কাবেরী ঘুমাচ্ছে দেখে দোতলায় স্নানের ঘরে চলে এলাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ভাবছিলাম কাবেরী ঘুম থেকে উঠলে নেটফ্লিক্সে কী কী সিনেমা দেখা যেতে পারে। কাবেরীর শরীরটা ক'দিন ধরে ভালো যাচ্ছে না। আমার ছুটি নেয়াটাও আজকে অনেকটা সেই জন্যেই। এসব ভাবতে ভাবতে বাথরুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে হাফ প্যান্টটা খুলতে যাব, হঠাৎ একটা তিন চার বছরের বাচ্চা মেয়ে দরজা ভেদ করে বাথরুমের মধ্যে ঢুকে এল। আমি চমকে দেওয়ালের দিকে পিছিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম কে তুমি?
মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে বলল আমার নাম সুজুকা। আমরা এই ফ্ল্যাটেই থাকতাম। এই ফ্ল্যাটেই আমি মারা গিয়েছিলাম। বলতে বলতে মেয়েটা কমোডের উপর উঠে বসলো। পা দোলাতে দোলাতে বলতে লাগলো, তোমার বউ তো প্রেগন্যান্ট, তুমি বলো না আমি তোমাদের বাচ্চা হয়ে আসি।
আমি বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে বললাম, কিন্তু কেন?
বাচ্চাটা বলল আমার জন্মাতে আবার খুব ইচ্ছে করে। তুমি নারায়ণপুরে যাও, ওখানে একজন তান্ত্রিক আছে যার নাম সুজবান্দার, তাকে গিয়ে সব বলো। বলো যে আমি পাঠিয়েছি। সে সব ব্যবস্থা করে দেবে।
আমি বললাম, কিন্তু কেন শুনতে যাব আমি.... আর কাবেরীকেও তো জিজ্ঞাসা করতে হবে...ও যদি না চায়....
মেয়েটার চোখ মুখ বদলে গেল। বলল, কাবেরী "না" করলে, কাবেরী আর বাঁচবে না।
======
ভূপাল শহরে আমি নতুন। ক'মাস হলো এখানে কলেজে জয়েন করেছি। ঘটনাটা ঘটার কয়েকদিন পর আমি বাচ্চাটাকে আমার চারপাশে যখন তখন দেখতে শুরু করলাম। বাসে উঠছি, ও বাসের কোনো একটা সিটে বসে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ক্লাস রুমে এলাম, ও ক্লাসের শেষের দিকে বসে, তাকিয়ে আছে। আমার জন্য রান্নাঘরে, ছাদে, মন্দিরের দরজার সামনে সর্বত্র ও যেন অপেক্ষা করছে। এদিকে কাবেরীর শরীরটা ধীরে ধীরে খারাপ হচ্ছে। কী করবো কিছু বুঝতে পারছিনা। তবে সুজুকা যা বলেছে সে কথাটা সত্যি। এই ফ্ল্যাটে আজ থেকে ৩০ বছর আগে একটা জাপানি পরিবার এসেছিল। আগুনে পুড়ে পুরো পরিবারটা মারা যায়। আগুনটা কোথা থেকে লেগেছিল সেটা এখনো জানা যায়নি।
একদিন নারায়নপুর খুঁজতে খুঁজতে বার করলাম। আমাদের মহল্লা থেকে আধঘন্টা দূরে। তান্ত্রিককে খুঁজে পেতে অসুবিধা হল না। তবে আমি ওর জড়ানো উচ্চারণে বুঝতে পারিনি, তান্ত্রিকের নাম সুরবিন্দার। দোতলা বাড়ি। সামনে বাগান। আমি যেতেই দারোয়ান জিজ্ঞাসা করল কাকে চাই? আমি বললাম। আমাকে বসার ঘরে বসতে বলে উপরে চলে গেল। একটু পরে খালি গা বয়স্ক একজন ভদ্রলোক নেমে এলো, সাদা সিল্কের ধুতি কোমরে জড়ানো।
আমি দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে কিছু বলতে যাব, উনি বললেন, আমি জানি জানি আপনি কেন এসেছেন, বসুন।
আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। ভয়ংকর চোখ দুটোর দৃষ্টিতে মনে হল আমার সর্বাঙ্গ পুড়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর বললেন, তুমি অভিশপ্ত।
আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। ঘামছি। কাঁপছি। আমি বুঝতে পারছিলাম আমি এমন একটা অন্ধকারে ঢুকে গেছি যেখান থেকে কেউ আমাকে বার করতে পারবে না। এমনকি তান্ত্রিকও না।
আমি বললাম, কাবেরী কি মরে যাবে?
তান্ত্রিক বললো সেটা নির্ভর করছে তোমার উপর।
বললাম, আমি রাজি, সুজুকা আসুক ওর পেটে।
কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। একটু পরে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আমাকে কি করতে হবে?
