জগতের কলকাঠি চালান না। চালালে জঙ্গল থেকে এই অবধি মানুষ আসত? জড়জগতকে আর পশু আর মানুষের জগতকে বোকা বানিয়ে বানিয়েই মানুষ আজ এখানে।
“সত্য ঈশ্বরের আরেক নাম”
সন্ন্যাসী বলে চললেন। বাচিক সত্য, ভাবনার সত্য আর সত্যের সত্যে যে কোনখানে মেলে তা আজও কেউ ঠিক করতে পারেনি। ঈশ্বর সত্যস্বরূপ। কিন্তু সেই ঈশ্বরের কত প্রকার, কত দাবী, কত পরম্পরা। ঈশ্বর সম্প্রদায় অনুসারী। সত্য সম্প্রদায় অনুগামী। ধর্ম সম্প্রদায় অনুগামী। বিশ্বজনীন সত্য কী? সেকি সাম্প্রদায়িক সত্যের পরোয়া করে? মানুষ কি কোনোদিন অসাম্প্রদায়িক হতে পারে? সীমাহীন সত্য বলে কিছু হয়? যার দেশ-কাল-পাত্রের গণ্ডী নেই? সেখানে পৌঁছালে মানুষ কি আর মানুষ থাকে? সে তো শূন্যের দরবার। সব সত্যই তো জ্ঞানানুগামী। এক শূন্যকেই শূন্য হলে জানা যায়।
সন্ন্যাসী চোখ খুলে তাকালেন। তিনি নিজেকে সৎ বলেন না। আবার অসৎ-ও বলেন না। নিজের সীমাবদ্ধতা, অপারগতা কিছুকেই অস্বীকার করেন না, আবার গর্ববোধও করেন না। সহনশীলতা অভ্যাস করেন। সেও সবটা হয়ে ওঠে কোথায়?
সবাই একে একে বেরিয়ে গেল। সব বাণী কালীপুজোর ভোরে মৃত শ্যামাপোকার মত জড় হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে। ও বাণী শুধুই প্রতিধ্বনি। ওতে প্রাণ নেই। শক্তি নেই। উপলব্ধি নেই।
অন্ধকার ঘরে সন্ন্যাসী একা জেগে বসে। সত্য অসত্য ভ্রান্তি সব জেগে আছে। কিন্তু এসবকে নিয়ে জেগে আছে কে, তুমি কে?
রাতের অন্ধকার মায়ের মত নীড় পেতে বসে। অযুত নিযুত তারা নিয়ে অসীম সময় গড়িয়ে যাচ্ছে সান্ত থেকে অনন্তে। এক বিন্দু প্রাণ…. কীসের হিসাব পাবি? মাথাটা নীচু করে দাঁড়া…. দাঁড়া….. নিজের লক্ষাধিক অক্ষমতাকে যে জানে, তাকে বল, বৃষ্টির জলের মত মাটিতে পড়েছি….. আর কিছু জানি না….. যেদিকে নিয়ে যাবে, যাব….. হে মহাশূন্য…. সব শূন্যতাকে পূর্ণ করো আমার…..।