তান্ত্রিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, মেয়েটা যে আর কত পরিবার শেষ করবে জানিনা। তোমাকে কিছুই করতে হবে না, কিন্তু খুব খারাপ পরিণতির জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখো। হয়তো তোমরা দুজনেই বাঁচবে না। এভাবে কথা বলার জন্য আমি দুঃখিত। কিন্তু তোমাদের হাতে সময় বেশি নেই।
=======
কাবেরী প্রেগন্যান্ট হলো। এ সম্ভাবনার কথাটা সুজুকা আগেই জেনেছিল কী করে ভাবতে ভাবতে কোনো দিশা পেলাম না। কাবেরী ভীষণ খুশি। এর মাঝখানে সুজুকাকে আর দেখিনি। তিন মাসের উপর হয়ে গেল। কিন্তু সমস্যা দেখা দিলে চার মাসের পর থেকে। ডাক্তার ইউএসজি করে আমাকে আলাদা ঘরে ডেকে পাঠালেন। বললেন আমার এই আঠাশ বছরের ক্যারিয়ারে আমি এরকম ইউএসজি দেখিনি। বাচ্চাটা অস্বাভাবিক ভাবে বাড়ছে। আমার মনে হয় আপনি অ্যাবরশন করিয়ে নিন। আমি উপরে কথা বলছি।
কথাটা শুনে আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল। তবে কি সত্যি কাবেরী মারা যেতে চলেছে? কাবেরী মারা গেলে আমিও বাঁচবো না।
আমি কী বলবো বুঝতে না পেরে ডাক্তারের মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকলাম। ডাক্তার আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন এখনই আবরশান করলে ভয়ের কিছু নেই।
সেদিন রাত্রে আশ্চর্য ঘটনা ঘটলো। রাতে দুটোর সময় ঘুম ভাঙলো। দেখি কাবেরীর পেটের উপরে সুজুকা বসে, ওর সারা মুখ রক্ত। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, যদি আমাকে মারিস, একেও এক রাত্তিরে শেষ করে দেবো। ভুল করিস না। আমাকে জন্মাতে দে। আমি সব ঠিক করে দেবো।
========
আমি ডাক্তার, হসপিটাল দুই-ই চেঞ্জ করলাম। কিন্তু সবারই একই রায়। কাবেরীর দিকে তাকানো যাচ্ছে না। পেটটা এত বড় হয়ে ফুলে যাচ্ছে যে কাবেরী বাইরে বেরোনো বন্ধ করে দিল প্রায়। রাস্তায় যেতে যে দু একজনের চোখে পড়েছে তারা জিজ্ঞাসা করেছে খুব শিগগিরই ডেলিভারি তো? অথচ এটা চার মাস।
একদিন আমি আর কাবেরী ঝুল বারান্দায় বসে আছি। হঠাৎ কাবেরী শিস দিয়ে একটা অদ্ভুত সুর করতে লাগলো যে সুর আমি আগে শুনিনি। কাবেরীর চোখ মুখের অভিব্যক্তিও ভীষণ অন্যরকম। আমি মোবাইল রেকর্ডারটা অন করে দিলাম। বিকেলে তান্ত্রিকের বাড়ি গেলাম। তান্ত্রিক বাড়ি ছিল না, তবে দারোয়ানকে বলে গিয়েছিল আমি আসলে যেন খবর দেওয়া হয় তাকে।
একটু পরে এলেন। আমি রেকর্ডটা চালিয়ে দিলে আমার সামনে উনি চুপ করে বসে শুনলেন। তারপর সটান দাঁড়িয়ে বললেন, চলো তোমার বাড়ি যাই। এবার শেষ চেষ্টা করে দেখি।
=====
তান্ত্রিকের বাড়ি থেকে আমার বাড়ি আসতে আধ ঘন্টা লাগে গাড়িতে। আমাদের লাগল পাক্কা আড়াই ঘন্টা। চাকা লিক হল। দু'বার তো মুখোমুখি অ্যাক্সিডেন্ট হতে গিয়ে বাঁচলাম। তান্ত্রিক বলল সব ইচ্ছাকৃত ঘটানো হচ্ছে। বুঝতে পেরেছে আমি আসছি। তুমি শান্ত থাকো। যাই ঘটুক না কেন, যাই চোখের সামনে দেখো, নিজেকে শান্ত রাখবে।
ফ্ল্যাটের দরজা খোলা। আশ্চর্য লাগল। ফ্ল্যাটের দরজা তো কোনোদিন খোলা রাখে না কাবেরী। ফ্ল্যাট তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখলাম কাবেরী কোথাতেও নেই। তান্ত্রিক চোখ বন্ধ করে হাত দুটো মাথার কাছে রেখে চুপ করে দাঁড়িয়ে, হঠাৎ বললেন শিগগিরই ছাদে চলো।
কাবেরী কার্নিশের উপর দাঁড়িয়ে। ওর ওরকম চোখ মুখ আমি আগে কখনো দেখিনি। আমাদের দেখেই চীৎকার করে বলতে লাগলো, কাছে যদি আসিস এক্ষুনি ঝাঁপ দেব। আর তোদেরকেও আজ রাত্রের মধ্যেই শেষ করে দেবো চলে যা....চলে যা....চলে যা....
তান্ত্রিক পকেট থেকে একটা কিছু বার করে লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিল। একটা নীল ধোঁয়া হয়ে সেটা মিলিয়ে গেল। আমি কাবেরীর দিকে তাকিয়ে। সে স্থির দৃষ্টিতে আমাদের দেখছে।
হঠাৎ তান্ত্রিক আমার দিকে ফিরে বলল, তুমি কি কখনো তোমার কোন আগের সম্পর্কে কাউকে অ্যাবরশান করতে বাধ্য করেছ? মানে সোজা কথায় কারুর সুযোগ নিয়েছো?
আমি কোনদিনও ভাবিনি আমার এত দিনের পুরনো পাপ এত যুগ পরে আমার সামনে চলে আসবে এইভাবে। কাবেরী স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে। তান্ত্রিক বলছে, বলো বলো, দেরি করো না।
ঘটনাটা সত্যি। তখন আমি মাস্টার ডিগ্রী করি। আমার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল জ্যোৎস্নার, যার বাবা ওখানে একটা সামান্য কাজ করতো ওষুধের দোকানে। মেয়েটাকে আমি ভালোবেসেছিলাম কিনা জানিনা। মিথ্যে কথা কেন বলছি। মেয়েটাকে আমি কোনদিনই ভালোবাসিনি। ওর শরীরের উপর আমার নেশা জন্মেছিল। আমার মনে হতো এমন একটা শরীর এত হাতের নাগালে চলে এলো, তাকে ভোগ না করা কাপুরুষতা। আমি সুযোগ নিলাম। ও প্রেগন্যান্ট হলো। আমাকে বিয়ে করার জন্য ও ওর বাবা অনেক জোরাজোরি করলো। ওর মা ছিল না। আমি ক্রমশ ওদের থেকে দূরত্ব বাড়ালাম। একদিন জানলাম ও বাচ্চাটাকে নষ্ট করেছে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। আর একদিন সকালে শুনলাম ওরা আমাদের শহর ছেড়ে চলে গেছে। তারপর থেকে আমি আর কোন খবর জানিনা। এমনকি বেঁচে আছে কিনা তাও জানিনা। দরকার মনে হয়নি।
হঠাৎ কাবেরী গোঙানির শব্দে কাঁদতে শুরু করল। আমি ওর কাছে এগোতে যাব, তান্ত্রিক হাত ধরে আটকালো। বলল, এখন না।
তারপর তান্ত্রিক চীৎকার করে বলল, ওর শরীর থেকে বেরিয়ে যা, অন্য কোথাও যা, ওকে ছেড়ে দে।
ছাদে কিছু শুকনো পাতা পড়েছিল সেগুলো আচমকা ঘূর্ণির মতন ঘুরতে ঘুরতে ধুলোর সঙ্গে মিশে তান্ত্রিকের আমার চোখে মুখে ঢুকে অতিষ্ঠ করে তুলল। ক্রমশ বুঝলাম আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে, আমি যেন হাওয়ায় ভাসছি। তান্ত্রিক কে দেখলাম ছাদে শুয়ে আছে উপুড়র হয়ে। আমি উড়ে যাচ্ছি হাওয়ায়। একটু উঁচু থেকে হঠাৎ দেখলাম কাবেরীর গলা জড়িয়ে আছে সুজুকা, আচমকা সাত তলা থেকে নীচে ঝাঁপ দিল। আমিও পড়লাম ছাদের উপর মুখ থুবড়ে।
তান্ত্রিককে দেখার সময় ছিল না। হুড়মুড় করে নীচে নামলাম। ততক্ষণে বেশ কিছু লোক জমা হয়ে গেছে। আমি চীৎকার করে বললাম অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে। একজনকে বললাম শিগগিরির ছাদে যাও। ছাদ থেকে নেমে এসে বলল কেউ নেই তো ছাদে। অ্যাম্বুলেন্স এসে গেছে। কাবেরীর জ্ঞান নেই। আমি ওর হাতটা ধরতে গেলাম, একটা বাচ্চার হাত আমার হাতটা সরিয়ে দিল। কানের কাছে সে বলল, আমার বাবা একই কাজ করেছিল, মা তাই বাড়ি শুদ্ধ আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। তুমিও মরবে।
[3 January 2025]